বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রথম মুসলমান গদ্য লেখিকা

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল : (২য় কিস্তি)
নাট্যকার স্থানে স্থানে সংলাপ-রচনার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। যেহেতু শিমুয়েল পিরবক্স খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তাই তাঁর গ্রন্থকে মুসলমান গ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবেনা।
উনিশ শতকের দিকে নারী শিক্ষার প্রতি সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে প্রতিকুল পরিবেশের কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। ফলে কিছু সংখ্যক হিন্দু মহিলা এ সময় সাহিত্য চর্চায় এগিয়ে আসেন। এদের মধ্যে রাস সুন্দরী দেবী, বামা সুন্দরী দেবী, হরকুমারী দেবী, কৃষ্ণকামিনী দাসী, কৈলাস  বাসিনী দেবী, কৃষ্ণ ভাবিনী দাসী, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, স্বর্ণ কুমারী দেবী, গিরিন্দ্র মোহিনী দাসী, প্রসন্ন ময়ী দাসী, কুমুদিনী বসু, ইন্দিরা দেবী প্রমুখ মহিলার নাম উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু পুরো উনিশ শতকে মাত্র সাতজন মুসলিম মহিলার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, তাঁদের মধ্যে চারজনের রচনা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এরা হলেন নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী, হাজী সহিফা বিবি, আজিজননেসা খাতুন ও খায়রুন্নেসা খাতুন। অন্য তিন মহিলা রচনা বামাবোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এদের মধ্যে বিবি তাহেরনন্নেসা, ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করে বামাবোধিনী পত্রিকায় একটি পত্র লিখেছিলেন। এরপর ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে রংপুরের অছিমন্নেসা খাতুন সিদ্দিকার “শরৎ যামিনী” নামের একটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিলো। বামাবোধিনী পত্রিকার সম্পাদক কবিতার শেষে মুসলিম মহিলার বাংলাভাষায় কবিতা চর্চায় আনন্দ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছিলেন। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের লতিফুন্নেসার বঙ্গীয় “মুসলিম মহিলার প্রতি” শীর্ষক একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। সম্ভবত তিনিই ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন (Sonia Nishat, The world of Muslim Women Colonial Bengal. 1876-1939, New york; E.J. BRILL, 1996, P.215)।
এই গুটিকয়েক মুসলিম মহিলার এ সামান্য সাহিত্য সৃষ্টি সমগ্র উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম মহিলার সাহিত্য সাধনারূপে বিরাজ করছে।
খোন্দকার শামসুদ্দীন মুহম্মদ সিদ্দিকীর “উচিত শ্রবণ” অর্থাৎ “পারমার্থিকভাব” (১৮৬০ খ্রি.) গ্রন্থ প্রকাশিত হবার পাঁচ বছরের মধ্যে বিবি তাহেরন নেসা নামক একজন মুসলমান মহিলার রচিত একটি গদ্য নিবন্ধ বামাবোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় যে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই মহিলাকেই সম্ভবত প্রথম মুসলমান গদ্য লেখিকা বলে আখ্যায়িত করা যায়। তাঁর পিতার নাম ছিল মুন্সী মোহাম্মদ তরিকুল্লাহ। তাঁর ১২ জন ছেলে মেয়ের মধ্যে একমাত্র কন্যা ছিলেন তাহেরন নেসা। তাঁর জন্ম সম্ভবত ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ী গ্রামে। রংপুর জেলার প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট ও বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মুসলমানদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কোরআনের বাংলা অনুবাদক খান বাহাদুর তসলিম উদ্দিন (১৮৫২-১৯২৭ খ্রি.) ছিলেন তাঁর আপন ভাই। বিবি তাহেরন নেসার পুত্র ছিলেন দিনাজপুরের প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট ও বিএল উকিল খান বাহাদুর একিন উদ্দিন আহমদ (১৮৬২-১৯৩৩ খ্রি.)
বামা বোধিনী পত্রিকার “বামা রচনা বিভাগে” প্রকাশিত এই নিবন্ধের কোনা নাম দেয়া হয়নি। পত্রিকায় প্রকাশের জন্য রচনাটি লেখিকা তাহেরন নেসা যে ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর-নভেম্বর মাসের আগেই উমেশ চন্দ্র সম্পাদিত বামা বোধিনী পত্রিকা দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন তার প্রমান আছে। তাহেরন নেসার রচনাটি শেষ পর্যন্ত ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ফ্রেব্রুয়ারী-মার্চ সংখ্যায় বামা বোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
তাহের নেসার কোনো বিস্তারিত পরিচয় মেলেনা। তিনি বোদা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। এই বোদা হলো বর্তমান পঞ্চগড় জেলায়। “চন্দন বাড়ি” এই গ্রামেই বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল। কিন্তু ১৮৬৪ সালে কলকাতা থেকে অতদূরে একটি বালিকা বিদ্যালয় কাজ করছিলো এবং তাতে তখন প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত খোলা হয়েছিল- একে খুব সাধারণ ঘটনা বলে মনে করা শক্ত। কোলকাতা থেকে সদ্য প্রকাশিত উমেশচন্দ্র দত্ত সম্পাদিত “বামা বোধিনী” পত্রিকা ও ততদিন সেখানে পৌঁছে গেছে সেটাকেও খুব সাধারণ ঘটনা বলে মনে হয়না। সে যাই হোক তখন বঙ্গদেশে মহিলাদের কোনো উচ্চ বিদ্যালয় ছিলনা। সুতরাং এটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ রকম একটি পাঠশালায় অধ্যয়নরত মুসলিম পরিবারে একটি গ্রাম্য বালিকার পক্ষে লিখতে পারার কৃতিত্বকে অসামান্য বলেই বিবেচনা করা হয়। লেখিকা এ নিবন্ধে তৎকালীন স্ত্রী শিক্ষার উপকারিতা এবং উপযোগিতা বর্ণনা করেছেন। প্রবন্ধের প্রথমে তিনি বলেছেন স্ত্রী এবং পুরুষ শ্রেণি কোনো একটি না-থাকলে পৃথিবীর “পরম মঙ্গলা কর নিয়ম সকল প্রতিপালিত” হতো না, বরং পৃথিবী “জনশূন্য অর ন্যানি তুল্য বোধ হতো” কিন্তু লেখিকা আক্ষেপ করে বলেছেন এ দেশের মহিলারা সেই বিদ্যা ধনে বঞ্চিত হয়ে বিশ্বের অনুপম শৃঙ্খলার মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন। “স্ত্রী লোকেরা স্বল্পবুদ্ধি এবং স্বভাব চঞ্চল”। তাহেরন নেসা সেকালের এই জনপ্রিয় বিশ্বাসকে মেনে নিয়ে বলেছেন বিদ্যার অভাবে এই স্ত্রী লোকদের পক্ষে যে কোনো অনর্থ করা সম্ভব। কারণ “এমন কোনো গর্হিত কর্মই নাই যে তাহা মূর্খ দ্বারা হয় না”। তাছাড়া “অজাত ও মৃতপুত্র কেবল একবার দুঃখদায়ক, কিন্তু মূর্খ সন্তান অসীম দুঃখের উৎস”।
অপরপক্ষে বিদ্যোপার্জনের দ্বারা স্ত্রীগণের হৃদয়াকাশ আলোকিত হলে তারা “শৃঙ্খলার সঙ্গে সংসার ধর্ম প্রতিপালন পূর্বক আপনার ও স্বীয় পরিবারের যে কত অনির্বচনীয় আনন্দোৎপত্তি করতে পারে তা’ বর্ণনা করে শেষ করা যায়না।” নারী সুশিক্ষা পেলে “বিদ্বান পুত্রের মতোই” পিতৃ ও স্বামী উভয়কুল সমুজ্জ্বল করতে পারেন।
উপসংহারে লেখিকা বলেছেন- “যদি ধরাধামকে যথার্থই সুখধাম রূপে দেখার বাসনা থাকে” তাহলে পুরুষ সমাজ যেন সকল ঔদাসীন্য বর্জন করে “স্ত্রীগণকে বিদ্যাভূষায় ভূষিত করতে চেষ্টা” করেন। প্রসঙ্গত লেখিকা লীলাবতি, খনা, রানী ভবনাী প্রমুখ মহিলার দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করেন।
বিবি তাহেরন নেসা সেকালে নিতান্ত তুচ্ছ বালিকা বিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রী ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর ভাষা এবং রচনাশৈলী সেকালের বহু গদ্য লেখকের তুলনায় পরিণত ছিলো। ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে গোটা বঙ্গদেশে বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯৫তে এবং এসব বিদ্যালয়ে মোট ২,৪৮৬ জন ছাত্রী তালিকাভুক্ত ছিলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাহেরন নেসার অস্তিত্বকে প্রায় অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। তাঁর রচনাটি প্রকাশিত হওয়ার আগে সেটি যে তারই লেখা তার ভালো প্রমাণ পাঠাতে বলা হয়েছিল। লেখিকা নিশ্চয়ই এমন প্রমাণ পাঠিয়েছিলেন যে, নিবন্ধটি তাঁরই রচনা। প্রকাশিত নিবন্ধের শুরুতে বামাবোধিনী পত্রিকার “বামা কুল হিতৈষী সম্পাদক” কে সম্বোধন করে তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেন।  সূতরাং আমরা ধরে নিতে পারি, এটি তাঁর নিজেরই লেখা।
বিবি তাহেরন নেসার আর কোনো রচনা অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। বর্তমান প্রবন্ধটি তাহেরণ নেসার প্রকাশিত রচনার মধ্যে সম্ভবত সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ। বর্তমান রচনায় যে মহৎ সম্ভাবনার বীজ লুকানো ছিলো, হয়তো লেখিকার বিবাহের ফলে সেকালে বহু মহিলার মতোই তা’অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছিল। কিন্তু তা’ সত্ত্বেও বলা যায়, সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য নিবন্ধটি স্ত্রী শিক্ষার গুণগত মানের বিচারে এতো অসাধারণ যে এরই দাবিতে বিবি তাহেরণ নেসা প্রথম যুগের মুসলমান গদ্য রচয়িতাদের মধ্যেতো বটেই এমনকি তাবৎ মহিলা লেখকের মধ্যেও একটি বিশিষ্ট স্থান লাভ করতে পারে।
(চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ