মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ছাত্র রাজনীতির দায়িত্ব

বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। রায়ে মন্তব্য করা হয়, রাজনীতির নামে সংঘবদ্ধ অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন কিছু তরুণ, তাঁদের কারণে পুরো ছাত্র রাজনীতি কলঙ্কিত হচ্ছে। হাইকোর্টের রায়ে ছাত্রনেতাদের ছাত্রাবাসের প্রশাসন চালানো, জোর করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে নিয়ে যাওয়ার মত প্রবণতারও সমালোচনা করা হয়েছে। তথাকথিত কিছু রাজনীতিবিদ নিজেদের স্বার্থে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়। আদালত আরও বলেছেন, টাকাওয়ালা এবং ক্ষমতাশালী লোকেরা এক ধরনের দায়মুক্তি ভোগ করেন। এক্ষেত্রে পুলিশ এবং অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থা, চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি করে অপরাধীদের সহায়তা করেন। রায়ে ছাত্ররাজনীতি, রাজনীতিবিদ, পুলিশ ও বিভিন্ন পেশার কর্মকর্তাদের তৎপরতা প্রসঙ্গে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে নাগরিকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
বিশ্বজিৎ হত্যার রায় আমরা পেয়েছি, কিন্তু বিশ্বজিতকে আর পাওয়া যাবে না। বিশ্বজিৎ কাজ করতেন পুরানো ঢাকায় দরজির দোকানে। কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তিনি, খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সংগ্রামটুকুই করছিলেন। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর সকালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে কাজে যাওয়ার সময় বাহাদুর শাহ পার্ক সংলগ্ন এলাকায় হতভাগ্য এই তরুণকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেন ছাত্রলীগের একদল কর্মী। রক্তাক্ত শরীরের বিশ্বজিতকে মারধর ও কোপানোর ছবি দেশের গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়। শুরু থেকেই বিশ্বজিৎ হত্যা নিয়ে গণমাধ্যম যতখানি সরব ছিল, ততখানি তৎপর ছিল না পুলিশ। বিশ্বজিৎ হত্যাতদন্তে নানা অসংগতিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিচারিক আদালতের রায়ে ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। এর পর মামলা হাইকোর্টে আসে। গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই ৮ জনের মধ্যে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন ও ২ জনকে খালাস দেয়। উল্লেখ্য যে, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ওই ২ জন এখনও পলাতক রয়েছেন।
একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, ছাত্ররাজনীতির অপচর্চার কারণেই বিশ্বজিতকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। ছাত্র রাজনীতির নামে হানাহানি ও সংঘাত নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত কর্মকা-গুলো বন্ধ হয়নি বরং বেড়েই চলছে। প্রথম আলোর এক হিসেবে দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে গত ৮ বছর ১০ মাসে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন। টেন্ডার, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা বিষয় নিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণে দেশের অন্তত ৬০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মেয়াদে বন্ধ ছিল। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ছাত্ররাজনীতি ঐতিহ্যবিচ্যুত হয়েছে এবং হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন শক্তি কাজ করে থাকে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য রাজনীতি, সমাজ, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন হতে হবে। তাঁর মতে, ছাত্ররাজনীতি থাকতে হবে; তবে সেটা প্রথাগতভাবেই থাকতে হবে, তা নয়। সঠিক নেতৃত্বকে কিভাবে সামনে আনা যায় তা নিয়েও ভাবতে হবে। তাঁর বক্তব্য আদালতের রায় এবং অভিজ্ঞজনের মতামতের ভিত্তিতে উপলব্ধি করা যায়, কি কি কারণে ছাত্ররাজনীতি পথভ্রষ্ট হয়েছে। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি থেকে ছাত্ররাজনীতিকে কাক্সিক্ষত পথে কারা ফিরিয়ে আনতে পারেন সে বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যথা ব্যক্তিরা যথাদায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন কী?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ