শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

বিদ্যুতের ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দেখানো হয় ৩০ হাজার কোটি 

 

কামাল উদ্দিন সুমন : বিদ্যুৎ খাতে ট্যারিফ নির্ধারণ নিয়ে বড় ধরনের  দুর্নীতির ফাঁদ পেতেছে সিন্ডিকেট। ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম বা ট্যারিফ নির্ধারণে দুর্নীতির বড় ফাঁদ পাতা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত  আইনের ১৫ ধারায় কৌশলে যা বলা আছে তার সারমর্ম হল- প্রকল্প ব্যয়ের ওপর ট্যারিফ নির্ধারণ নির্ভর করবে। অর্থাৎ যে কোম্পানির প্রকল্প ব্যয় যত বেশি, তার বিদ্যুতের ট্যারিফ মূল্য তত বেশি। ফলে এসুযোগ নিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় দেখানো হয় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ফলে এরা যেমন বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয় তেমনি ঐ সিন্ডিকেট এদের কাছ থেকেই বিদ্যুৎ কিনে। কারণ ভেতরে ভেতরে সিন্ডিকেটের পকেট ভারি হয়। কারণ তারা যে টাকা দিচ্ছে সেটাতো পক্ষান্তরে গ্রাহকের পকেট থেকেই যাচ্ছে। 

সূত্র জানায়, এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ আমলাদের তৈরি করা এ ধরনের বিতর্কিত আইনের কারণে যারা সৎ ভাবে বিদ্যুৎ  প্রকল্প করতে চান তারা কোনোভাবেই এগোতে পারছেন না। কেননা তাদের কেউ যদি ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক কোনো বিদ্যুৎ  প্রকল্প ব্যয় ১০ হাজার কোটি টাকা দেখিয়ে প্রস্তাব জমা দেন তাদের প্রথমে বলা হয়, ‘আপনার এটা কোনো দিন হবে না। এ ধরনের প্রজেক্ট যারা পেয়েছেন তাদের মতো করে প্রকল্প ব্যয় দেখিয়ে আবেদন জমা দিতে হবে।’ অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পকে ৩০ হাজার কোটি টাকা দেখাতে হবে। দেশের স্বার্থে ও ভবিষ্যতে দুদকের মামলার ভয়ে যারা এভাবে ভুয়া ব্যয় বৃদ্ধির প্রকল্প জমা দিতে চান না তাদের শেষমেশ বলা হয়, ‘আপনাকে দেয়া হবে ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা। কারণ আপনার প্রকল্প ব্যয় তো ওদের ৩ ভাগের ১ ভাগ।’ কিন্তু যেখানে বিদ্যুৎ  উৎপাদনে খরচ পড়বে সাড়ে ৫ টাকা সেখানে ৪ টাকা ট্যারিফ নির্ধারণ করা মানেই হল এ সারির কেউ আর এভাবে আগ্রহ দেখাবে না। অথচ যিনি বা যারা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় দেখিয়েছেন, তাদের দেয়া হচ্ছে ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ১৫ পয়সা। এরকম অসংখ্য নজির আছে পিডিবির অধিকাংশ প্রকল্প প্রস্তাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার কিনবে বিদ্যুৎ। তার তো প্রকল্প ব্যয় দেখার দরকার নেই। কারণ বিদ্যুৎ তো কখনও নকল হয় না। এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হলে যে প্রযুক্তি প্রয়োজন, যে দেশ থেকে যে মানের মেশিনারিজ আনতে হবে, তার সবই যদি একই হয়  তাহলে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎ  কেন্দ্রের প্রকল্প ব্যয়ের ব্যবধান এত বেশি কেন হবে? এখানে দুর্নীতির সব রহস্য লুকিয়ে আছে।

 অথচ পরিবেশ রক্ষাসহ নানা অজুহাত তুলে প্রকল্প ব্যয় দেখে বিদ্যুতের ট্রারিফ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এ চক্রের মূল উদ্দেশ্য হল-প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া। সেজন্য এ রকম ফাঁদ পাতা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, ১০ হাজার কোটি টাকার যে প্রকল্পকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা দেখানো হয়েছে সেখানে সহজ হিসাব অতিরিক্ত ব্যয় ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ টাকা তো প্রকল্পের কাজে কোথাও দৃশ্যমান ব্যয় করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হল- তাহলে এই অতিরিক্ত টাকার কী হবে? এর সহজ উত্তর এটিই দুর্নীতির টাকা। এই টাকা বিশেষভাবে প্রভাবশালী মহলের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়। মূলত এজন্যই প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ালে বিদ্যুৎ প্লান্টের অনুমোদন মেলে না।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেকরা মনে করেন, এভাবে বিদ্যুৎ আইন বা নীতি দিয়ে একটি দেশ কোনো দিন সামনে এগোতে পারবে না। শুধু গুটিকয়েক লোকের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। যারা বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে নিজেরা ভালো থাকতে পারবেন। কিন্তু দেশ ডুববে অন্ধকারে। দেশের চালিকাশক্তির অন্যতম উপাদন বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে দেশী-বিদেশী একটি চক্রের হাতে। ফলে তারা চাইলে যখন তখন দেশকে অন্ধকারে রাখতে পারবে। তাদের মতে, গভীর এই ষড়যন্ত্র ও সংকট থেকে মুক্তি পেতে জাতীয়ভাবে বিদ্যুতের একটি ট্যারিফ নির্ধারণ করতে হবে। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদন উন্মুক্ত করে দিতে হবে। যাদের সক্ষমতা আছে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন, আর সরকার জাতীয়ভাবে নির্ধারিত মূল্যে তা কিনে নেবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, বিদ্যুৎ একটি কৌশলগত পণ্য এবং এটির দাম বেড়ে গেলে অন্য সব পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে দুটি প্রতিক্রিয়া হয়। একটি মুদ্রাস্ফীতি, এতে জনগণের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং অন্যটি দেশের পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এতে রপ্তানিখাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যায়। তাই বিদ্যুতের দাম কমানো সম্ভব হলে তা কমানো দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ