মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

পদ্মা বিলে পাখি শিকার

সুহৃদ আকবর : রিফাত আর আনিকা চাচাতো ভাইবোন। ছোটবেলা থেকে তারা একসাথে হেসে-খেলে, কাদামাখামাখি করে বড়ো হয়েছে। একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে পারে না। তারা ক্লাস এবার ফাইভে পড়ছে। তার দুইজন ভালো বন্ধু। বনে-বাদাড়ে ঘোরাঘুরি, বৃষ্টির জলে ভেজা, পাখি ধরা, ফড়িং ধরা, ঘুড়ি উড়ানো তাদের প্রিয় কাজ। ফুল তারা খুব ভালবাসে। মুরুব্বীদেরকে শ্রদ্ধা করে, নিয়মিত স্কুলে যায়; দুষ্ট ছেলে-মেয়েদের মতো কখনো স্কুল পালায় না।
বাড়ির পাশে বড় একটা বিল। সে বিলে নানা ধরণের শাপলা-শালুক ফোটে। পদ্ম বিল নামেও তার পরিচিতি রয়েছে। সে বিলে ফোটে নানা জাতের ফুল; দেখলে যে কারোরই মনটা খুশিতে ভরে উঠবে। আর শীতের সময় সেই বিলে নানা রকম পাখির আনাগোনা লক্ষ করা যায়, তাদের কলধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠে। এ ছাড়া রয়েছে অনেক দেশীয় পাখি। বিলের পাশেই রয়েছে এক বিরাট পাটি পাতার বাগান। বিলের জলে দাপাদাপি করার পর বাগানে এসে পাখিরা একটু জিরিয়ে শরীর-মন তাজা করে নেয়।
আজ শুক্রবার স্কুল ছুটির দিন। তাই মনের সুখে ঘুরতে বেরিয়েছে রিফাত আর আনিকা। রিফাত আর আনিকা ফাঁদ নিয়ে এসেছে পাখি ধরতে। বিলে ধারে পাটি পাতার বনে ভালো একটা জায়গা নির্বাচন করে রিফাত ফাঁদটি সেখানে রাখলো। আনিকাকে বললো, এ জায়গাটা অনেক ভালো আজ তাহলে এখানেই ফাঁদ পাতি, তুই কি বলিস?
আনিকাও রিফাতের কথায় সায় দিয়ে বললো, হ্যাঁ জায়গাটা ভালো বটে আশেপাশে অনেক পাখি দেখা যাচ্ছে। এখানে ফাঁদ পাতলে অবশ্যই পাখি আটকা পড়বে।
ফাঁদটি রাখার পর তারা দূরে একটা বটগাছের গুড়ির নিচে গিয়ে বসলো। চারপাশে সবুজ প্রকৃতি। জিরিজিরি বাতাস। পাখিরা একবার আকাশে উড়ছে আবার বিলের জলে নামছে। রোদের কিরণ লেগে পানি চিকচিক করছে। অপরূপ এক মায়ার ছবি যেন আমাদের এই দেশটা। আরিফ আর আনিকা দেখছে আর পুলকিত হচ্ছে, যেন হারিয়ে যাচ্ছে অজানা এক কল্পলোকের রাজ্যে। যে রাজ্যের রাজা-রাণী হলো তারা দু’জন। অদূরে একটা বকের ঝাক সাদা পোশাক পরে দাড়িয়ে রয়েছে; কোনোটা বড় বড় পা ফেলে মাছ শিকার করছে। আর কোনোটা একদৃষ্টে পানির দিকে তাকিয়ে আছে মাছের সন্ধানে।
ওদিকে দুই বন্ধু গাছের নিচে বসে আছে। আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। হাজারো রঙ-রেরঙের পাখি উড়ছে। একঝাঁক পাখি উড়ে বনের দিকে যাচ্ছে দেখ তারা দু’জন খুশিতে নেচে উঠলো তাদের শব্দে পাখিগুলো আবার বিলের পানিতে ফিরে গেল। মুহূর্তেই তাদের মুখ মলিন হয়ে গেল। পাখির ঝাঁকটা বনে গেলে হয়তো একটা পাখি ফাঁদে আটকা পড়তো, কিন্তু তা আর হলো না।
একটু পর দেখলো, আবার একঝাঁক পাখি বনের দিকে যাচ্ছে; দেখে তারা দু’জন খুশি হলো। চুপচাপ বসে থাকলো গাছের নিচে। কারণ, তাদেরকে দেখে যতি আবার পাখিগুলো পালিয়ে যায়!  তাই দু’জনে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করতে লাগলো। রিফাত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো আকাশে কালো মেঘে জমেছে। একটু পর ঝুম বৃষ্টি নেমে আসবে। আর বিলের দিকে তাকিয়ে দেখছে আরো পাখি আসছে কিনা। আনিকা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ফাঁদটির দিকে। তার চোখজোড়া যেন নড়ছেনা। রিফাত যতই বললো আনিকা, আকাশে অনেক মেঘ মনে হয় পাখি ছাড়াই আজকে আমাদেরকে ঘরে যেতে হবে। সেদিকে আনিকার কোনোই খেয়াল নেই। সে চোখ শুধু ফাঁদটির দিকে। একটু পর তার চোখ চিকচিক করে উঠলো। সে খুশিতে নেচে উঠলো। দেখলো একটা পাখি ডানা ঝাঁপটাচ্ছে, রিফাতকে দেখাতেই রিফাত দৌড়ে ফাঁদটির নিকট গেলো এবং পাখিটিকে ধরে ফেললো। একটা চুমু দিলো পাখির লাল টুকটুকে ঠোটে। এরপর আনিকাকে দিলো আদর করার জন্য। আনিকা পাখিটিকে মায়ের মতো পরম মমতায় বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো। এদিকে বেলা গড়িয়ে গেছে অনেক। গোধূলির রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। তারা তাড়াতাড়ি ফাঁদটি গুটিয়ে নিল। এবং বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো। আলপথ মাড়িয়ে তারা রাস্তায় এসে পড়লো আর একটু পরই তাদের বাড়ি। এখান থেকে বাড়ির সামনের তালগাছটি চোখে পড়ছে।
রাাস্তার পথে হাঁটতে গিয়ে মিজান ভাইয়ের সাথে দেখা। বয়সে তাদের বড়। ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে পড়ে। খুবই ভালো সে। মুখে কয়েক গোছা চিকন দাঁড়ি। গ্রামের সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। মিজান ভাইও বড়দেরকে সম্মান ও ছোটদেরকে অনেক আদর করে। ভালো কথার আদেশ দেয়। ছুটিতে বাড়ি এসেছে।
মিজান ভাইকে আসতে দেখে আনিকা জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছেন মিজান ভাই?
আমি ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?
আমরা ভালো আছি। মিজানের হঠাৎ চোখ পড়লো পাখিটির উপর। তোমার হাতে ওটা কি পাখি আনিকা? কোথায় পেয়েছো? অসুস্থ নাকি?
রিফাত বললো না ভাইয়া, আমরা পদ্মার বিল থেকে ফাঁদ পেতে ধরে এনেছি। খুব সুন্দর পাখি তাই না! হ্যাঁ সুন্দর বটে! মিজান পাখিটিকে ভালো করে দেখলো। চারদিকে তাকিয়ে দেখলো, এখনো ভালো করে অন্ধকার নেমে আসেনি। আনিকা পাখিটির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছে।
মিজান বললো আচ্ছা তোমাদেরকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? রিফাত বললো বলেন মিজান ভাই, কি কথা? আচ্ছা এখন যদি তোমাদের নিকট খবর আসে যে, কেউ তোমাদের মাকে ধরে নিয়ে গেছে তাহলে তোমাদের কাছে কেমন লাগবে?
রিফাত বললো আমি মাকে ছাড়া থাকতেই পারি না। আনিকা বললো, মাকে ছাড়া আমার পেট-ই ভরে না।
মিজান বললো, তবে তোমরা যে পাখিটিকে ধরে আনলে তার বাচ্চাদের কি হবে?
আনিকা রিফাতের দিকে তাকালো, হ্যাঁ তাইতো! বাচ্চাদের কি হবে? আমরাতো এভাবে আগে কখনো ভাবিনি। আমরা এখন কি করবো মিজান ভাই?
মিজান বললো, তোমরা এখন পাখিটিকে ছেড়ে দাও। যাতে সে তার বাচ্চাদের নিকট চলে যেতে পারে। আর শোনো আমাদের প্রিয় নবী এভাবে পাখি ধরতে নিষেধ করেছেন।
রিফাত আর আনিকা একবার চোখেচোখে তাকালো। এবং পাখিটিকে দু’জন অনেক্ষণ আদর করলো এবং ছেড়ে দিল।
পাখিটি ডানা উড়ে গিয়ে একটা গাছের উপর বসলো। সেখানে ডানা ঝাপটিয়ে এরপর উড়ে চলে গেলো তার আপন নীড়ে। রিফাত আর আনিকা একদৃষ্টে পাখির চলে যাওয়া দেখতে লাগলো। এক সময় উড়তে উড়তে পাখিটি তাদের চোখের অদৃশ্যে হয়ে গেলো। হারিয়ে গেলো নীলিমার বুকে। রিফাত আর আনিকা হাসিমুখে বাড়ির দিকে ফিরে চললো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ