শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

মিয়ানমারের জেনারেলদের যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার দাবি ৫৩ মার্কিন কংগ্রেসম্যানের

সংগ্রাম ডেস্ক : রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রে মিয়ানমারের জেনারেলদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩ জন কংগ্রেসম্যান। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের কাছে লেখা চিঠিতে তারা দোষীদের বিরুদ্ধে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্ষের এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে। বাংলা ট্রিবিউন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরকে দেওয়া ওই চিঠিতে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি ও বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি- দুই দলের কংগ্রেস সদস্যরাই স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, রাখাইনে সহিংসতা বন্ধের পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। এতে বলা হয়, ‘যেসব ঘটনা ঘটছে তা দৃশ্যত অস্বীকার করে চলেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। যেসব লোক মিয়ানমারের ভেতর আটকা পড়েছে এবং যারা দেশে ফিরতে চায় তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আপনার পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব সেটা করার আহ্বান জানাচ্ছি আমরা।’চিঠিতে বলা হয়, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মিয়ানমারের জাতিগত নিধন ঠেকাতে অবিলম্বে সে দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। আর যারা এ ঘটনায় জড়িত, তাদের তালিকা প্রণয়নের পর একে একে নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনও বলেছেন, রাখাইনে নিপীড়নের হোতা জেনারেলরা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শুধু কড়া বক্তব্য দিয়েই দায় সারছেন। তারা কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।  

জাতিগত নিধনে ধর্ষণই মিয়ানমার সেনাদের অস্ত্র

রোহিঙ্গাদের দমন-পীড়নের জন্য ধর্ষণকেই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। আরাকানের রাখাইন রাজ্যে এমন কোন নারী নেই যিনি নিজ দেশের সেনাবাহিনীর হাতে ধর্ষণের শিকার হন নি।

জাতিগত মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধ করা, জাতিগত গোষ্ঠিগুলোর মনোবল গুড়িয়ে দেয়ার জন্য নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা ও পরিবারের সদস্যদের সামনে তাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে কর্মরত জাতিসংঘের চিকিৎসকরা জানান, ‘মিয়ানমারে অত্যাচারের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা হাজারো নারীদের মধ্যে বেশিরভাগই সহিংস যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।’ তাদের শরীরে সেনাদের পাশবিক পশুত্বের চিহ্ন।

থম্পসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতিত এক নারী রাখাইন নারীদের ওপর সেনাদের নির্যাতনের জঘন্য বর্বরতা তুলে ধরেন।ইিউম্যান রাইটস ওয়াচের যৌন নির্যাতন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মিস স্কাই হুইলার বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনযজ্ঞের উন্মাদ খেলায় বার্মিজ সেনারা রাখাইন নারীদের ধর্ষণের মত ভয়ঙ্কর পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পাশবিক অত্যাচার, ভয়াবহ আঘাত ও অপমানের জন্য ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং নিয়মিত এটি চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।’বাস্তবিক মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কোন অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, রোহিঙ্গাদের নিজের দেশ ছাড়াতে ধর্ষণই এখন নিয়মিত অস্ত্র।১৮ বছরের নুরশিদা জানান, ‘এক মাস আগে স্কুলে ৩০ জন সেনাদের অস্ত্রের মুখে তার সহপাঠীরা চুপ হয়ে গিয়েছিল। খুব তাড়াতাড়িই গ্যাং রেপের শিকার হয়েছিল সে। ছয় জন সৈন্য অস্ত্রের মুখে তাকে ধর্ষণ করে।’ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্ণেল রাশেদ হাসান বলেন, নুরশিদার গল্প অন্যান্যদের চেয়ে আলাদা নয়। যুদ্ধের কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণকে কাজে লাগানো হচ্ছে।’সব বয়সের সব নারী নৃশংস যৌন আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তারা নিজের পরিবারের সদস্যদের হত্যা নিজ চোখে দেখেছেন, তারা সন্তান হারিয়েছেন এবং ঘর-বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘ পপুলেশন ফান্ডের সাবা জারিভ বলেন, ‘ধর্ষণ হচ্ছে ক্ষমতার একটি অস্ত্র। এটি কোন বয়স, লিঙ্গ বা জাতীয়তা মানে না।’নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা জান্নাত (২২) তার ওপর ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর অত্যাচার ও ধর্ষণের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘সেনাবাহিনীর আমাদের গ্রামে আক্রমণের পাঁচ দিন আগে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। সেনা বাহিনী যখন আমাদের গ্রামে আক্রমণ করে সবাই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু আমি ঘরে লুকিয়ে থাকি। কিন্তু সেনারা দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়ে। আমি বলেছিলাম, আমি অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু তারা সবাই মিলে আমাকে ধর্ষণ করে। এরপর দিনের শেষে জান্নাতকে দেখা যায়, নগ্ন, নির্যাতিত, অত্যাচারিত ও সন্তানহারা এক নারীরুপে। জান্নাত বলেন, আমি কাঁদছিলাম ও চিৎকার করে আমার সন্তানদের ডাকছিলাম। কিন্ত আমি তাদের আর খুঁজে পাই নি । আমি আর মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাই না। আমি সব হারিয়েছি।’বিশ বছর বয়সী পারভিন জানায়, ‘সেনাবাহিনী আমাকে ধর্ষণের পর আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমাকে পরিত্যাগ করে। আমার শ্বাশুড়ি আমাকে বলে, তারা আর আমার কোন দায়িত্ব নিতে পারবে না। আমি ধর্ষিতা, তাই আমার স্বামীর বাড়িতে থাকার সুযোগ নেই, আমার দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ নেই। আমার সন্তানকে এখন আমার একা বড় করতে হবে। ’অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম এবিসি নিউজের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবির এখন মিয়ানমারের সীমান্ত থেকে আসা এতিম শিশু, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনে শিকার হয়ে বেঁচে থাকা নারীদের আশ্রয়। যারা অপরাধী গোষ্ঠির হাতে নিপীড়নের শিকার। সূত্র: কাশ্মীর অবজারভার, ডেইলি স্টার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ