শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

কাতালোনীয়া কি স্বাধীন হবে?

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন ইস্যুতে স্পেনের স্বায়ত্বশাসিত রাজ্য কাতালোনিয়া ও কেন্দ্রীয় সরকার মুখোমুখে অবস্থান গ্রহণ করেছে। স্পেনের সংবিধান অনুযায়ি সে দেশকে কোন ভাবেই বিভক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু স্বাধীকার পিয়াসী কাতালোনিয়রা সংবিধান লঙ্ঘন করেই দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার। এ জন্য তারা বারবার গণভোটের আয়োজন করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সে প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। সম্প্রতি গণভোট ঠেকানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কাতালোনিয়ার হাজার হাজার ন্যাশনাল পুলিশের কর্মকর্তাকে মোতায়েন করে। যে স্কুলগুলোতে ভোটকেন্দ্র হবার কথা সেরকম ২০,৩১৫টি স্কুলের মধে ১৩,৯৯টিই আজ পুলিশ বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়াও ইলেক্ট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেবার জন্য কাতালোনিয়ার সরকারের টেলিযোগাযোগ ও আইটি দফতরটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকার।
কাতালোনিয়ার জনসংখ্যা ৭৫ লাখ। যা সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান। স্পেনের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ এই কাতালোনিয়ায়। স্পেনের উত্তর-পূর্বের এই প্রদেশটির রাজধানী বার্সেলোনা। তাদের আছে নিজস্ব ভাষাও। বার্সেলোনা বিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয় শহরগুলোর একটি। ফুটবল এবং একই সাথে পর্যটনের কারণে। স্পেন সরকার বলছে, এই গণভোট অবৈধ। শুধু তাই নয়, আদালত থেকেও এই ভোটের আয়োজন বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই কাতালোনিয়ার সরকার স্কুলগুলোতে ভোটকেন্দ্র বসানোর চেষ্টা করেছে। তাতে বাধা দিয়েছে পুলিশ।
শুধু তাই নয়, কাতালোনিয়ার সরকারের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করা হয়। জব্দ করা হয় ব্যালট পেপার, স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতেও তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু ভোটের পক্ষে রাস্তায় নেমে এসেছেন কাতালানরা। কেন্দ্রীয় সরকারের বাধার প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, স্পেনের ক্ষুদ্র একটি অংশ হয়েও তারা কেন স্বাধীনতা চাইছে, আর এর সম্ভাবনাই-বা কতোটা?
বস্তুত কাতালোনিয়া স্পেনের অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। এর লিখিত ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। স্পেনের গৃহযুদ্ধের আগে এই অঞ্চলের ছিলো বড়ো রকমের স্বায়ত্বশাসন। কিন্তু ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময় কাতালোনিয়ার স্বায়ত্বশাসনকে নানাভাবে খর্ব করা হয়। কিন্তু ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর সেখানকার জাতীয়তাবাদ আবার শক্তিশালী হতে শুরু করে। এবং তীব্র আন্দোলন ও দাবির মুখে ওই অঞ্চলকে স্বায়ত্বশাসন ফিরিয়ে দেওয়া  হয়। আর সেটা করা হয় ১৯৭৮ সালের সংবিধানের আওতায়।
স্পেনের সংসদে ২০০৬ সালে একটি আইন প্রণয়ন করা হয় যেখানে কাতালোনিয়াতে আরো কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়। কাতালেনিয়াকে উল্লেখ করা হয় একটি ‘জাতি’ হিসেবে। কিন্তু সংবিধানে কাতালোনিয়াকে দেওয়া এরকম অনেক ক্ষমতা পরে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত বাতিল করে দেয় যা কাতালোনিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
স্বায়ত্বশাসন কাটছাঁট করার ফলে ক্ষুব্ধ হয় কাতালানরা। এর সাথে যুক্ত হয় বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, সরকারি খরচ কমানো, ২০১৪ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আয়োজন করে। তখন ভোটার ছিলো ৫৪ লাখ। ভোটে অংশ নেয় ২০ লাখেরও বেশি ভোটার। এবং কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন যে ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোটার স্পেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায়ও দেন। অর্থাৎ জনরায় হলো কাতালোনিয়া চায় স্বাধীনতা।
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ২০১৫ সালে কাতালোনিয়ার নির্বাচনে জয়লাভ করে। তখন তারা এমন একটি গণভোট আয়োজনের কথা বলে যার আইনি বৈধতা থাকবে এবং সেটা মানতে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হবে। স্পেনের সংবিধানকে লঙ্ঘন করেই তারা এই ঘোষণা দেয়। কারণ সংবিধানে বলা আছে, স্পেনকে ভাগ করা যাবে না। কাতালান পার্লামেন্টে গণভোটের প্রসঙ্গে একটি আইন তৈরি করা হয় এবছরের সেপ্টেম্বর মাসে। সেখানে রাখা হয় মাত্র একটি প্রশ্ন: আপনারা কি চান কাতালোনিয়া প্রজাতন্ত্রের কাঠামোয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে উঠুক? আর সেখানে দুটো ভোট দেয়ার উপায় রাখা হয় হ্যাঁ অথবা না।
বিতর্কিত এই আইনটিতে ভোটের ফলাফলকে মানতে বাধ্যতামূলক করা হয় এবং বলা হয় কাতালোনিয়ার নির্বাচন কমিশন গণভোটের ফলাফল করার দু’দিনের মধ্যে পার্লামেন্টে কাতালোনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। কাতালান প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন, অন্য কোন আদালত বা রাজনৈতিক শক্তি তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে বরখাস্ত করতে পারবে না। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাখয় এই ভোটকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করেন। বলেন, “আমি অত্যন্ত নরম সুরো কিন্তু কঠোর করে বলতে চাই কোন গণভোট হবে না।”
প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত কাতালোনিয়ার ওই আইনটিকে বাতিল করে দেয়। এতে কাতালানরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এবং তারপর থেকেই স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার কাতালোনিয়ার অর্থনীতি ও পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। গণভোটের আয়োজনকারী কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। জব্দ করা হয় এক কোটি ব্যালট পেপার এবং যেসব ওয়েবসাইটে এই গণভোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেগুলো বন্ধ করে দেয়া  হয়েছে।
সম্প্রতি দীর্ঘদিন ধরে জারি থাকা স্বাধীনতার দাবিতে আবার মুখরিত হয়েছে কাতালোনিয়ার রাজপথ। ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কাতালোনিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন। আর এই ভোটাভুটিকে দেখা হচ্ছে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণী নির্বাচন হিসেবে। পার্লামেন্ট নির্বাচনে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষ জয়ী হলে জোরতালে শুরু হবে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মকান্ড। বার্সেলোনা হবে সেই নতুন দেশের রাজধানী।
অন্যদিকে সমূহ বিপদের আশঙ্কায় কাতালানদের এই দাবি মেনে নিতে নারাজ স্প্যানিশ সরকার। কাতালোনিয়া স্বাধীন হয়ে গেলে খুবই ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে আগে থেকেই টালমাটাল অবস্থার মধ্যে থাকা স্প্যানিশ অর্থনীতি। খুব কাছেই সতর্কবার্তা হয়ে ঝুলে আছে গ্রিস ট্র্যাজেডি। গ্রিসের মতো ঋণগ্রস্ত স্পেনও আছে দেউলিয়া ঘোষণা হওয়ার আশঙ্কায়। স্পেনের পাশাপাশি ইউরোপের মোড়লরাও হয়তো চাইবেন না কাতালোনিয়ার আলাদা হয়ে যাওয়া। কারণ তাহলে নতুন করে আরেকটি বড় সংকটের মধ্যে পড়তে হবে ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের। এমনিতেই গ্রিস ও সাম্প্রতিক অভিবাসী পরিস্থিতি বেশ জর্জরিত করে রেখেছে তাদের।
উল্লেখ্য, ১১৬৪ সাল পর্যন্ত খুবই শক্তিশালী একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল কাতালোনিয়া। তারপর এটি যুক্ত হয় অ্যারাগনের সঙ্গে। আর ১৪৬৯ সালে অ্যারাগনের রাজা ফার্দিনান্দ ও স্পেনের রানী ইসাবেলার বিবাহবন্ধনের মধ্য দিয়ে স্পেনের সঙ্গে মিলন ঘটে অ্যারাগন ও কাতালোনিয়ার। তখন থেকেই ধীরে ধীরে স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে থাকে কাতালানরা। ১৭১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয় কাতালান রাষ্ট্র। তারপর থেকেই নিজেদের স্বকীয় সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-ভাষা চর্চার স্বাধীনতা হারাতে হয়েছে বলে অভিযোগ কাতালোনিয়ার মানুষদের। যে নিপীড়নের চরম রূপ দেখা গিয়েছে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সামরিক শাসনের (১৯৩৯-১৯৭৫) সময়।
১৯৭০ এর দশকের শেষে স্পেনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর কাতালোনিয়াকে দেওয়া হয় স্পেনের ১৭টি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা। তবে ভেতরে ভেতরে স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনাটাও সবসময় লালন করে গেছে কাতালানরা। সেই দাবি আরও জোড়ালো হয়েছে ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক ধ্বসের পর। নানাবিধ কৃচ্ছ্রতানীতি যারপরনাই অসন্তোষ তৈরি করেছে কাতালোনিয়ায়। ২০১০ সালে কাতালানরা স্প্যানিশ সরকারকে কর দিয়েছে ৬১.৮৭ বিলিয়ন ইউরো। আর তাদের কাছে এসেছে ৪৫.৩৩ বিলিয়ন। কেন্দ্রীয় স্প্যানিশ সরকারের হাতে বিপুল পরিমাণ টাকা চলে না গেলে আরও উন্নয়ন করা যেত বলে কড়া মন্তব্য করেছিল কাতালোনিয়া সরকার।
গত ২০১৪ সালে নভেম্বরে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল একটি অনানুষ্ঠানিক গণভোট। মাদ্রিদে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার অনেক চেষ্টা করেছিল সেটা রুখে দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ২.২ মিলিয়ন ভোটারের ভোটে বিপুলভাবে জয়ী হয়েছিল স্বাধীনতার দাবি। ৮০.৭ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে।
এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অনেকখানি আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে সেই স্বাধীনতার দাবি। কাতালোনিয়ান পার্লামেন্টের ১৩৫টি আসনের মধ্যে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করলেই স্পেন থেকে পৃথক হওয়ার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে দেবে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরা। ইতিমধ্যে তারা গঠন করেছে ‘জান্টস পেল সি’ বা ‘টুগেদার ফর ইয়েস’ নামের একটি জোট। যেখানে আছে কাতালোনিয়ার বর্তমান ও সাবেক তিন প্রধানমন্ত্রীর পার্টি। এই জোট থেকে নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন বার্সেলোনার সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলাও। এই জোটের সঙ্গে আলাদাভাবে কাজ করবে বামপন্থী দল সিইউপি। আর স্বাধীনতার বিপক্ষে লড়বে স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মারিনো রাহোর পার্টি পার্তিদো পপুলার (পিপি) ও কাতালোনিয়ার সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএসসি)।
২৭ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হলে দ্রুতই স্বাধীন হওয়ার কাজ শুরু করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ‘টুগেদার ফর ইয়েস’ জোটের প্রার্থী রাউল রোমেভা। এল পাইস পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা স্বাধীনতার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। আর সবাইকে এটা বুঝতে হবে যে আমরা সত্যিই এই প্রক্রিয়া শুরু করব। আমরা সম্ভাব্য সব উপায়ে এটা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা (স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার) এটা আমাদের করতে দেয়নি। ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বরের গণভোটের পর আমরা যেটা করতে পারিনি সেটা করার সময় এবার এসে গেছে।’ নিজেদের স্বাধীন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট আর্থার মাস। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কর কর্তৃপক্ষ, কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট আকারের একটা সেনাবাহিনীও গড়ে তোলার কথা ভাবছেন মাস।
গত ১১ সেপ্টেম্বর কাতালোনিয়ার জাতীয় দিবসে বার্সেলোনার রাজপথ আবার মুখরিত হয়েছিল স্বাধীনতার দাবিতে। প্রায় ১.৪ মিলিয়ন মানুষ কাতালোনিয়ার পতাকা নিয়ে বর্ণিল র‌্যালি করেছিলেন বার্সেলোনার রাজপথে। তরুণ- তরুণীরা নেচে-গেয়ে উদযাপন করেছিলেন কাতালানদের স্বকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।  ফ্রাঙ্কোর একনায়ক শাসনামলে স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছিল ৯১ বছর বয়সী জোয়াকিম ব্যাটলকে। এখন তিনি হাঁটেন ক্রাচে ভর দিয়ে। কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্রও কমেনি তাঁর স্বাধীনতার স্পৃহা। ব্যাটল বলেছেন, ‘আমি প্রবল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দিকে। আমরা এ জন্য অনেক শতক ধরে অপেক্ষা করছি। আর আমার বিশ্বাস এখন সেই সময় চলে এসেছে।’
সর্বশেষ প্রাপ্ততথ্যে জানা গেছে, স্পেনের কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটে অঞ্চলটি জনরায় পেয়েছে। কাতালান কর্মকর্তারা জানান, শতকরা ৪২.৩ ভাগ ভোট পড়েছে এবং ভোটারদের ৯০ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে কাতালোনিয়া রাষ্ট্র গঠনের অধিকার পেয়েছে বলে দাবি করেছেন সেখানের আঞ্চলিক নেতা কার্লেস পুজদেমন।
সম্প্রতি অক্টোবর স্পেনীয় পুলিশের ব্যাপক বাধা সত্ত্বেও স্বায়ত্তশাসিত কাতালুনিয়ায় স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটে অংশ নেয় কাতালানবাসীরা। স্পেনের সাংবিধানিক আদালত স্বাধীনতার প্রশ্নে কাতালোনিয়ার গণভোটকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পর ভোট বন্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছিল স্পেন সরকার। গণভোট বন্ধের চেষ্টায় পুলিশের শক্তি প্রয়োগে সৃষ্ট সহিংসতায় ৭৬১ জন আহত হয়েছেন বলে জানান কাতালানের জরুরি বিভাগের কর্মকর্তারা। বার্সেলোনার মেয়র আডা কোলাউ নিরস্ত্র মানুষের ওপর পুলিশি হামলা বন্ধের আহ্বান জানান।
পুলিশ কর্মকর্তারা কিছু মানুষকে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়। ভোট কেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স জব্দ করে নিয়ে যায় পুলিশ। কাতালোনিয়া অঞ্চলের রাজধানী বার্সেলোনায় পুলিশ গণভোটপন্থীদের প্রতিরোধ দমনে লাঠি চার্জের পাশাপাশি রাবার বুলেটও নিক্ষেপ করে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সহিংসতায় ১২ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, পুলিশ গণভোটের ব্যালট বাক্স বাজেয়াপ্ত করতে গেলে জনতা তাদের ওপর পাথর ছুঁড়তে থাকে, এতে ১২ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। মন্ত্রীরা এই গণভোটকে প্রহসন বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং রাবার বুলেট ও লাঠি ব্যবহার সমর্থন করেছেন।
ফলাফল ঘোষণার পর একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার দরজা উন্মুক্ত হয়ে গেছে বলে টেলিভিশন ভাষণে দাবি করেন পুজদেমন। ভাষণের সময় অন্য জ্যেষ্ঠ কাতালান নেতাদের পুজদেমনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘আশা ও দুর্ভোগের এই দিনগুলোতে কাতালোনিয়ার নাগরিকরা প্রজাতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার অর্জন করেছে। আমার সরকার, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আজকের এই ভোটের ফলাফল কাতালান পার্লামেন্টে পাঠাবে যেন পার্লামেন্ট গণভোটের আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে। পার্লামেন্টেই আমাদের জনগণের সার্বভৌমত্ব বিরাজ করছে।
মূলত কাতালোনিয়ার মানুষ স্বাধীনতা চায়। ভোটও দিয়েছে স্বাধীনতার পক্ষে। সবই জানালেন কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্লোস পুজেমন। মনে করা হয়েছিল যে, তিনি শীঘ্রই ওই স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যটির স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন।  কিন্তু এখনই স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন না তিনি। স্পেনের সঙ্গে আরো আলোচনা করতে চান তিনি। সময় নিলেন আরো কয়েক সপ্তাহ। কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনায় আঞ্চলিক পার্লামেন্টের অধিবেশনে এসব কথা জানান কার্লোস পুজেমন। গত ১০ অক্টোবর স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ভাষণ দেন তিনি।
বিবিসি জানায়, ইউরোপসহ সারাবিশ্বের মনোযোগের বিষয় ছিল পুজেমনের ওই ভাষণ। অধিকাংশের ধারণা ছিল ওই ভাষণের মাধ্যমেই স্বায়ত্ত্বশাসিত ওই অঞ্চলের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন তিনি। আলোচনার পথ খোলা রেখেই ভাষণ শেষ করলেন পুজেমন। গত ১ অক্টোবর কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা প্রশ্নে ওই এলাকায় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই গণভোটে ৯০ শতাংশ ভোট পড়ে স্বাধীনতার পক্ষে। যদিও মাদ্রিদ অর্থাৎ স্পেনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ওই ভোট অবৈধ এবং দেশটির আদালতও তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
মূলত কাতালানবাসীরা গণভোটের মাধ্যমে তাদের স্বাধীকারের পক্ষেই রায় দিয়েছে। কিন্তু স্পেন সরকার এই গণভোটকে কোন ভাবেই বৈধ বলে স্বীকার করে না। ফলে গণরায় কাতালানদের পক্ষে আসলেও তাদের স্বাধীনতা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও রয়ে গেছে। দেশটির প্রেসিডেন্টও স্বাধীনতা ঘোষণা বিষয় অতি তাড়াহুড়ার পক্ষে নন। কারণ, এখনই স্বাধীনতা ঘোষণা করলে রাজ্যটির ওপর  কেন্দ্রীয় সরকার বলপ্রয়োগের সম্ভবনাটা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। বসে থাকবে না স্বাধীনতা পিয়াসী কাতালোনীয়রাও। ফলে স্পেনে একটা গৃহযুদ্ধের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। পরিণতিতে কী তা দেখার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে বৈকি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ