শনিবার ০৬ জুন ২০২০
Online Edition

মৃতপ্রায় শিল্পনগরী খুলনার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে খুলনা শিপইয়ার্ড

খুলনা অফিস : মৃতপ্রায় শিল্পনগরী খুলনার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে খুলনা শিপইয়ার্ড। যার তত্ত্বাবধানে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বভার নৌবাহিনী নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক সাফল্য ধরা দিচ্ছে। খুলনা শিপইয়ার্ড একটি জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকারী প্রতিষ্ঠান। খুলনা শহরের রূপসা নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫৪ সালে নির্মাণ কাজ শুরু করে তিন বছরে তা শেষ করেছিল। ২৩ নবেম্বর ১৯৫৭ সালে খুলনা শিপইয়ার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে ছয় শতাধিক বিভিন্ন ধরনের জলযান নির্মাণ করেছে। আর মেরামত করেছে দুই হাজার এর অধিক। অবস্থান আর কাজের গুণগত মান দেখে কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, চীন ও তুরস্কের বিভিন্ন শিপইয়ার্ড যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের বাইরে এখানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বড় ময়লার কনটেইনার ও ট্রলি এবং চিনি ও পাটকলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ফেরির পন্টুনও তৈরি হচ্ছে। গত এক দশকে এ প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু ছোট-বড় নৌযান, যুদ্ধ জাহাজসহ কন্টেইনারবাহী জাহাজ। ২০১১ সালের ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী এ শিপইয়ার্ডেই সর্বপ্রথম দেশের মাটিতে ৫টি যুদ্ধ জাহাজ তথা পেট্রোল ক্রাফট নির্মাণের ঘোষণা দেন। খুলনা শিপইয়ার্ড অত্যন্ত সফলভাবে ২০১৩ সালের মধ্যে সেই ৫টি পেট্রোল ক্রাফট নির্মাণ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। জানা যায়, লোকসান দিতে থাকা ৫৭ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠান পরিণত হয়েছিল রুগ্ন শিল্প হিসেবে। দেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৯৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। দেনার দায়ে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব দেওয়া হয় নৌবাহিনীকে। ২০০৮ সালের মধ্যেই দেনা শোধ, এরপর থেকে লাভজনক হয়ে ওঠা। খুলনা শিপইয়ার্ড ২০১১ সালে নৌবাহিনীর জন্য তৈরি শুরু করে পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ। ২০১৩ সালে দেশের তৈরি প্রথম যুদ্ধজাহাজ হস্তান্তর করা হয় নৌবাহিনীকে। এখন সেখানে তৈরি হচ্ছে কনটেইনারবাহী জাহাজ। খুলনা শহরের রূপসা নদীর তীরে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকারী এ প্রতিষ্ঠানটি এখন কর্মমুখর। গত কয়েক অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি খুলনা কর অঞ্চলের সর্বোচ্চ করদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তান ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (পিআইডিসি) খুলনায় একটি শিপইয়ার্ড নির্মাণের জন্য পশ্চিম জার্মানির মেসার্স স্টাকেন শন নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করে। ১৯৫৪ সালে নির্মাণ কাজ শুরুর পর প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫৭ সালের ২৩ নবেম্বর থেকে উৎপাদনে যায়। সে সময় রূপসা নদীর প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা ও গভীরতাকে বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চ ৭০০ টন লাইট ওয়েট বা আড়াই হাজার টন কার্গো ধারণসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের সুযোগ-সুবিধাসহ এটি নির্মিত হয়। উৎপাদনের শুরু থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং পরে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত জার্মান এবং ব্রিটিশ ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এরপর একই বছর ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (ইপিআইডিসি) প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। আর স্বাধীনতার পর এটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (বিএসইসি)। প্রথম দিকে মোটামুটি সফলভাবে পরিচালিত হলেও আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতিষ্ঠানটির সফলতার হার নিম্নগামী হতে থাকে। নব্বই দশকে এসে যা লোকসানের ভারে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে সরকার। আগামী ৮ নবেম্বর রাষ্ট্রপতি আ. হামিদ আরও দুটি যুদ্ধ জাহাজ উদ্বোধন করবেন। যার নাম ‘নিশান ও দুর্গম’। জাহাজ দুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে আটশ’ কোটি টাকা। উদ্বোধনের আগে জাহাজ দুটি পরীক্ষামূলকভাবে সাগরে চলাচল করছে। খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (উৎপাদন) ক্যাপ্টেন এম নুরুল ইসলাম শরীফ জানান, ৬৪ দশমিক ২ মিটার দৈর্ঘ্য, ৯ মিটার প্রস্থ করে নিশান ও দুর্গম নামে দু’টি যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে। জাহাজ দু’টি নির্মাণে আটশ’ কোটি টাকা ব্যয় হয়। জাহাজ দু’টি নির্মাণে ২৪ মাস সময় লাগে। উদ্বোধনের আগে জাহাজ দুটি পরীক্ষামূলকভাবে চলাচলের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। তিনি আরও জানান, একই সঙ্গে ১৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিনের জন্য দুটি বোট নির্মাণ করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ