মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল  আমদানির নামে বছরে লুট ৯শ’ কোটি টাকা 

কামাল উদ্দিন সুমন : শুধু বিদ্যুতের ট্রারিফ নিয়ে নয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল আমদানির নামে কোটি কেটি টাকা লুটপাট হচ্ছে। শুল্কমুক্ত কোটা তেল আমদানির অনুমতি দেয়ায় লুটেরা সিন্ডিকেট এসুযোগটাও হাতছাড়া করেনি। এনিয়ে বিপিসির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। 

সূত্র জানায়, ফার্নেস অয়েলে বিদ্যুৎ  উপাদন করতে ইউনিটপ্রতি খরচ হয় ১৫ টাকা থেকে ২৯ টাকা। সরকার এই দরে বিদ্যুৎ কিনে জনগণের কাছে বিক্রি করে ৮ টাকা। এর ফলে সরকারকে ৭ টাকা থেকে ২১ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি গুণতে হয়। এটিও পরোক্ষভাবে জনগণের পকেট থেকে যায়। এখানেও বড় ধরনের দুর্নীতি ভর করেছে। সরকার এক শ্রেণীর মুখচেনা পছন্দের লোকজনকে এসব বিদ্যুৎ  প্রকল্পের কাজ দিয়ে থাকে।

বিপিসির পক্ষ থেকে পাঠানো বিদ্যুৎ , জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়কে দেয়া এক চিঠিতে বলা হয়, বেসরকারি ১২টি আইপিপি (ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) শুল্কমুক্ত কোটায় বছরে ১২ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে। এই তেল আমদানিতে তাদের কোনো ধরনের শুল্ক দিতে হচ্ছে না। একই সঙ্গে পোর্ট থেকে বিভিন্ন স্থানে তেল পরিবহনের কথা বলে তারা সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৯ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ পাচ্ছে। এতে বিপিসির আমদানি করা তেলের সঙ্গে বেসরকারিভাবে আনা তেলের দামে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ২৪ টাকার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। যে কারণে বিপিসি বড় ধরনের রাজস্ব হারাচ্ছে।

জানা যায়, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎ  কেন্দ্রগুলো ১২ লাখ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করেছে। তার আগের অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৯ লাখ মেট্রিক টন। এ অবস্থায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ  উৎপাদন সংশ্লিষ্ট এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে সরকার। 

বিপিসি বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ  কেনা শুরু হয়। ওই অর্থবছরই লোকসানে পড়ে পিডিবি। পরবর্তীতে লোকসানের পরিমাণ বাড়তে থাকে। গত ছয় বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থা লোকসান গুণেছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ।

সূত্র জানায় , বেসরকারি পাওয়ার প্লান্ট  মালিকরা যে যার ইচ্ছামতো সরকারের কাছে বিদ্যুৎ  বিক্রি করছে। আবার সুযোগ বুঝে বিভিন্ন অজুহাতে এসব কোম্পানি বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ানোর জন্য সরকারকে চাপও দিচ্ছে। অভিযোগ আছে, মহলবিশেষের ইন্ধনে বিদ্যুৎ  উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বেশি দামের বিদ্যুৎ  কেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ  কিনছে। এতে পিডিবির লোকসানের বোঝা বাড়ছে। কিন্তু গোপনে লাভবান হচ্ছে মহলবিশেষ।

পিডিবির সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় করে দেখা যায়, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ১৫টি বেসরকারি কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ১১ টাকা ৬৭ পয়সা। সবচেয়ে বেশি দাম নিচ্ছে সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেড। তাদের বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দর ২০ টাকা ৪০ পয়সা। আর এ কেন্দ্র থেকেই বেশি বিদ্যুৎ  কিনেছে পিডিবি। এছাড়া পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী সামিটের এই বিদ্যুৎ  কেন্দ্র থেকে ২০১৫ সালে সরকার ইউনিটপ্রতি ২৯ টাকা দরেও বিদ্যুৎ কিনেছে।

অভিযোগে জানা যায়, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল (ফার্নেস অয়েল) আমদানির সুযোগ দিয়েও বছরে ৯০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। খোদ বিপিসির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগকে বলা হয়েছিল বেসরকারিভাবে জ্বালানি তেল আমদানির নামে লুটপাট হচ্ছে। এটা বন্ধ করা দরকার। অভিযোগ আছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সিন্ডিকেট শুল্কমুক্ত তেল আমদানি ও ৯ শতাংশ সার্ভিস চার্জ আদায়ের মাধ্যমে তেল আমদানির মাধ্যমে বছরে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, একদিকে তেল নিয়ে লুটপাট চলছে, অপরদিকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়েও সরকারকে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যের ওপর যে ৯ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিচ্ছে তাও অতিরিক্ত ব্যয়। আর এই সার্ভিস চার্জ দেয়ায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে তেল আমদানির নামেও যা হওয়ার তাই হচ্ছে। মূলত তেল নিয়ে তেলেসমাতি করার জন্য আইপিপিগুলো বেসরকারি খাতে তেল আমদানির অনুমতি নিয়েছে। অভিযোগ আছে, এই তেল আমদানির নামে বছরে বিপুল অংকের টাকা পাচার হচ্ছে। আর সরকার এই টাকা সমন্বয় করতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটছে।

অধ্যাপক শামসুল আলম  বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে পরিমাণ তেল লাগে গোপনে তার চেয়ে বেশি তেল আমদানি করছে কোম্পানিগুলো। ফার্নেস অয়েলের নামে আনছে ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল। এরপর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবর্তে এই তেল কম দামে খোলাবাজারে বিক্রি করছে। বিপিসি তেল আমদানি করলেও বাজারে চাহিদা না থাকায় সে তেল বিক্রি হচ্ছে না। দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা বেসরকারিভাবে আসা তেলের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এ অবস্থায় সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরর জন্য বেসরকারিভাবে তেল আমদানি নিষিদ্ধ করার চিন্তা করলেও সিন্ডিকেটের চাপে তা থেকে এক পর্যায়ে সরে এসেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ