মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খাদ্য ঘাটতি খাদ্যমূল্য খাদ্য সংগ্রহ নিয়ে আগাম ভাবনা

জিবলু রহমান : [দুই]
দৈনিক প্রথম আলো : এবারের বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হয়েছে কি?
এ এম এম শওকত আলী : যথাযথ হিসাব এখনো হয়নি। দেশে ফসলি জমির পরিমাণ ২৩ লাখ ২২ হাজার ৪৪৮ হেক্টর। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৭৩ হেক্টর। তবে মনে রাখতে হবে, খেত পানিতে ডুবলেই শস্য নষ্ট হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৪ দিনের বেশি পানি থাকলে শস্য নষ্ট হয়। সে ক্ষেত্রে ঘাটতির পরিমাণ ৩০ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে ১৭ লাখ টন। এ অবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তার দিক দিয়ে আমরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছি। আমদানির জন্য এ পর্যন্ত কী পরিমাণ এলসি খোলা হয়েছে, খাদ্য আসতে কত দিন লাগবে, এসবও বিবেচনায় নিতে হবে। এর সঙ্গে আগামী ফসলের কথা ভাবতে হবে। বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে পানি সরে যেতে শুরু করেছে। আমি যতটা জানি, কৃষি মন্ত্রণালয় মূল্যায়ন কাজ শুরু করছে। তাদের কর্মীরা মাঠে গিয়ে জরিপ করছেন।
দৈনিক প্রথম আলো : কৃষি পুনর্বাসনের কাজ কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে?
এ এম এম শওকত আলী : বন্যার পর প্রতিবছরই পুনর্বাসনের কর্মসূচি নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন, সরকারি খরচে কৃষকদের সার ও বীজ দেওয়া হবে। এটি কৃষি পুনর্বাসনের মূল কাজ। উৎপাদনের খরচ সরকার বহন করবে। কিন্তু মজুরির দায়িত্ব নিতে হবে কৃষককেই। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তুকিতে পাওয়ার টিলার দেওয়া হচ্ছে। তাদের তেলের খরচ দেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। আমাদের দেশে ত্রাণের তালিকা নিয়ে কিছু অনিয়ম ও ক্রটি থাকেই। প্রতিকারের উপায় হলো মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। কৃষি পুনর্বাসনে শুধু বোরোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রবিশস্য ও শাকসবজি উৎপাদনের ওপর জোর দিতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় তো উৎপাদন করছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সেটি ঠিকমতো সরবরাহ করা। বন্যা-পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি সফল করতে হবে।
দৈনিক প্রথম আলো : খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকায় চাল দেওয়া কর্মসূচিকে কীভাবে দেখছেন?
এ এম এম শওকত আলী : এটি আমি কখনো সমর্থন করিনি। মানুষও চায়নি। কেউ তো বলেনি, মানুষ না খেয়ে আছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমে দেখেছি এ কর্মসূচি নিয়ে অনেক অনিয়ম হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তাবেষ্টনী নামে সরকারের যে কর্মসূচি আছে, সেটি প্রান্তিক মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট।
দৈনিক প্রথম আলো : দুর্গত মানুষকে যে খাবার দেওয়া হচ্ছে, তাতে প্রয়োজনীয় ক্যালরি থাকছে কি না?
এ এম এম শওকত আলী : বসতবাড়িতে কেউ ক্যালরি মেপে খায় না। শহর এলাকায় ক্যালরির হিসাব করা হয়। সেখানে অনেকের খাদ্য তালিকায় মাছ-মাংস থাকে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বেশির ভাগ মানুষেরই সেই সুযোগ নেই। ভূমিহীন ও গরিব মানুষই বেশি অপুষ্টিতে ভোগে। এ কারণে বন্যার পর সেখানে পুষ্টিঝুঁকি দেখা দিতে পারে, যাকে বলে হিডেন হাঙ্গার। আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি জোরদার রাখতে হবে। তালিকা যাতে পক্ষপাতমূলক না হয়, সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি ঠিকমতো না চললে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের সংখ্যাও বাড়বে।
দৈনিক প্রথম আলো : খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ন কমিটি (এফপিএমইউ) তো পরিস্থিতি জানত। তাহলে মজুত এত কমল কীভাবে?
এ এম এম শওকত আলী : এদের ভূমিকা মূল্যায়ন করা উচিত। যখন প্রথম ধাক্কা এল, মজুত তিন লাখ টনের নিচে নেমে গেল, তখনই খাদ্য মন্ত্রণালয়কে বলা উচিত ছিল। তারা যদি তা বাস্তবায়ন না করে থাকে, জবাবদিহি করতে হবে।
বন্যার পর মূল কাজ ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু ত্রাণ মন্ত্রণালয় কাজ ঠিকমতো করতে পারবে না, যদি স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের সহায়তা না করেন। অতীতে আমরা উপজেলা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতাম। ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা চেয়ারম্যান স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় তালিকা তৈরি করতেন। তালিকা ঠিকমতো হয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে তদারক করতেন। এই তদারকি থাকা দরকার। বন্যায় রাস্তাঘাটের যে ক্ষতি হয়েছে, সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ২৭ আগস্ট ২০১৭)
২৮ আগস্ট ২০১৭ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা উঠলে খাদ্যমন্ত্রী দেশে খাদ্য মজুদের বর্ণনা দেন। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের, জানুয়ারির মধ্যে দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটাতে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে ১৫ লাখ টন চাল এবং রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে ৫ লাখ টন গম আমদানি করা হবে বলে বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, সভার শুরুতে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল চাল আমদানির বিষয়ে কম্বোডিয়া সফর সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করেন। এ সময় তারা জানান, আগামী ৫ বছর মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন চাল আমদানির জন্য কম্বোডিয়ার সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
এজেন্ডা নিয়ে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে চান-দেশে খাদ্য ঘাটতি কত? তখন খাদ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে খাদ্য ঘাটতি ২০ লাখ টন হবে। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাহলে এই ২০ লাখ টনের বেশি খাদ্যশস্য যেন আমদানি না করা হয়। কারণ প্রয়োজনের বেশি আমদানি করলে দেশের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। চুক্তি অনুযায়ী কবে নাগাদ চাল আসবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শফিউল আলম বলেন, ইতিমধ্যে চাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। (সূত্র : দৈনিক মানব জমিন ২৯ আগস্ট ২০১৭) আমদানি শুল্ক কমানোর পাশপাশি বাকিতে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দিয়েও অস্থিরতা কমছে না চালের বাজারে। লাগামহীনভাবে বেড়েছে পণ্যটির দাম। ফলে নাভিশ্বাস উঠেছে ভোক্তাদের। একটি সিন্ডিকেট কারসাজি করে চালের দাম বাড়াচ্ছে। এই সিন্ডিকেট অবৈধভাবে চাল মজুত করার পাশাপাশি নানাভাবে অপপ্রচার চালিয়ে চালের দাম বাড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে চালের বাজারে অস্থিরতার পেছনে অবৈধভাবে চাল মজুদকারী ১৬ হাজার মিল মালিককে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে সরকার। কিন্তু চালের দাম বাড়ছেই।
দেশে চালের চাহিদা বছরে তিন কোটি টনের মতো। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি সরকার খাদ্যগুদামে চাল মজুদ করে রাখে। সরকারের খাদ্যগুদামে চালের মজুদ এখন তলানিতে। মাত্র চার লাখ টনের মতো চাল মজুদ আছে সরকারের হাতে। সরকারের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের কাছে চালের মজুদ কেমন, তা সরকারের জানা নেই। খাদ্য মজুদ আইন নামের একটি আইন ২০১৩ সালে প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনো সেটি আলোর মুখ দেখেনি। সেই কারণে ব্যবসায়ীদের হাতে চালের মজুদ কেমন আছে, সেটি সরকারের পক্ষে জানা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের কাছে চালের মজুদ নেই।
সারা দেশে ৬০০ ওএমএস ডিলার রয়েছে। ২০১৫ সালের খোলাবাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয় (ওএমএস) নীতিমালা অনুযায়ী ওএমএস কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী খাদ্যশস্যের বাজার মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে মূল্য সহায়তা দেওয়া এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখার জন্য ওএমএস কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। খাদ্য অধিদপ্তর খোলাবাজারে চাল-আটা বিক্রির দাম নির্ধারণ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে। ওএমএস পরিচালিত হয় শনিবার ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। ওএমএসের চাল-আটা বিক্রির জন্য ডিলার নিয়োগ করা থাকে। এসব ডিলারের কাজ তদারকির জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে খাদ্য অধিদপ্তর। প্রতিটি অঞ্চলেই ডিলার বাছাই করার জন্য কমিটি থাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ