মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

যেন স্বর্ণালি সময়ের সেই আফ্রিদির প্রত্যাবর্তন!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছিলেন আগেই। দেশের হয়ে চালিয়ে যাচ্ছিলেন টি-টোয়েন্টি। কিন্তু হঠাৎ করেই চলতি বছরের শুরুতে টি-টোয়েন্টি থেকেও অবসরের ঘোষণা দিলেন। আর তাতে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনে ইতি টানলেন পাকিস্তানের বুমবুম খ্যাত এই ক্রিকেটার। যদিও ঘরোয়া টি টোয়েন্টিসহ অন্যান্য দেশে অনুষ্ঠিত এই ফরমেটের ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন আফ্রিদি। ২০১০ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন আফ্রিদি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর একদিনের ক্রিকেট থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। ২০১৬ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক ছিলেন। কিন্তু ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভালো করতে পারেনি আফ্রিদির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান। সঙ্গে যোগ হয়েছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে হার। পাকিস্তান আসর থেকে ছিটকে যায় দ্রুতই। পরবর্তীতে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ান এই অলরাউন্ডার। শেষ পর্যন্ত খেলা থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিলেন।
আফ্রিদির বয়স এখন ৩৮ চলছে। এই বয়সেও তিনি একের পর এক রেকর্র্ড করে চলেছেন। মাথা মোটা পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডই (পিসিবি) তাকে চিনলো না। টি-২০ বিশ্বকাপের পর দল থেকে ছুড়ে ফেলা হলো। বাধ্য হয়ে মাঠের বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানো শহীদ আফ্রিদি বুঝিয়ে দিলেন এখনও ফুরিয়ে যাননি। সম্প্রতি ইংলিশ কাউন্টি ন্যাটওয়েস্ট টি-২০ ব্লাস্টে মাত্র ৪৩ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন পাকিস্তান ক্রিকেটের সর্বশেষ স্বীকৃত তারকা। ডার্বিশায়ারের কাউন্টি গ্রাউন্ডে ব্যাট হাতে ঝড় তুললেন ৩৭ বছর বয়সী আফ্রিদি। ১০ চার ও ৭ ছক্কায় খেললেন ১০১ রানের মনোমুগ্ধকর ইনিংস। স্ট্রাইক রেট ২৩৪.৮৮। মজার বিষয়, ওয়ানডতে এক সময়ের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডধারী যে কোন ঘরানার টি২০তে তিন অঙ্কের দেখা পেলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার পর! পুল, হুক আর সুইপের মহড়ায় যেন ক্যারিয়ারের স্বর্ণালি সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন ‘বুম বুম’ আফ্রিদি। ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে কাল অনেকদিন পর ইনিংস উদ্বোধন করতে নেমেছিলেন। সেঞ্চুরি করেছেন ৪২ বলে। যেখানে ৮২ রানই এসেছে চার আর ছক্কা থেকে! সত্যি এ যেন যৌবেনর সেই আফ্রিদি, বুম বুম আফ্রিদি। কাউন্টি সেঞ্চুরি দিয়ে ভক্তদের নস্টালজিক করেছেন আলোচিত এ ক্রিকেটার।
এর মধ্য দিয়ে অবশেষে টি২০তে সেঞ্চুরি পেলেন তিনি, ২৫৬তম ম্যাচে এসে! ঝড় দিয়ে শুরু করা আফ্রিদি পাওয়ার প্লেতেই ১৮ বলে তুলেছেন ৪৫ রান। ১২তম ওভারে সেঞ্চুরি ছোঁয়ার জন্য খেলেছেন আরও ২৪ বল। টি-২০তে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি পেতে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়কের দরকার হয়েছে ৪২টি বল। যদিও ১০১ রানের ৮২ রানই এসেছে ১৭ বলে (১০ চার ও ৭ ছক্কা)। টুর্নামেন্টে আগের সাত ইনিংসে ৫২ বলে ৫০ রান করা আফ্রিদি অনেক দিন পর দেখা দিলেন স্বরূপে। সে কারণেই কিনা আউটও হলেন ঠিক নিজের মতো করে। সেঞ্চুরি করার পরের বলেই আউট আফ্রিদি। আফ্রিদি ফিরলেও হ্যাম্পশায়ারের ঝড় থামেনি। ২০ ওভারে ২৪৯ রান তুলে কোয়ার্টার ফাইনাল জিতে নিয়েছে ১০১ রানে। ১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ী শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে মাত্র ৩৭ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঝড় তুলেছিলেন আফ্রিদি। তবে ২০১৪ সালে আফ্রিদির রেকর্ডটি ভেঙ্গে ফেলেন নিউজিল্যান্ডের কোরি এন্ডারসন।
২০১৫ বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে থেকে অবসর নেয়ার আগে ৩৯৮ ম্যাচ খেলে তিনি ব্যাট হাতে ৮০৬৪ রানের পাশাপাশি ৩৯৫ উইকেট শিকার করেন। সংক্ষিপ্ত ভার্সনে দারুণ সাফল্য পেলেও টেস্ট ক্রিকেটে ঠিক বিপরীত অবস্থানে ছিলেন আফ্রিদি। ক্যারিয়ারে ২৭ টেস্টে তার রান ১৭১৬ এবং উইকেট ৪৮টি। ২০১০ সালে লর্ডসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলেন আফ্রিদি। ৩৭ বছর ১৭৪ দিন, টি-টোয়েন্টিতে প্রথম সেঞ্চুরি পেতে সবচেয়ে বয়স্ক পাকিস্তানী এবং সব মিলিয়ে ষষ্ঠ বয়স্ক ব্যাটসম্যান আফ্রিদি। সব মিলিয়ে রেকর্ডটা পল কলিংউডের (৪১ বছর ৬৫ দিন), আফ্রিদির চেয়ে বয়স্ক অন্য চারজন- সনাৎ জয়াসুরিয়া (৩৮ বছর ৩১৯ দিন), গ্রায়েম হিক (৩৮ বছর ৪৩ দিন), শাইমান আনোয়ার (৩৮ বছর ৩০ দিন) এবং শচীন টেন্ডুলকর (৩৭ বছর ৩৬৫ দিন)। এক সেঞ্চুরিতে আফ্রিদি কত রেকর্ডই না নাড়িয়ে দিয়েছেন। এই না হলে আফ্রিদি। মাঠে, মাঠের বাইরে, অবসরের পরও যিনি আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পছন্দ করেন।
আফ্রিদির সেঞ্চুরির পর আরও কিছু রেকর্ড নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। আফ্রিদির ৪২ বলে সেঞ্চুরিটি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার প্রথম তিন অঙ্ক ছোঁয়া ইনিংস। টি-টোয়েন্টিতে এটি পাকিস্তানী ব্যাটসম্যানের দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি। ২০১২ বিপিএলে বরিশাল বার্নার্সের হয়ে আহমেদ শেহজাদের ৪০ বলে সেঞ্চুরি সবচেয়ে দ্রুততম। আফ্রিদির সেঞ্চুরিটা ইংল্যান্ডের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে যৌথভাবে চতুর্থ দ্রুততম। আর সব মিলিয়ে যৌথভাবে দ্বাদশ দ্রুততম। ২০১৩ সালে ক্রিস গেইলের ৩০ বলে সেঞ্চুরি সবচেয়ে দ্রুততম। ২২২-টি-টোয়েন্টিতে প্রথম সেঞ্চুরি পেতে আফ্রিদির লেগেছে ২২২ ইনিংস। টি-টোয়েন্টি ইতিহাসেই আর কারও প্রথম সেঞ্চুরি পেতে ২০০ বা এর বেশি ইনিংস লাগেনি। আগের রেকর্ড ছিল আরেক পাকিস্তানী উমর আকমলের (১৮৭ ইনিংস)। এরপর আছেন বিরাট কোহলি (১৮১ ইনিংস), আন্দ্রে রাসেল (১৮০ ইনিংস)। কালকেরটি ছিল আফ্রিদির ২৫৬তম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। ম্যাচের হিসাবে প্রথম সেঞ্চুরি পেতে আর কেবল রাসেলের ২০০ এর বেশি ম্যাচ লেগেছিল (২১৮ ম্যাচ)। ১৭৬.০৫- টি-টোয়েন্টিতে ওপেনার হিসেবে আফ্রিদির স্ট্রাইক রেট এটি, যা এই ফরমেটে কমপক্ষে ৫০০ রান করা ওপেনারদের মধ্যে সর্বোচ্চ। আফ্রিদি তার ক্যারিয়ারের ২২২ ইনিংসের মধ্যে মাত্র ২১টিতে ওপেনার হিসেবে ব্যাট করেছেন। এই ২১ ইনিংসে ৩০৯ বলে তার রান ৫৪৪, স্ট্রাইক রেট ১৭৬.০৫। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লুক রনকির (১৭১.০৩ স্ট্রাইক রেটে ৭৪৪ রান)। টি-টোয়েন্টিতে আফ্রিদির ১০ ফিফটি-প্লাস ইনিংসের পাঁচটি এসেছে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে। ৯৮১- ইংল্যান্ডে আফ্রিদির টি-টোয়েন্টি রান এটি। পাকিস্তানে তার রান ৭৩৪, আরব আমিরাতে ৫৭৮। এই ফরমেটে আফ্রিদির আগের সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ৮০। সেটিও হ্যাম্পশায়ারের হয়ে, ২০১১ সালের সেমিফাইনালে সমারসেটের বিপক্ষে। তার ১০ ফিফটি-প্লাস ইনিংসের ৪টিই ইংল্যান্ডে, ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দুটিসহ। আফ্রিদি ফিফটি ছুঁয়েছেন ২০ বলে, যার তার টি- টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে দ্রুততম ফিফটি। পেছনে পড়েছে এ বছরের শুরুতে পিএসএলে পেশোয়ার জালমির হয়ে করাচী কিংসের বিপক্ষে ২৭ বলে ফিফটি। এবারের ন্যাটওয়েস্ট ব্লাস্টে আগের সাত ইনিংসে আফ্রিদির সর্বোচ্চ রান ছিল ১৮, মোট ৫০। কাল এক ইনিংসেই করলেন এর দ্বিগুণ!
ইংল্যান্ডে আফ্রিদির ৪ টি-টোয়েন্টি ফিফটি-প্লাস ইনিংসের সবগুলোই নকআউট পর্বে। এবার ১০১ ছাড়াও তিনি ২০১১ সেমিফাইনালে হ্যাম্পশায়ারের হয়ে করেছিলেন ৮০ এবং অন্য দুটি ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে। ২০৫-আফ্রিদির ছক্কার সংখ্যা এটি, যা পাকিস্তানের কোন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ। প্রথম পাকিস্তানী ব্যাটসম্যান হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে ২০০ ছক্কার মাইলফলক ছোঁয়া আফ্রিদি তার ১০১ রানের ইনিংসে ৭টি ছক্কা হাঁকান। এদিন তিনি সব ফরমেট মিলিয়ে ৮০০ ছক্কার মাইলফলকও পেরিয়েছেন- প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার ছক্কা ১১৫, লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে ৪৮১, আর টি-টোয়েন্টিতে ২০৫টি= ৮০১। আফ্রিদি এদিন ১০১ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচসেরার পুরস্কারও জিতেছেন। এটি তার টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ২৭তম ম্যাচসেরার পুরস্কার। আফ্রিদির চেয়ে বেশি ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছেন কেবল তিনজন- ক্রিস গেইল (৪৮), ডেভিড ওয়ার্নার ও লুক রাইট (২৮)।
এদিকে চলতি বছরের নবেম্বওে শুরু হওয়া বিপিএল এ খেলছেন আফ্রিদি। এছাড়া এবারও বিপিএল সবচেয়ে বেশি বিদেশি ক্রিকেটার পাকিস্তানের। সাত দলে মোট ১৭জন পাক খেলোয়াড় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের টিকিট হাতে পেয়েছেন। উপমহাদেশের কন্ডিশন তথা বাংলাদেশের মাটিতে অন্য দেশের চেয়ে পকিস্তানি ক্রিকেটারদের রেকর্ড খানিকটা উজ্জ্বল। যে কারণেই হয়তো ফ্রাঞ্চাইজিগুলো পকিস্তানি প্লোয়ার কেনায় মন দেয়। ১৭জন পাকিস্তানি ক্রিকেটার হলেন-শহীদ আফ্রিদি, মোহাম্মদ আমির, শাহীন শাহ আফ্রিদি, মোহাম্মদ সামি, উসামা মীর, রাজা আলী দার, হাসান আলী, ফাহিম আশরাফ, ইমরান খান জুনিয়র, শোয়েব মালিক, রুম্মন রইস, জুনায়েদ খান, সরফরাজ আহমেদ, শাদাব খান, উসমান খান শেনওয়ারি, বাবর আজম এবং গুলাম মুদাসসর খান।
২০০৯ টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক আফ্রিদি। সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়ও তিনি। কিন্তু পরের বিশ্বকাপেই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির। ২০১২ বিশ্বকাপেও হাফিজের নেতৃত্বে এক লড়াকু দলের অন্যতম সিপাহসালার মনে করা হচ্ছিল আফ্রিদিকে। যে ম্যারকুটে ব্যাটিং এর কারণে তিনি বুমবুম হয়েছিলেন, সেটিই আজ ফিকে হতে বসেছে। এই টি-টুয়েন্টি ফরমেটই ভাবা হচ্ছিল তার আদর্শ জায়গা। ওয়ানডে ক্রিকেটে যে আফ্রিদি বারবার চার ছক্কার ফুলঝুরি ছড়িয়ে নিখাদ বিনোদন দিতেন, সেই তিনি হতাশ করেছেন দর্শকদের। ওয়ানডেতে ৩৭ বলে সেঞ্চুরি হাকানো বুমবুমকে দীর্ঘদিন দেখতে পায়নি ক্রীড়ামোদীরা। ক্রমেই তিনি হয়ে গেছেন তার ছায়া। ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম সংস্করণে তার ব্যাট সেভাবে কথা বলেনি কখনো। মাঝে মাঝে সামান্য জ্বলে ওঠার আভাস দিলেও পরক্ষণেই প্রত্যাশার পারদে ছাই ঢেলে দিয়েছেন নিজেই। যা তার সাথে মানানসই নয় মোটেই। তবে অনেকদিন পর তিনি যেন যৌবনেই ফিওে গেলেন। দেখা যাক বিপিএল এ দর্শকদেও জন্য আফ্রিদিও কি ম্যাজিক অপেক্ষা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ