রবিবার ০৭ মার্চ ২০২১
Online Edition

সিলেটে ছাত্রলীগের হাতে ৭ বছরে ১১ খুন

 

সিলেট ব্যুরো : বড়ই বিপাকে পড়েছেন সিলেট জেলা ও মহানগর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তাদের যেন দুশ্চিন্তার শেষ নেই। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের জমি দখল, বিল দখল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের পর গত ৭ বছরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায় সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে ১১ ব্যক্তি নৃশংসভাবে খুন হওয়ায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। সিলেটের টিলাগড় পয়েন্ট বর্তমানে মার্ডার পয়েন্ট নামে খ্যাত। আওয়ামী লীগপন্থী কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের রাজ্যে খুনাখুনি, হামলা পাল্টা হামলা যেন লেগেই আছে। এই খুনোখুনিকে কেন্দ্র করে ইমেজ সংকটে পড়েছেন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। যদিও তারা এগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু তূষের আগুনে পুড়ছেন সিলেটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। আগামী নির্বাচনে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে গত সপ্তাহে মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন কার্যক্রম সমাবেশের পৃথক পৃথক প্রস্তুতি সভায় ছাত্রলীগের এসব অপকর্ম নিয়ে উপ্তত্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন। 

সিলেটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নাম গত প্রায় সাত বছরে ১১টি খুনের সাথে জড়িয়েছে। শুধু ১১ টি খুন নয়, ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হামলা পাল্টা হামলায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরের উপর হামলাতো আছেই। কখনও ছাত্রলীগ পুলিশী ছত্রছায়ায় ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আবার কখনও পুলিশের সাথে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে হামলা করেছে। এসবই নজরে রয়েছে সিলেটবাসীর। 

২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সালের গত ১৬ অক্টোবর টিলাগড় পয়েন্টে ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদসহ ৭ বছরে সংঘটিত এসব খুনের বেশির ভাগেরই কোন কূলকিনারা হয়নি। ঘটনার সাথে জড়িত রতি-মহারতিরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেক ক্ষেত্রে মামলার আসামিরা গ্রেফতার হলেও তারা জামিনে বেরিয়ে এসেছে। অনেকে মহানগর আওয়ামীলীগের টিলাগড়ের এক নেতার সহযোগিতায় বিদেশেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। কয়েকটি খুনের ঘটনা ব্যক্তিগত বিরোধে ঘটলেও সেগুলোতে ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধন রয়েছে।

 খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ২০১০ সালের ১২ জুলাই নগরীর টিলাগড়ে খুন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগকর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। এ ঘটনায় তার বাবা বীরেশ্বর সিংহ বাদী হয়ে ছাত্রলীগের আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। ওই খুনের বিচার এখনও শেষ হয়নি।

২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হল দখল নিয়ে পার্থ ও সবুজ গ্রুপের সঙ্গে অঞ্জন-উত্তম গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকর্মী সুমন চন্দ্র দাস। তার মা প্রতিমা দাস বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি সিআইডিতে তদন্তাদীন অবস্থায় রয়েছে।

অটোরিকশা স্ট্যান্ডের দখল নিয়ে ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকায় নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় খুন হন ছাত্রলীগকর্মী আব্দুল্লাহ ওরফে কচি। তার ভাই আসাদুল হক মামলা দায়ের করলেও সেই খুনের বিচার শেষ হয়নি আজও।

সিলেট মদন মোহন কলেজে অভ্যন্তরীণ বিরোধে ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট খুন ছাত্রলীগকর্মী আব্দুল আলী। এ ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা প্রণজিৎ দাশ ও আঙ্গুর মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রণজিৎ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে মামলার বিচারকার্য শেষ হয়নি এখনও।

গত বছরের ১৯ জানুয়ারি দলীয় ক্যাডারদের হামলায় খুন হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগকর্মী কাজী হাবিবুর রহমান হাবিব। এ ঘটনায় অভিযুক্ত হন ছাত্রলীগ নেতা হোসাইন মোহাম্মদ সাগর ও সোহেল। তাদের নেতৃত্বেই হাবিবের ওপর হামলা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৪ ছাত্রকে বহিষ্কার করে। এরা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এদেরকে আসামি করে হাবিব হত্যায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার আসামিদের কয়েকজন গ্রেফতার হলেও পরবর্তীতে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে।

নগরীর শামীমাবাদে ২০১৬ সালের পহেলা মে ইসলাম হোসেন নামের এক শ্রমিককে কুপিয়ে খুন করা হয়। এ ঘটনার সাথে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। ইসলাম হোসেনের ভাই বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করলেও জড়িতরা গ্রেফতার হয়নি।

একই বছর ১০ জুলাই নগরীর পাঠানটুলায় একটি বাসার দখল নিয়ে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হামলায় খুন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আব্দুল্লাহ অন্তর। তার স্ত্রী বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু এখনও বিচারের আশায় দিন পার করছেন তিনি।

ওই বছরের ১৬ আগস্ট সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে এলিগেন্ট শপিং সিটির সামনে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুনকে তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুলেমান হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে ছুরিকাঘাত করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান মামুন। ঘটনার পরদিন সুলেমানকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। হত্যার ঘটনায় সুলেমানকে প্রধান আসামি করে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুলেমানকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। লোক মুখে শোনা যাচ্ছে সুলেমান নাকি আওয়ামীলীগের এক মাঝারী সাইজের নেতার ছত্রছায়ায় বিদেশ চলে গেছে।

২০১৭ সালের ১৭ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর এলাকায় বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের একটি শ্রেণীকক্ষে গুলিতে খুন হন ছাত্রলীগকর্মী খালেদ আহমদ লিটু। এ ঘটনায় তার বাবা ফয়জুর রহমান বাদীয় হয়ে ছাত্রলীগকর্মী ফাহাদ আহমদ ৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার চার আসামি গ্রেফতার হলেও বাকিরা পলাতক।

চলতি বছরের গত ১৩ সেপ্টেম্বর নগরীর শিবগঞ্জ লামাপাড়ায় খুন হন ছাত্রলীগকর্মী জাকারিয়া মো. মাসুম। সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে তার ভাই সাইফুল্লাহকে আটকে মাসুমকে ডেকে আনেন টিলাগড়েরর ছাত্রলীগ নেতা টিটু চৌধুরী ও তার সঙ্গীরা। পরে ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় মাসুমকে। তার মাম আতিয়া বেগম বাদী হয়ে টিটুকে প্রধান আসামি করে ২২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তন্মধ্যে গৌতম চন্দ্র ও আলী আহমদ জুয়েল নামের দুইজনকে গ্রেফতার করা হলেও মূলহোতা টিটুসহ অন্যরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে আসামিদের গ্রেফতারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন নগরীর শাহপরান থানার ওসি আখতার হোসেন। এর রেষ কাটতে না কাটতেই গত ১৬ অক্টোবর সোমবার বিকেলে খুন হয়েছেন ছাত্রলীগকর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ। দলীয় কোন্দলের জেরে কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের আশীর্বাদ পুষ্ট সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারী রায়হান চৌধুরীর গ্রুপের ক্যাডার  তোফায়েল আহমদসহ কয়েকজনের সাথে সংঘর্ষ হয় মিয়াদ ও তার সঙ্গীদের। একপর্যায়ে ছুরিকাঘাতে খুন হন ওমর আহমদ মিয়াদ। এ ঘটনায় তোফায়েলকে ঢাকা থেকে আটক করেছে এসএমপির মোগলাবাজার থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার জ্যোতিময় দাস সহ একদল পুলিশ। বর্তমানে তোফায়েল পুলিশ হেফাজতে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মিয়াদ খুনের ঘটনায় ছাত্রলীগ সেক্রেটারি রায়হান চৌধুরীসহ ৯ জনকে আসামী করে মিয়াদের বাবা আকুল মিয়া শাহপরাণ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। 

ছাত্রলীগের কখনও বিল দখল আবার কখনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট কোন কোন জায়গায় দখল পাল্টা দখল ও একের পর এক হত্যাকান্ডে নেতিবাচক কর্মকান্ডে অভিভাবক সংগঠন হিসেবে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের নেতারাও ইমেজ সংকটে পড়েছেন। সোনার ছেলেদের আপত্তিকর কর্মকান্ডে বিব্রতবোধ করছেন মুরব্বী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমেজদারী নেতা হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত আসাদ উদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের এমন কর্মকান্ডে আওয়ামী লীগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আমরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছি এবং প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি। শক্তভাবে না ধরলে আগামীতে আরো খারাপ অবস্থা হবে বলে মন্তব্য করেন নগর আওয়ামী লীগের এই নেতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ