শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই খুলনায় চলছে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির প্রতিষ্ঠান

খুলনা অফিস : খুলনায় ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির প্রতিষ্ঠান। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই নির্দিধায় চলছে এ ব্যবসা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পাচ্ছে বিস্ফোরক লাইসেন্স। লাইসেন্স করতে মাত্র সাড়ে ১১শ’ টাকা দরকার। সেখানে নেয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা। ফলে ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

খুলনা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সূত্রমতে, খুলনায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান আছে ৪৮০টি। লাইসেন্সের জন্য আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও ৭১টি। তবে এখানে অবৈধ দোকানের হিসাব না থাকলেও মালিক সমিতির নেতারা জানান, নগরীতে অবৈধ গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান রয়েছে তিন শতাধিক।

খুলনা এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শেখ তোবারেক হোসেন তপু বলেন, নগরীতে পান দোকান, মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, লন্ড্রির দোকান, সিমেন্ট বিক্রির দোকানসহ ফুটপাতে ছোটখাটো দোকানে প্রকাশ্যে গ্যাস ও সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বৈধ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ী। খুলনার বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে যাকে তাকে বিস্ফোরক লাইসেন্স দিচ্ছে। সংগঠনের ব্যানারে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিলেও কিছুই হয়নি। অবিলম্বে এ অবৈধ ব্যবসা বন্ধসহ তাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান এ নেতা। তিনি বলেন, খুলনা নগরীতে শতাধিক বৈধ গ্যাস সিলিন্ডার দোকান রয়েছে। কিন্তু তিন শতাধিক অবৈধ দোকান থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য বিস্ফোরক লাইসেন্স পেতে হলে বিস্ফোরক অধিদপ্তর খুলনার কার্যালয়ে আবেদন করতে হয়। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, লাইসেন্স করতে একজন ব্যবসায়ীর খরচ হয় ১২৮০ টাকা। এর মধ্যে ১১শ’ টাকা লাইসেন্স বাবদ ও ১৮০ টাকা ভ্যাট বাবদ। কিন্তু অতিরিক্ত উৎকোচের বিনিময়ে ব্যবসায়ীরা বিস্ফোরক লাইসেন্স সংগ্রহ করতে ব্যস্ত থাকেন।

খুলনা চুলা অ্যান্ড গ্যাস হাউজের মালিক নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, গ্যাস ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স পেতে হলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তাকে ২০/৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে লাইসেন্স হয় না। আর ঘুষ দিলে কোন নিয়ম কানুন লাগে না। মুদি দোকানসহ যে কোন দোকানের বিপরীতে বিস্ফোরক লাইসেন্স দিয়ে থাকেন। এজন্য প্রকৃত গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪-এর দ্য এলপি গ্যাস রুলস ২০০৪-এর ৬৯ ধারার ২ বিধিতে লাইসেন্স ব্যতীত কোন ক্ষেত্রে এলপিজি মজুদ করা যাবে তা উল্লেখ আছে। বিধি অনুযায়ী, ৮টি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদকরণে লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। একই বিধির ৭১নং ধারায় বলা আছে, আগুন নেভানোর জন্য স্থাপনা বা মজুদাগারে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুদ রাখতে হবে। এ আইন অমান্য করলে ওই ব্যবসায়ী ন্যূনতম দু’বছর এবং অনধিক পাঁচ বছরের জেল এবং অনধিক ৫০ হাজার টাকার অর্থদন্ডে-দন্ডিত হবেন এবং অর্থ অনাদায়ী থাকলে অতিরিক্ত আরো ছয় মাস পর্যন্ত কারাদন্ডের বিধান রয়েছে।

খুলনা এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতির জয়েন্ট সেক্রেটারি আব্দুল ওয়াদুদ জানান, খুলনার বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লোকজন গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে নানা কৌশলে টাকা আদায় করে থাকেন। অনেক আগে ওই অফিস থেকে বিস্ফোরক লাইসেন্স পেতে দিতে হতো ১৫/২০ হাজার টাকা। এখন তো আরো বেশি লাগে। বিশেষ করে দোকানের নকশা অনুমোদন করা নিয়ে তারা এ ঘুষ বাণিজ্যে মেতে ওঠে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সভা সেমিনারে অতিরিক্ত অর্থ নেয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করলেও কোন পরিবর্তন হয়নি।

খুলনা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিস্ফোরক পরিদর্শক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য অনুমোদন পেতে লাইসেন্স ফি ১ হাজার টাকা আর ভ্যাট ১৫০ টাকা। সব মিলিয়ে ১১৫০ টাকা লাগে। তবে দোকানের নকশা করার বিষয় নিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু লেনদেন হতে পারে। তবে তা ধরা পড়লে কঠিনভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়। তিনি বলেন, লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা সম্পূর্ণ বেআইনি, তবে অনেকেই তা মানছে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, খুলনা-বরিশাল মিলিয়ে ১৬ জেলায় আমিই একমাত্র প্রথম সারির কর্মকর্তা হওয়ায় সব সামাল দেয়া সম্ভব হয় না। সঠিক সময় সেবা দিতে ছুটির দিনও তিনি কাজ করেন। তিনি বলেন, দক্ষিণে কুয়াকাটা আর উত্তরে কুষ্টিয়া তার কর্ম এলাকা। তার অফিসে জনবলের মোট চাহিদা ১০ জন। কিন্তু কর্মরত আছেন ৭ জন। তবে তিনি দীর্ঘ ১১ বছর যাবৎ বিস্ফোরক পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করে আসলেও তার মূল পদ সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক। তিনি বলেন, লাইসেন্স করা নিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে বলে তার কাছেও অভিযোগ আসে। অপরাধ ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলাপ্রশাসক মো. আমিন উল আহসান বলেন, যেখানে সেখানে কোন আইন কানুন না মেনেই নগরীতে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ার বিষয়টি তিনিও অবগত। তবে এ ব্যাপারে সবার আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের এগিয়ে আসতে হবে। তারপরও এসব অবৈধ গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির দোকান বন্ধের জন্য শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হবে বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ