শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ইউরোপের এক রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মীর দৃষ্টিতে রাখাইন পরিস্থিতি 

সংগ্রাম ডেস্ক : রাখাইন রাজ্যে থাকাকালীন বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার একজন রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী সংবাদমাধ্যমকে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। সহিংসতা থেকে বাঁচতে রাখাইন ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন ড. হ্লা কিয়াও খুবাইবে নামের ওই রোহিঙ্গা শরণার্থী। নেদারল্যান্ডসের নির্বাসিত জীবনের মনবেদনা তাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় বঞ্চনা আর দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতিভরা রাখাইনে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটিন এর সাংবাদিক দেবায়ন রায়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি বিগত স্মৃতি তুলে ধরেছেন ড. হ্লা কিয়াও। এখন তিনি কাজ করছেন শরণার্থীদের জন্যই। দায়িত্ব পালন করছেন ইউরোপিয়ান রোহিঙ্গা কাউন্সিল এর চেয়ারম্যান হিসেবে।

খুবাইবে তার সাক্ষাৎকারে বর্ণনা করেছেন, কিভাবে পূর্বসূরীদের ভিটেমাটিতেই দমন-পীড়নের শিকার হতে হচ্ছে রোহিঙ্গাদেরকে। কিভাবে প্রতিনিয়ত অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রশ্ন সামনে আসছে তাদের। রোহিঙ্গাদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া হলে তারা দেশটির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে বলে মনে করছেন খুবাইবে। তার দাবি, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সংযোগ থাকার ধারণা একচোখা ও গোঁড়ামিমূলক। ‘আমি একজন রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের যে রাখাইন রাজ্য এখন জ্বলছে সেখানে জন্ম আমার। আমি যখন মাতৃগর্ভে তখন আমার মাকে প্রসব-পূর্বকালীন যতœ পাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি।’ এইটিন নিউজকে জানান খুবাইবে।

রাখাইনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, যদিও এখন আমি সেখানে থাকি না, কিন্তু প্রতিনিয়ত সেখানকার জন্য আমার মন পুড়ছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষদের জন্য টিকে থাকাটা সহজ ব্যাপার নয়। পদে পদে তাদেরকে দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়। এইটিন এর সাংবাদিক দেবায়ন রায়কে বলেন খুবাইবে। ‘সেখানে সড়ক থেকে শুরু করে স্কুল, বাজার থেকে শুরু করে ভ্রমণ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা থেকে শুরু করে শিক্ষা অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চরম নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা কাঠামোগত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।’ বলেন খুবাইবে।

স্কুলে পড়াশোনা করার সময় সহপাঠী ও শিক্ষকদের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়াটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তার দাবি, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের যোগ্যতা থাকলেও রোহিঙ্গারা ভালো ডে পায় না। রোহিঙ্গাদেরকে অর্ধমানব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদেরকে সম্মান পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচনা করা হয় না। ‘আমার এখনও মনে আছে গোটা রাখাইন রাজ্যে ইংরেজিতে প্রথম এবং সবমিলে চতুর্থ স্থান করায় ২০০১ সালের গ্রীষ্মে আমাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পুরস্কার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাকে ইয়াংগুনে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি, কারণ আমি রোহিঙ্গা।’ সাক্ষাৎকারে বলেন খুবাইবে।

খুবাইবের দাবি, লস্কর-ই-তৈয়বা কিংবা ইসলামিক স্টেট এর মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। রোহিঙ্গারা শান্তিপ্রিয় মানুষ যারা কিনা যে দেশে বাস করছে সেখানকার জন্য নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দেয়। তাদেরকে ভারতে আশ্রয় দেয়া হলে দেশটির উন্নয়নে তারা অবদান রাখতে পারে। ‘একচোখা ও গোঁড়ামিমূলক ধারণার ওপর ভিত্তি করে ভারত দাবি করে থাকে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সংযোগ রয়েছে, যা মিয়ানমারের দৃষ্টিভঙ্গিরই সমান্তরাল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই এমন একটি দৃঢ় কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে যা মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিদ্বেষ ও বৈষম্যমূলক মনোভঙ্গি পাল্টাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করবে। যদি পশ্চিম ও প্রাচ্য দশ লাখ রোহিঙ্গার জীবনের মূল্যে ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া বন্ধ করে তখনই কেবল এ চাপ প্রয়োগ সম্ভব হবে।’ মত দেন ওই শরণার্থী ডাক্তার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ