বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় কিশোরী ফুটবলাররা

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : মেয়েদের ফুটবল এখন কিছুটা হলেও আনন্দের উপলক্ষ্য নিয়ে আসে। যেমন করে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চূড়ান্ত পর্বে ভাল খেলে ফিরেছে কিশোরীরা। সাফল্যের সোনারোদে বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল। গত বছর দেশে শেষ হওয়া এএফসি অনুর্ধ-১৬ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে অপরাজিত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশের কিশোরীরা। কৃষ্ণা, সানজিদা, মৌসুমী, তহুরারা দেখিয়ে দিয়েছে চেষ্টা আর পরিশ্রম করলে অসাধ্য সাধন করা যায়। বাংলাদেশের মেয়েরা এখন এশিয়ার সেরা আটটি দেশের একটি। তাক লাগানো সাফল্যের পর সবাই বলছেন, এই দলটিকে ঘষেমেজে ঠিক রাখতে পারলে মহিলাদের বিশ্বকাপ ফুটবলেও খেলা সম্ভব। সেই স্বপ্নপূরণের মিশনে ময়দানি যুদ্ধে নেমেছিল বাংলার কিশোরীরা। ২০১৮ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা অনুর্ধ-১৭ মহিলা বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার লক্ষ্যে বাছাইপর্বে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছে লাল-সবুজের দেশ। এশিয়ার সেরা আট দলের অংশগ্রহণে ‘এএফসি অ-১৬ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে’র মূলপর্বে খেলেছে কৃঞ্চা রানীর দল। থাইল্যান্ডের চোনবুরি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণ না হলেও মেয়েদের পারফরমেন্স ভবিষ্যতদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের তিনটি প্রতিপক্ষই ছিল অনেক শক্তিশালী। প্রমীলা র‌্যাঙ্কিংয়ে যেখানে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান শীর্ষ দশে সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। গ্রুপের বাকি দুই দলের অবস্থান র‌্যাঙ্কিংয়ে আরও মজবুত। অস্ট্রেলিয়া এশিয়ার মধ্যে এক নম্বরে, সার্বিকভাবে ষষ্ঠ স্থানে। আর জাপান এশিয়ায় দ্বিতীয় ও সার্বিকভাবে অষ্টম স্থানে। সঙ্গতকারণেই নিজেদের তিনটি ম্যাচেই হেরে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে তিনটি ম্যাচে হারলেও শেষটা খারাপ হয়নি বাংলার মেয়েদের। প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার কাছে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পরের ম্যাচেই আরেক পরাশক্তি জাপানের বিরুদ্ধে নিজেদের ফিরে পায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এই ম্যাচে কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের দল হার মানে ৩-০ গোলে। ১৭ সেপ্টেম্বর নিজেদের শেষ ম্যাচেও দারুণ খেলেছে মাহমুদা, সানজিদা, শামসুন্নাহাররা। থাইল্যান্ডের চোনবুরির ইনিস্টিটিউট অব ফিজিক্যাল এডুকেশন ক্যাম্পাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে লড়াই করে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ২-৩ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। এই ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার বাঘিনীরা। ১০ জনের দল নিয়েও শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে উপহার দিয়েছে দাপুটে ফুটবল। জয়ের দারুণ সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত হারের বেদনা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে। প্রথমে পিছিয়ে পড়লেও পরে সমতা ফেরায় বাংলাদেশ। এরপর এগিয়েও যায়। অগ্রগামিতা বাংলাদেশ ধরে রাখে ৭৭ মিনিট পর্যন্ত। কিন্তু অধিনায়ক কৃঞ্চা রানী সরকার লালকার্ড দেখায় যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে যায়। শেষ দিকে দু’টি কর্নার থেকে দুই গোল হজম করে হেরে গেছে বাংলাদেশ। ম্যাচের শুরু থেকেই কৃষ্ণা-সানজিদাদের খেলায় ছিল প্রত্যয়ের ছাপ। বলের নিয়ন্ত্রণে প্রায় সমানে সমান ছিল বাংলাদেশ। সপ্তম মিনিটে গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় বেঁচে যায় ছোটনের শিষ্যরা। বাঁ প্রান্ত থেকে লউরা এমিলি হিউজের আড়াআড়ি করে বাড়নো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জুলিয়া ভিগনেস ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন। দ্রুত দৌড়ে এসে সøাইড করে বিপদমুক্ত করেন মাহমুদা আক্তার। কিন্তু পরের মিনিটেই গোলরক্ষকের পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে নেন লউরা (১-০)। ১১ মিনিটে ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে ডি-বক্সে বল নিয়ে ঢুকে পড়লেও দুর্বল শটে হতাশ করেন সিরাত জাহান স্বপ্না। সাত মিনিট পর ডান দিক থেকে মারিয়ার নেয়া বাঁ পায়ের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রস্ট হয়। ৩৩ মিনিটে বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। বলের নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের পড়ে যাওয়ার পর অধিনায়ক কৃষ্ণা রানী সরকার সরাসরি লালকার্ড দেখেন। দলের সেরা তারকা মাঠ থেকে বিদায় নিলেও মুষড়ে পড়েনি বাংলাদেশ। বরং স্পট কিক থেকে ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশকে সমতায় ফেরান শামসুন্নাহার (১-১)। ডি-বক্সের মধ্যে স্বপ্নাকে সেসিলিজা ম্যাটিক ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। বিরতির পর আরও উজ্জীবিত ফুটবল উপহার দিতে থাকেন সানজিদা, শামসুন্নাহারা। ফলস্বরূপ ৫১ মিনিটে গোছালো আক্রমণ থেকে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। ডি-বক্সে ঢুকে পড়া স্বপ্নার শট গোলরক্ষক ফেরানোর পর বাঁ দিক থেকে মনিকা চাকমার নিখুঁত কোণাকুণি শট জাল খুঁজে পায় (২-১)। একটু পর স্বপ্নার কাট ব্যাক থেকে পাওয়া সুযোগ মৌসুমী কাজে লাগাতে না পারলে ব্যবধান বাড়েনি। ম্যাচের ৬৫ মিনিটে ফরোয়ার্ড স্বপ্নাকে তুলে নিয়ে মিডফিল্ডার রাজিয়াকে নামান কোচ। একটু পর প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের জোরালো শট পাঞ্চ করে ফেরান মাহমদুা। ৭৫ মিনিটে মিশরাত জাহান মৌসুমীর জায়গায় আরেক মিডফিল্ডার রত্না জাহান নামেন। সমতায় ফিরতে শেষ দিকে মরিয়া হয়ে ওঠে অস্ট্রেলিয়া। পোস্টের নিচে মাহমুদাও ছিলেন দারুণ। কিন্তু শারীরিক উচ্চতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুটি কর্নার থেকেই গোল তুলে নেয় সকারু মেয়েরা। ৭৮ মিনিটে কাইরা রোয়েস্টবাকেনের দূরপাল্লার শট শেষ মুহূর্তে ফিস্ট করে ফেরান গোলরক্ষক মাহমুদা। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার এই ফরোয়ার্ডেরই নেয়া কর্নার বাঁক খেয়ে জালে প্রবেশ করে (২-২)। ৮৩ মিনিটে সোফিয়ার শট ফিস্ট করে ফেরান মাহমুদা। কিন্তু কর্নার থেকে আবারও গোল হজম করে বাংলাদেশ। সতীর্থের হেডের পর গোলমুখে থাকা সোফিয়া সাকালিস লক্ষ্যভেদ করেন (২-৩)। ম্যাচ শেষ দুর্ভাগ্যের কথাই বলেছেন কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। সেই সঙ্গে তিনি উচ্ছ্বসিত মেয়েদের পারফরম্যান্সে। ছোটন বলেন, এ ম্যাচেই বাংলাদেশ নিজেদের আসল ফুটবলটা খেলেছে। কৃষ্ণা থাকলে আমরা জিততে পারতাম। আমাদের দল দুর্দান্ত খেলেছে। ১০ জন নিয়ে খেললেও মনে হয়নি খেলোয়াড় কম ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য জিততে পারলাম না। তিন ম্যাচে ১৫ গোল হজম করার পরও এই মেয়েরা স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ভাল কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা। বিশ্ব ফুটবলের সব শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে লড়েছে মেয়েরা। জাপান ও উত্তর কোরিয়ার কাছে নারী বিশ্বকাপে খেলা নিয়মিত ঘটনা। সেই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা দেখিয়েছে কৃঞ্চা, মাহমুদারা। বয়সভিত্তিক আসরগুলোতে মেয়েদের সাফল্যই এখন ফুটবলে একমাত্র আলোর রেখা। এই মেয়েদের ঘষামাজা করে ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ নারী ফুটবলের আরও বড় মঞ্চেও যেতে পারবে বলে মনে করছেন ফুটবল সংশ্লিষ্টরা। আশার কথা বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) তৈরি হয়েছে নতুন একটি ব্যাচ, যারা ইতোমধ্যে ভারতের সুব্রত কাপ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। শিরোপার সঙ্গে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হয়েছে বিকেএসপির গোলরক্ষক রুপনা চাকমা। ফাইনাল সেরা হয়েছে রেহেনা পারভীন। কৃষ্ণা, সানজিদাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি হচ্ছে রুপনা, রেহেনাদের দলটিও। মিলেমিশে তারাই তো ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। যারা দুমড়ে-মুচড়ে ফেলবে বাঘা বাঘা দলকেও। এমন স্বপ্ন নিয়েই জেগে ওঠার চেষ্টায় ঘুমিয়ে পড়া ফুটবল। এখন দেখা যাক কতটা কি করতে পারে ভবিষ্যতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ