বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কমানোর আড়ালে চালের দাম বাড়ানো

সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার পর অনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে অবশেষে চালের দাম কমানোর ব্যাপারে আশ্বাস পাওয়া গেছে। গত বুধবার তিন মন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এক দীর্ঘ ও উত্তেজনাপূর্ণ বৈঠকের পর এই আশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তার সঙ্গে ছিলেন মিলার ও ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা। একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিমন্ত্রী এবং সাবেক মন্ত্রীও অংশ নিয়েছেন বৈঠকে। চালের দামকেন্দ্রিক পরিস্থিতি এরই মধ্যে কতটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছেÑ সে সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন বিশেষ করে মিলার ও ব্যবসায়ীরা। মন্ত্রীদের উপস্থাপিত অভিযোগের জবাবে মূল্য বৃদ্ধির জন্য তারা উল্টো সরকারের আমদানি নীতি ও বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন। এ নিয়ে বৈঠকে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। ব্যবসায়ীরা দায় স্বীকার করতে চাননি। শেষ পর্যন্তও তারা বরং সরকারকেই দায়ী করেছেন। 

সেখানে লক্ষ্যণীয় ছিল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দুর্বল ভূমিকা। ধমক কিংবা হুমকি দেয়ার পরিবর্তে অতি ক্ষীণ কণ্ঠে কথা বলেছেন তারা। তাদের কথা ও সুর ছিল খুবই নরম। কেবলই চালের দাম কমানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। মূল কথায় বলেছেন, যেভাবেই হোক দাম কমাতে হবে। অন্যদিকে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ভুল করেননি ব্যবসায়ীরা। তারা পাটের বস্তা ব্যবহারের বাধ্যতামূলক আইন স্থগিত করিয়ে ছেড়েছেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বর্তমান সংকটের অবসান তথা চালের আমদানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা পাটের বস্তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বেচাকেনা করতে পারবেন। খবরে বলা হয়েছে, অনেক চাল ব্যবসায়ীরই প্লাস্টিক বস্তার কারখানা রয়েছে এবং পাটের বস্তা ব্যবহারের ব্যাপারে সরকারের আইনের কারণে কারখানাগুলো লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে। সে সব ব্যবসায়ীই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় চাল বেচাকেনার অনুমতি আদায় করে নিয়েছেন। এভাবে দীর্ঘ বিতর্ক ও দরকষাকষির পর বৈঠকে এই মর্মে প্রস্তাব নেয়া হয়েছে যে, সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতি কেজি চালের দাম দুই থেকে তিন টাকা কমানো হবে। কারণ জানাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, পাটের বস্তায় চাল আমদানি ও বিক্রি করলে প্রতি কেজিতে তাদের দু’-তিন টাকা বাড়তি খরচ হয়। এর অর্থ, জনগণের কষ্ট লাঘবের জন্য নয়, দাম কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে আসলে ব্যবসায়ীদের খরচ বা লোকসান পুষিয়ে দেয়ার জন্য! 

বলার অপেক্ষা রাখে না, বিগত মাত্র এক মাসের মধ্যে সুপরিকল্পিতভাবেই চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। কোনো কোনো মোটা চালের দাম প্রতি কেজিতে ১০/১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে ব্যবসায়ী নামধারী টাউট ও মুনাফাখোররা। এই সুযোগে চাল বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিশেষ একটি সিন্ডিকেটও তৎপর হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে ওই সিন্ডিকেটের লোকজনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানা যায়নি। পুলিশকে দিয়ে সরকার তখনই লোক দেখানো কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে, যে সময়ের মধ্যে বাড়তি দামের চাপে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাজার টাকার অংকে জরিমানা করার কার্যক্রমকে সাধারণ মানুষও নাটকের বেশি কিছু ভাবতে পারেনি। তাছাড়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত মিলার ও ব্যবসায়ীদের পাশে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দাঁড়াতে দেখা গেছে। সে কারণেও চালের দাম কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। 

মূলত সেজন্যই তিনজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের মাধ্যমে চালের দাম কমানোর ঘোষণাকে যথেষ্ট বলার উপায় নেই। কারণ, একদিকে অনেক দেরি হয়ে গেছে, অন্যদিকে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার পর প্রতি কেজিতে মাত্র দু’-তিন টাকা দাম কমানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এখানে অন্য একটি বিষয়েরও উল্লেখ করা দরকার। বিগত মাত্র কিছুদিনের মধ্যে প্রতি কেজি চালের দাম যেখানে বেড়েছে ১০/১৫ টাকা পর্যন্ত সেখানে মাত্র দু’-তিন টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত কোনো বিচারেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে দাম বাড়ানোর কর্মকান্ডকেই আইনসম্মত করা হয়েছে। কারণ, সত্যিই সদিচ্ছা থাকলে এবং সরকারের দাবি অনুসারে দেশে যথেষ্ট চাল মজুদ থাকলে সরকারের উচিত ছিল দাম আগের পর্যায়ে নামিয়ে আনা। অন্যদিকে কমানোর নামে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তার ফলে দাম আসলে ৮/১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে এবং বেড়ে যাওয়া দামেই মানুষকে চাল কিনতে হবে। বিষয়টিকে কৌশল ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। কারণ, দাম কমানোর আড়ালে আসলে বর্ধিত দামকে বৈধ করা হচ্ছে বলা যায়। সবার চাওয়া চালের দাম অন্তত আগের পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ