শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

পরিবেশদূষণ থেকে বাঁচতে বিকল্প ভাবনা

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : নানাভাবে মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণ করছে প্রতিদিনই। তাও আবার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে। কিন্তু একটু ভাবলে, চিন্তা করলে এর বিকল্প বের করা যেতে পারে। তবে কাজটি বেশ কঠিন ও দুষ্কর। বিষয়টি খোলাসা করেই বলি। অন্যথায় বিভ্রান্তির অবকাশ থেকে যেতে পারে।
ধর্মাচারের নামে অপ্রয়োজনীয় আয়োজন এবং আনুষ্ঠানিকতা, কষ্টার্জিত কোটি কোটি টাকার অপচয়, পরিবেশ ও শব্দদূষণ, অকারণে আলোকসজ্জা, বছরের পর বছর ধরে নদ-নদী বা দীঘিপুকুর ভরাট হয় এমন কাজ, প্রতিবেশীর ইবাদত-উপাসনায় বিঘ্ন সৃষ্টি, অহেতুক হৈচৈ করে শিশুসহ প্রবীণ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসুস্থের প্রশান্তি বিনষ্টের কারণ ঘটানোর মতো কোনও কর্মসূচি প্রকৃতপক্ষে অপকর্ম বা অসামাজিকতা। এসব কর্মকা-কে সভ্যতাপরিপন্থী এবং সুষ্ঠু সমাজগঠন ও বিকাশের প্রতিবন্ধক হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
যুগযুগান্তরের অহিতকর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিজ্ঞানমনস্ক ও সমাজসচেতন বিবেকসম্পন্নদের যেমন দিতে হবে দায়িত্ববোধের পরিচয়; তেমনই জানাতে হবে নবতর সমাজজাগৃতির আহ্বান।
মানবসমাজের কিছু বিশ্বাসবোধ ও ধ্যানধারণা নিয়ে আজ আমি দু’-এক কথা বলতে চাই। এতে হয়তো কেউ কেউ মনোক্ষুণ্ণ হতে পারেন। আমার সম্পর্কে বিদ্বেষভাবও সৃষ্টি হতে পারে অনেকের। তবে আমি কারুর অনুভূতিতে বিশেষত ধর্মভাবনায় কোনওরূপ আঘাত দিতে চাই না। কিন্তু বিষয়টি এমনই যে আমার আলোচনায় সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের কথা উঠে আসবে। মনে হতে পারে আমি কারুর ধর্মচেতনায় ইচ্ছাকৃত বিদ্বেষবীজ বপন করছি। কিন্তু উদারতার সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করলে তা মনে হবার কথা নয়।
সমাজে এমন কিছু প্রথা প্রচলিত আছে যুগযুগান্তর ধরে যেগুলো সাময়িক আনন্দঘন উৎসব মনে হলেও সেসবের তেমন উপকারিতা নেই। বরং সেগুলোতে হয় অহেতুক অপব্যয় এবং অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি। ধরুন: ভারতসহ এ উপমহাদেশে পূজাপার্বনে মহা-জাঁকজমকসহকারে নানা আনুষ্ঠানিকতাসহ বিগ্রহ বা প্রতিমা প্রস্তুত করবার কথা। এর প্রধান উপকরণ মাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ, রং ইত্যাদি। সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন করে সাজিয়ে পূজো সম্পন্ন হয়ে গেলে তা আবার নিকটস্থ নদ-নদী, পুকুর বা জলাশয়ে ডুবিয়ে দেয়া হয়। তার আগে নানা আনুষ্ঠানিকতায় ভক্তিভরে মনের আকুতি জানিয়ে অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। ভাবা হয় এতে ভগবান আবির্ভূত হন। তবে এনিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই। কারণ এ ব্যাপারে কিছু বলতে গেলে আমার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ উঠতে পারে। তাই এ বিষয়ে আমি মুখে কুলুপ এঁটে দিলাম। আমি যেটা আলোচনায় আনতে চাই তা হচ্ছে ভিন্ন দিক। ভিন্ন চেতনা এবং ভিন্নতর ভাবনা।
যুগযুগ ধরে প্রতিবছর প্রতিমা নদ-নদী, জলাশয়ে ডোবানোর ফলে সেগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ধীরেধীরে এ বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। এতে নদ-নদী ও সমুদ্রের মাছ তথা সামুদ্রিক প্রাণি বিপন্ন হয়ে পড়ছে। ছোটছোট নদ-নদীসমুহে ইতোমধ্যে প্রায় ভরাটই হয়ে গেছে। তাই নদ-নদী থেকে পানি উত্তলোন করে জমিতে সরবরাহের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন যাচ্ছে কমে ক্রমান্বয়ে। এভাবে প্রতিমা বিসর্জনের বর্জ্যে নদী, সমুদ্র, খাল, বিল প্রভৃতি ভরাট হলে ভবিষ্যতে পুরো প্রকৃতি যেমন বিপন্ন হয়ে যেতে পারে, তেমনই মানুষও পড়তে পারে বিপদে। অবশ্য এই একটি কারণেই কেবল পরিবেশ ও প্রকৃতি বিপন্ন হচ্ছে না। আরও অনেক কারণ ঘটছে বিপন্ন হবার।
পরিবেশ ও প্রকৃতি বিপন্নের আরেকটি কারণ হচ্ছে শবদাহ। প্রতিদিন হাজার হাজার মৃতদেহ গঙ্গা-যমুনাসহ এ উপমহাদেশের ছোটবড় নদ-নদী, জলাশয়ের তীরে দাহ করে ছাইভস্ম জলে ফেলা হয়। ধোঁয়ায় আকাশ হয় আচ্ছন্ন। আবার গাছগাছড়া কেটে চিতার জ্বালানির যোগান দেয়া হয়। এতেও বিরাট ক্ষতি হয় পরিবেশ ও প্রকৃতির। অন্যদিকে বিনষ্ট করে ফেলা হয় গাছগাছালি কেটে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও লীলাময় সৌন্দর্য। প্রতিমার বর্জ্যে যেমন নদী, সমুদ্র, জলাধার ভরাট হয়, তেমনই তা প্রস্তুত করতে ব্যয়ও হয় হাজার কোটি টাকা।
আরেকটি বিষয় গভীরভাবে ভেবে দেখুন। যার কেউ মারা যায় তাকেই আবার ঘটা করে খাওয়ানোর আয়োজন করতে হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে এর বিপরীত ব্যবস্থাও আছে। যেমন: আমাদের সমাজে কারুর বাড়িতে কেউ মারা গেলে সেবাড়িতে প্রতিবেশীরা খাবার পৌঁছে দেন। এ হচ্ছে মহানুভবতা ও মানবিকতার উদাহরণ। আমাদের সমাজচোখের সামনেই উদাহরণ রয়েছে, যাদের বার্ষিক কোনও উৎসব উদযাপনে তেমন ব্যয়ই নেই। এমনকি পরিবেশ বা প্রকৃতির জন্য কোনও ক্ষতিকর দূষণ ছড়ানোর ঘটনাই ঘটে না তাদের উৎসবাদী উদযাপনে।
অন্যদের লাশদাফন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, খুব সাধারণভাবে আনুষ্ঠানিকতা সেরে মাটির গর্তে পাটাতন ও মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। কোনও আড়ম্বরতা নেই। গান-বাজনা নেই। তার আগে লাশটি গোসল দিয়ে সুন্দর করে কাফন দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। দাফনের সময় সামান্য পাটাতনের জন্য একটা বাঁশ হলেই চলে। বিরাট আয়োজন নেই। কোনও দূষণ নেই। মাটির দেহ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবার কী চমৎকার ব্যবস্থা। অথচ অনেকের লাশ লাকড়ি ও ঘি বা কোনও দাহ্য পদার্থ দিয়ে দাহ করবার ব্যবস্থা করা হয়। এতে যেমন ব্যয়ভার বাড়ে, তেমনই পরিবেশ দূষণের কারণ ঘটে, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ সমাজে এমনও রয়েছে যে, যার কেউ মারা যায় তাকেই আবার খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হয়। কী অদ্ভুত! যার মরলো তাকে আরও মারো; এমন আর কি! এছাড়া চিতায় মৃতদেহ রেখে যখন অগ্নিসংযোগ করা হয় তখন বীভৎস দৃশ্যের অবতারণাও হয়। অনেক সময় বাঁশ দিয়ে মৃতদেহ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দ্রুত পোড়ানোর চেষ্টা চালানো হয়। আমি এটাকে মৃত মানুষটির চরম অবমাননা হিসেবেই দেখি। অন্যদের দৃষ্টিতে এমন নিষ্ঠুরতা কী মনে হয় জানি না।
মৃতদেহ দাহের জন্য ভারতে প্রতিদিন কত গাছ কাটা হয় এবং তা পুড়িয়ে কত দূষণ ছড়ানো হয় তার হিসেব কষলে চোখ ছানাবড়া হবার কথা। তবে তা বছরে নিশ্চয়ই কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের হবে। কয়েক বছর আগে এর একটা হিসেব বেরিয়েছিল। অঙ্কটা ছিল বেশ বড়সড়। কিন্তু লাশ দাফনের জন্য যা খরচ হয় তা খুবই যৎসামান্য।
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার নদ-নদীসমূহ শবদাহের ছাইভস্ম ও প্রতিমার বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য মানুষের গৃহস্থালির বর্জ্যও ফেলা হয় নদ-নদীতে। এমনকি কা-জ্ঞানহীন মানুষ নদ-নদীর ধারে এবং সরাসরি নদীর পানিতেও পায়খানা ত্যাগ করে প্রতিনিয়ত দূষণ ছড়ায়। এদূষণ ঠেকানোর জন্য জরুরি পদক্ষেপ না নিলে নদ-নদীর পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তাই এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।
কেউ কেউ বলেছেন, প্রতিমা প্রস্তুত ইত্যাদিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। হ্যাঁ, তা হয় বটে। কিন্তু কর্মসংস্থান অন্যভাবেও করা যেতে পারে। মালি বা প্রতিমানির্মাতারা ক'টাকা পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন?
যাই হোক, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চিন্তা করে দেখতে পারেন প্রতিমা নদ-নদী বা পুকুরঝিলে না ভাসিয়ে অন্যভাবে বিসর্জন করা যায় কিনা। অপরদিকে শবদাহের আয়োজনও নদী-নালার ধারে না করে অন্যত্র করলে কোনও সমস্যা হবে কিনা তাও ভাবতে পারেন। কারণ এ দু’টি কাজে প্রকৃতি ও পরিবেশের যে ক্ষতি হয় এবং দূষণ ছড়িয়ে পড়ে তা অসামান্য ও অভাবনীয়। বরং প্রতিমাসমূহ মাটিতে পুঁতে কিংবা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখলে তেমন ক্ষতি হয় না। দূষণও ছড়ায় না। অবশ্য সংখ্যায় খুব কম হলেও কোনও কোনও প্রতিমা মন্দির বা ম-পে রেখে দেয়া হয়। আবার একবছর পর পুরনো প্রতিমাই নতুন করে রংচং করা হয়। এমন হলে খরচ যেমন বাঁচে, তেমনই অযথা দূষণ থেকে নদ-নদী, সমুদ্র তথা পরিবেশ রক্ষা পায়। ঠিক তেমনই শবদাহ না করে যদি অন্যদের মতো কবরস্থ করা হয় তাহলে প্রতিদিন যেমন লাখ লাখ বৃক্ষ রক্ষা পায়, তেমন ছাইভস্ম ও ধোঁয়ার দূষণ থেকে ধরিত্রী রক্ষা পেতে পারে। আশা করি, সংশ্লিষ্টরা আমার এ প্রস্তাব বাঁকা চোখে না দেখে উদার দৃষ্টিতে বিবেচনায় নিতে পারেন।
আজকাল অবশ্য ইলেকট্রিক চুল্লিতে শব দাহ করা হয়। এতে কাজটি যেমন দ্রুত সম্পন্ন হয়, তেমনই দূষণও সীমিত থাকে। তবে এ ব্যবস্থা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। এখনও গঙ্গা-যমুনার তীরে প্রতিদিনই অসংখ্য শবদাহ হয় এবং বিপুল অর্থ ও বৃক্ষরাজির ধ্বংসযোগ্য চলে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ