বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শাহরাস্তির স্কুলছাত্রী মিনু আত্মহনন ঘটনার নায়করা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে

ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহননকারী মিনুর লিখে যাওয়া সুইসাইড নোট ও বখাটে তারেক

স্টাফ রিপোর্টার : ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহননকারী চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার ফরিদউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী শারমিন আক্তার মিনুর আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীরা বহাল তবিয়তে। ওই ঘটনার ২ বছর পরও জালিয়াতির মাধ্যমে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মামলার মূল আসামী মমিন হোসেন তারেকসহ অন্যরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগে প্রকাশ। মামলার বাদীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, পুলিশের পক্ষপাতদুষ্ট অভিযোগ গঠনের কারণে দফায় দফায় তদন্ত কার্যক্রম পরিবর্তন ও আসামী পক্ষের হুমকী ধামকির ফলে বোন হারানোর বিচার চেয়ে উল্টো ভীতসন্ত্রস্ত জীবন কাটাতে হচ্ছে বাদীর।
জানা যায়, ২০১৫ সালের ২০ আগস্ট শাহরাস্তি উপজেলার আয়নাতলী ফরিদ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর ছাত্রী শারমিন আক্তার মিনু শ্রেণীকক্ষে ও বিরতির সময় ক্যাম্পাসে সহপাঠীর দ্বারা উত্ত্যক্তের শিকার ও উত্ত্যক্তকারীর পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নাজেহাল হয়ে ক্ষোভে অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, শাহরাস্তি উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের পন্ডিত বাড়ির প্রবাসী মোহাম্মদ আলীর মেয়ে শারমিন আক্তার মিনুকে প্রায়ই প্রেম নিবেদন ও উত্ত্যক্ত করতো সহপাঠী সংহাই গ্রামের প্রবাসী আবু তাহেরের ছেলে তারেক। এ বিষয়টি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইসমাইল হোসেনের কাছে মিনুর ছোট ভাই নয়ন মৌখিকভাবে জানায়। এতে তিন দিন পর ২০ আগস্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতিতে ইংরেজি ক্লাস চলাকালে ছেলের মা রূপবান বেগম ক্লাসের ভেতর ঢুকে মিনুকে দাঁড় করিয়ে তার ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। এ প্রস্তাব মিনু প্রত্যাখ্যান করলে তারা মিনুকে বিভিন্ন প্রকার অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে বিরতির সময় রুপবান বেগমের সাথে তার মেয়ে কনিকা এসে আরো অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে মিনুকে গালিগালাজ করে। এক পর্যায়ে তারাসহ উত্ত্যক্তকারী  তারেক মিনুকে চড় মারে ও মুখে থুতু দেয়। উপস্থিত অন্যান্য সহপাঠিদের সামনে অপমাণিত হয়ে রাগে ক্ষোভে ৪র্থ ঘন্টার পর ছুটি নিয়ে বাড়িতে যায় মিনু। এরপর তাদের বসতঘরের নিচ তলায় ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। পরিবারের সদস্যরা তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় মিনুর বড় ভাই শাহাবুদ্দিন নয়ন ৫ জনের নাম উল্লেখ করে শাহরাস্তি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় শুধুমাত্র তারেককে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তারেকের পরিবার অর্থের বিনিময়ে বয়স কমিয়ে ভুয়া জন্ম সনদ তৈরি করে তারেককে অপ্রাপ্ত বয়স্ক দেখিয়ে ৩২ দিন পর আদালতের মাধ্যমে তাকে জামিনে বের করে আনে। 
এদিকে মিনুর আত্মহননের ঘটনা জানাজানির পর সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের নির্দেশে ঘটনার ৩ দিন পর লিখিত ভাবে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিদ্দিকুর রহমান পাটওয়ারী, যাতে ইভটিজিং এর মত কোন ঘটনা ঘটেনি বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে তারেক, তার মা রুপবান বেগম ও বোন কনিকার অপরাধ আড়াল করা হয়। এ ঘটনায় অপরাধীকে বিদ্যালয় হতে বহিষ্কার না করে তার শিক্ষাজীবন অক্ষুণœ রাখতে প্রধান শিক্ষকের প্রচেষ্টায় লাকসামের একটি স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। অপরাধী পরিবারকে বাঁচাতে তার এসব কর্মকান্ডে একজন শিক্ষকের পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে সে সময় নানা বিতর্কের জন্ম নেয়।
জানা গেছে, ওই মামলায় শাহরাস্তি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এস আই) মোঃ নিজাম উদ্দিন ২০১৫ সালের গত ২২ ডিসেম্বর তারেক ও তার মা রুপবান বেগমকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র প্রদান করে। এতে মামলা থেকে ৩ জন অভিযুক্তকে বাদ দেয়া হয়। তারা হলেন : মৃত আব্দুল জলিলের পুত্র তারেকের বন্ধু আবু রায়হান, ছালেহ আহমেদের পুত্র মোঃ শামীম হোসেন ও তারেকের বোন নুরুন্নাহার আক্তার কনিকা। এরপর গত ৩১ জানুয়ারি ২০১৬ এ অভিযোগ পত্রে তদন্ত কর্মকর্তা পক্ষপাতদুষ্ট তদন্ত করেছেন মর্মে উক্ত চার্জশিটের উপর নারাজি আবেদন করেন বাদী। গত ১৬ মার্চ ২০১৬ নারাজি আবেদন মঞ্জুর হয়ে মামলাটি বিজ্ঞ আদালত সিআইডিতে প্রেরণ করে। সিআইডি পুনঃ তদন্ত শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলে আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) আবারো তদন্তের নির্দেশ দেন। বর্তমানে তদন্তাধীন।     
এদিকে, মিনুর ভাই মামলার বাদী শাহাবুদ্দিন জানান জামিনে এসে তারেক ও তার মা তাকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে আসছে। আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারেক জামিন নিয়েছে, তার মা ও বোন প্রকাশ্যে ঘুরছে। তারা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছে, মামলা শেষ হয়ে গেছে, কোনো কিছুই হবে না। শাহাবুদ্দিন আরো জানান, নিজের বোন হারানোর ঘটনার বিচার চেয়ে নিজেই প্রাণ শংকায় রয়েছেন।
ঘটনার ২ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো বিচার না হওয়ায় হতাশ মিনুর মা শাহিদা বেগম। তবে তিনি বিচার পাওয়ার আশায়। তিনি বলেন, আমি একটু বিচার চেয়েছি মাত্র। দোষীদের শাস্তি দেখলে আমার মিনুর আত্মা শান্তি পাবে। মিনুর মৃত্যুর ঘটনায় চাঁদপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার তাদের বাড়িতে এসে সান্ত¡না দেয়ার কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন শাহিদা বেগম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ