বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

‘আসবে আবার আশ্বিন-হাওয়া

শফি চাকলাদার : আশ্বিন মাস। বঙ্গাব্দের ষষ্ঠ মাস। শিউলী ফুল ফোটার মাস। শীতকাল যথেষ্ট দূরে হলেও শিশির আনাগোনা লক্ষ্যণীয়। খুব প্রত্যুসে সবুজ ঘাসের দিকে তাকালে ঘাসের উপর বিন্দু বিন্দু জমে থাকা শিশির মুগ্ধ করে মনকে এবং তখন প্রথম সূর্য-কিরণ যে সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে তা মনকে আকৃষ্ট করে। যেখানেই শিউলি ফুল গাছ খো যায়, গাছতলায় ভরে থাকে শিউলি ফুলি-শুভ্রতার সাথে কমলা রঙের বোটা আলাদাভাবে সৌন্দর্য বিকাশ করে। শীতের আমেজ ভরা দিন এবং রাত আশ্বিন মাসের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলে। খুব বেশি না হলেও মন কেড়ে নেয়া বাক্য-বিন্যাস-মাধ্যমে নজরুল এই আশ্বিন মাসের রূপ-সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন। শুরু করছি কবিতার মালা দিয়ে-
* আজ আকাশ ডোবানো নেহারি তাঁহারি চাওয়া,
    ঐ শোকালিকা-তলে কে বালিকা চলে?
    কেশের গন্ধ আনিছে আশিন-হাওয়া!   
    এনেছে রে সাথে উৎপলাক্ষী চপলা কুমারী কমলা ঐ
    সরমিজ-নিভ শুভ্র বালিকা
    এল      বীণা-পাণি অমলা ঐ।
                              Ñআগমনী

*    আজ মুক্ত-বেণী মেয়ে একাকী চলে,
    ঐ শেফালি-তলে হের শেফালি-তলে।
    ওড়ে এলোমেলো অঞ্চল আশ্বিন-বায়,
    হানে চঞ্চল নীল চাওয়া আকাশের গায়!
                              -জাগৃহি

*    বেদনা-হলুদ-বৃন্ত কামনা আমারৎ
    শেফালির মত শুভ্র সুরভি-বিথার
    বিকশি উঠিতে চাহে, তুমি হে নির্মম,
    দলো বৃন্ত ভাঙো শাখা কাঠুরিয়া সম!
    আশ্বিনের প্রভাতের মত ছলছল
    করে ওঠে সারা হিয়া, শিশির-সজল
    টলটল ধরণীর মতো করুণায়।
                         -দারিদ্র্য

*    আজ  আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর,
    আসল নিকট, আসল সুদূর,
    আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন
    পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে!
    ঐ   আসল আশিন শিউলি শিথিল
    হাসল শিশির-দুব্ঘাসে!
    আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
                   -আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে

*    আসবে আবার আশিন-হাওয়া, শিশির ছেঁচা রাত্রি,
    থাকবে সবাই-থাকবে না এই মরণ-পথের যাত্রীই!
আসবে শিশির-রাত্রি।
থাকবে পাশে বন্ধু-স্বজন,
থাকবে রাত্রে বাহুর-বাঁধন,
বঁধূর বুকের পরশনে
আমার পরশ আনবে মনে-
বিষিয়ে ও বুক উঠবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
                             -অভিশাপ

*    না ফুরাতে শরতের বিদায় শেফালি,
    না নিবিতে আশ্বিনের কমল দীপালি,
    তুমি শুনেছিলে বন্ধু পাতা-ঝরা গান
    ফুলে ফুলে হেমন্তের বিদায়-আহ্বান।

    বন্ধু তব জীবনের কুমারী আশ্বিন
    পরিল বিধবা বেশ কবে কোন দিন,
    কোন দিন সেঁউতির মামলা হতে তার-
    ঝরে গেল বৃন্তগুলি রাঙা কামনার-
                             -  গোকুল নাগ

* শারদ-প্রাতে কমলবনে তোমার নামের মধু পিয়ে
বাণীদেবীর বীণার সুরে ভ্রমর বেড়ায় গুনগুনিয়ে!
মোর নামের মিল মিলিয়ে
ঝিল ওঠে গো ঝিলমিলিয়ে
আশ্বিনে কয়, তোর যে বিয়ে
গায়ে হলুদ শেফালিকুা!
-নামিকা
* ভূতো ছেলেগুলো কলেজেতে পড়ে, কে জানে ক’ল্যাজ পায় হোথায়,
 কেহ শাখা-মৃগ হইয়াছে উঠি আধ্যাত্মিক উঁচু শাখায়!’
 এমনি শরৎ সৌরাশ্বিনে অকাল বোধনে মহামায়ার
 যে পূজা করিল বধিতে পাবণে ক্রেতার স্বয়ং রামাবতার।                      -পূজা-অভিনয়

নজরুল কবিতায় আশ্বিন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ‘অভিশাপ’ কবিতাটির দু’টি শব্দ মিলে একটি শব্দ অর্থ’র প্রতি দৃষ্টি পড়ল। ‘অভিশাপ’ কবিতায় যেমন ‘শিশির ছেঁচা’ পাই তেমনি অন্য কটি কবিতা থেকে মাত্রাকট উদাহরণ দিচ্ছি- ‘ছন্দ-মাতন’ (আজ সৃষ্টিমুখের উল্লাসে), ‘খুন-রঙিন, (কামাল-পাশা), খুন-খেগো (আনোয়ার), খুন- গৈরিক (রণ-ভেরী), খুন-খারাবি (শাত-ইল-আরব), খুন-মাতন, খুন-মোচন  কোরবানি), খুন-খচা মোহররম) ইত্যাদি শব্দগুলো কবিতাগুলোকে পড়ার লক্ষ্যে আকর্ষণীয় করে তোলে। যাই হোক, আটটি কবিতায় আশ্বিন মাসকে পাওয়া গেল। আশ্বিন মাসের প্রাকৃতিক রূপ বর্ণনায় কবিতাগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব হবে। এর মধ্যে অ-নামিকা’র দুলাইন ‘আশ্বিনে কয়, তোরযে বিয়ে/গায়ে হলুদ শেফালিকা’ মাত্র কটি শব্দের বুণন কিন্তু পুরো আশ্বিন মাসকেই যেন মূল্যায়ন করা হলো বলা যায়।
এবার গল্প,পত্রোপন্যাস, পত্রতে নজরুলের আশ্বিন উপলব্ধি লক্ষ্য করছিÑ
* আর পাছে আমার কাছে ধরা পড়ে অপ্রতিভ হয়ে যান, তাই তাড়াতাড়ি ধ্যাৎ, চোখে কি ছাই পড়ে গেল’ বলে চোখ দুটো কচলাতে থাকতেন, নয়তো এস্রাজটা নিয়ে সুর বাঁধায় গভীর মনোনিবেশ করতেন। আহা, খাপছাড়া আশ্বিনের এক টুকরো শুভ্র সজল চপল মেঘের মতো নুরু, যা কভু জমে হয়ে যায় শক্ত তুহিন, আবার গলে ঝরে পড়ে যেন শান্ত বৃষ্টিধারা (সালার ১২ ফালগুন (বাঁধা হারা ছ)
* আজহার বলে উঠল, ‘আমি প্রতি বছর এমনি পয়সা আশ্বিন শিউলিফুলের মালা হলে ভাসিয়ে দেই। এ মালা জলের অন্য কারুর নয়।’ মুখে বিষাদ মাখা হাসি। (শিউলি মালা ১)
চৌধুরী সাহেব উঠে যেতে আমি বললাম, ‘আচ্ছা ভাই শিউলি আবার যখন এমনি আশ্বিন মাস- এমনি সন্ধ্যা আসবে তখন কি করব বলতে পার? ( ঐ-৩)
আমি নীরবে সায় দিলাম- তাই হবে। জিজ্ঞাসা করলাম- ‘তুমি কি করবে।’ সে হেসে বললে, ‘আশ্বিনের শেষে তো শিউলি করেই পড়ে। (ঐ-ঐ-
শিউলি ফুল- বড় মৃদু, বড় ভিরু, গলায় পরলে দু’দণ্ডে আঁউরে যায়। তাই শিউলি ফুরে আশ্বিন যখন আসে- তখন নিরবে মালা গাঁথি আর জলে ভাসিয়ে দিই। (ঐ-ঐ)
নজরুল যে সমুদয় পত্র লিখেছেন সেখানেও ‘আশ্বিন’ তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিশয় নেই কৃষ্ণনগর থেকে ১২-১১-২৭ এ মাহফুজুর রহমান খানকে লেখাপত্র।
‘নওরোজ’ বন্ধ হবে কি না জানি না, তবে আজো আশ্বিন সংখ্যা বেরোয়ানি।
০৪-০৯-১৯৩৮ এ বরদাচরণ মজুমদারকে লেখা পত্র স্থানের নাম উল্লেখ নেই-
গত বছর আশ্বিন কি কার্তিক মাসে শশী নামক একটি ঝি বাড়ির বাসনপত্রে মাজিত, বোধ হয় মাসখানেক সে কাজ করিয়াছিল সে এ পাড়াতেই কোথাও থাকিত- এম সেরাজুল হককে লেখা পতুতে তারিখে পাই- কলিকাতা ৩০শে আশ্বিন ১৩৩৯। সঙ্গীতের কবি নজরুল আশ্বিনমাসকে নিয়েও গান রচেছেন। সংখ্যায় কম হলেও গানগুলো জনপ্রিয়তে বটেই-
অতীত প্রণয় স্মৃতি সুরি’
কেঁদে যায় আশ্বিন হাওয়া,
উড়ে বেড়ায় বর সে ভ্রমর
কমল-পরাগ মাখিয়া
(আজ শেফালির গায়ে হলুদ) পিলু কাটা

আশ্বিনের পর সী প্রিয় এল ঘর (গো)
সখিরে, মিটিল বধূর মন সাধ,
রাধার চোখের জলে মলিন হইয়া যায়
কোজাগরী চাঁদ।
(কেমনে রাধার কাঁদিয়া বরষ যায়) কীর্তন

ভাদ্র মাস, ভাদ্র মাসে আপনার বৌ হলো ভাদ্র বধূ (বাবু গো)
আশ্বিন মাসে চাখলাম না হায় পূজার মজার মধু
আমার পরনে লাকায় পাঁঠা যেমন দাপায় হাঁড়িকাঠে ও দাদাগো ॥
(আমার বিছানা আছে) তোল- কেরতা

 মোর মা যে প্রতি আশ্বি মাসে
মামা মা বলে ছুটে আছে;
মা আসেনি বলে আজও
ফুল ফোটনি লতায় গাছে ॥
(আজার আনন্দিনী উজা আজো)

বর্ষা গেল, আশ্বিন এল, উমা এস কই।
শূন্য ঘরে কেমন করে পরনে ধরে রই ॥

আশ্বিন মাসের নাম উল্লেখ করে গানের সংখ্যা পাঁচটিÑ এ পর্যন্ত প্রাপ্ত। এর মধ্যে ‘আজ শেফালির গায়ে হলুদ’ অত্যাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কীর্তনটিও বেশ জনপ্রিয় এবং দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যের গান দু’টিও বিখ্যাত। তবে হাসির গানটি তেমন গাওয়া হয় না। যাই হোক আশ্বিন মাস নিয়ে নজরুলের কবিতা গান গল্প উপন্যাস সবমিলিয়ে উল্লেখের দাবী রাখে। সাহিত্য এবং সঙ্গীত ভান্ডার সমৃদ্ধতো করেছেই এটা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ