মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

শৈশবের সেই দিন

শফিকুল ইসলাম শফিক : শৈশবে কত হাসি, কত আড্ডা, কত গল্প, আর কত ঠাট্টা। সবই আজ পড়ে আছে স্মৃতির পাতায়। জীবনে কখনও সেই সব দিন আর ফিরে আসে না। সবই আজ কাব্যগাথা। শিক্ষা জীবনের প্রথম ধাপ প্রাইমারি। প্রাইমারি স্কুলের প্রিয় শিক্ষক ছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক। স্কুলের সবারই প্রিয় শিক্ষক তিনি। তাঁর মতো শিক্ষক খুঁজে পাওয়া সত্যিই অনেক কঠিন। প্রাইমারি স্কুল জীবনের বন্ধু ছিল- জালাল, জাহাঙ্গীর, এরশাদসহ আরও অনেকে। ওরা ছিল একই গ্রামের বন্ধু। স্কুল ছিল পাশের গ্রামে। বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে সময় লাগত ১৫ মিনিট। একই সাথে স্কুলে যেতাম, পাশাপাশি বসতাম।
আমি ছিলাম ক্লাসের সেরা ছাত্র। স্কুলে অবসরে একই সাথে খেলতাম। স্কুল ছুটি হলে আবার একই সাথে বাড়ি ফিরতাম। কত হৈ-হুল্লোড় করতাম। এভাবে প্রাইমারি স্কুল জীবন কেটে যায়।
এরপর ভর্তি হলাম হাইস্কুলে। সেখানে প্রাইমারির কিছু কিছু বন্ধু থাকল। কেউ ভর্তি হয়ে আর পড়ল না। সেখানে আরও কিছু নতুন বন্ধু পেলাম। হাফিজ, হারুন, ওয়াহেদ, ওয়াজেদ, সেলিম, একরামুল, আব্দুল মজিদ, নাসিরসহ আরও অনেকে। এখন যেন আরও ভালই দিন কাটতে লাগল। তবে কিছু কিছু বন্ধু অনেক দূর থেকে স্কুলে আসতো। ওরা কেউ হেঁটে, আর কেউ সাইকেল নিয়ে আসতো। ভালই পড়াশোনা চলতে থাকে। সবাই মিলেমিশেই থাকতাম। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে জলদি খাওয়া-দাওয়া শেষ করতাম। প্রতিদিন বিকেলে কাছের বন্ধুদের সাথে খেলতে যেতাম। কোন কোন দিন বাড়ি ফিরতাম সন্ধ্যার একটু পরে। কত যে মা বাবার বকা খেয়েছি তার হিসেব নেই। কিছুতেই খেলার লোভ সামলাতে পারতাম না। বিশেষ করে একদিনের কথা এখনও খুব বেশি মনে পড়ে। আমার অজান্তে মজার একটি কা- ঘটল। তখন টিভি দেখার প্রতি খুব নেশা ছিল। আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না। এমনকি আশেপাশের কারও বাড়িতেও ছিল না। টিভি দেখতে যেতাম বাড়ি থেকে একটু দূরে অন্য পাড়ায়। টিভি দেখতে সব বয়সী লোকদের ভীড় জমতো। সারা বাড়ি মানুষ ভর্তি। টিভি না দেখলে তখন কারও যেন পেটের ভাত হজম হতো না। প্রতি শুক্রবারে তখন বিটিভিতে বাংলা ছবি হতো। গ্রামে তখনও ডিশের লাইন ছিল না। তাই বিটিভি ছাড়া অন্য কোন চ্যানেল দেখার কোন উপায় ছিল না।
একদিন ছবি দেখতে গেলাম গাঁয়ের সেই পাড়ায়। আকাশ এক মুহূর্তেই কালো মেঘে ঢেকে গেল। টিভিতে সেদিন ছবিও বেশ দারুণ ছিল। বাড়ি যেতেও মন চাইল না। প্রথমে প্রবল ঝড় বইতে লাগল। এরপর শুরু হলো ঝম ঝমাঝম বৃষ্টি। অনেকক্ষণ পর আবহাওয়া শান্ত হলো। এরপর বাড়ির দিকে যেতে লাগলাম। বাড়ির উঠানে যেতে না যেতেই মা বাবা দুজনেই খুব বকতে লাগলেন। বলল, হাত-পা আজ ভেঙ্গে দিবে। কেন টিভি দেখতে গেছি। আরও অনেক কথা শুনলাম। মা বাবাকে আগে কোনদিন এত ভয় পাই নি। অথচ সেদিন খুব ভয় পাচ্ছিলাম। তখন ছিল সন্ধ্যা রাত। ভয়ে ভয়ে চলে গেলাম এক ভাবীর বাড়িতে। ছোটবেলা থেকেই ভাবী আমাকে খুব আদর-যতœ করতেন। প্রতিদিন ভাবীর বাড়িতে অনেক সময় কাটাতাম। ভাবী প্রথমে হাত-মুখ ধুয়ে দিলেন। এরপর ভাত খেতে দিলেন। ভাত অল্প খেয়েছি। ভাবী বলল, ‘‘চিন্তার কিছু নাই। আমি তো আছি। আমি থাকতে তোমাকে কে মারবে?’’ তোমার আব্বা-আম্মাকে আমিই বুঝিয়ে বাড়িতে রেখে আসবো। কোন ভয় নেই।’’ ভাবীই আমাকে মা বাবার হাত থেকে বাঁচালেন। মা-বাবা তেমন কিছু আর বলেন নি। ভাবী আমাকে রেখে বাড়ি চলে গেলেন। মাঝে মাঝে ভাবী এভাবেই আমাকে রক্ষা করতো। আমাদের বড় একটি জলপাই গাছ ছিল। প্রতি বছরই অনেক জলপাই ধরতো। অনেক জলপাই বিক্রিও করা হতো। সেদিন আমাদের জলপাই গাছের একটি বড় ডাল ভেঙ্গে গেল। মা-বাবার অগোচরে পাড়ার দস্যি ছেলেমেয়েরা এসে অনেক জলপাই চুরি করে নিয়ে গেল। তাই মা বাবার মন একটু বেশি খারাপ ছিল। আমি থাকলে হয় তো খেয়াল করতাম। মা-বাবা আর কিছু বললেন না। অবশেষে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ