সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মিয়ানমার সেনাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর

 

সংগ্রাম ডেস্ক : মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্থগিত করেছে ব্রিটিশ সরকার। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্মী সেনাবাহিনীর অব্যাহত সহিংসতার মধ্যে ব্রিটেনের কাছ থেকে এই ঘোষণা এলো। বর্মী সামরিক বাহিনীর সাথে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রতিবছরই হয়ে আসছে। এজন্যে ব্রিটেনের খরচ হয় বছরে তিন লাখ পাউন্ড। এই কর্মসূচির আওতায় ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বর্মী সৈন্যদের প্রশিক্ষণের জন্যে অর্থ সাহায্য দিয়ে আসছে। ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত সহিংসতা এবং তাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্রিটেন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই সঙ্কটের গ্রহণযোগ্য কোন সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। ব্রিটিশ সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বর্মী সেনাবাহিনীর প্রতি আমরা আহবান জানাচ্ছি রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ করে বেসামরিক সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে। সেখানে যাতে মানবিক ত্রাণ সাহায্য যেতে পারে তার জন্যেও সেনাবাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে আহবান জানানো হচ্ছে। রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর গত তিন সপ্তাহে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। জাতিসংঘ রাখাইনে বর্মী সেনাবাহিনীর এই হামলাকে তুলনা করেছে জাতিগত নিধন অভিযানের সাথে। শীর্ষ নিউজ।

মিয়ানমারকে অবশ্যই সেনা অভিযান বন্ধ করতে হবে: জাতিসংঘ মহাসচিব

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। গুতেরেস বলেন, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি তার ভাষণে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ মেনে চলার যে অঙ্গীকার করেছেন সেটার তিনি নোট রেখেছেন। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। গুতেরেস আরো বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলছি, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য অনুমতি দিতে হবে।’ রাখাইন রাজ্য থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গুতেরেসের বক্তৃতার কয়েক ঘণ্টা আগেই সু চি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এতে তিনি বলেন, হামলার জবাবে পরিচালিত সেনাবাহিনীর অভিযান গত ৫ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে ঘরবাড়িতে আগুন দেয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকারী বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গুতেরেস বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গোষ্ঠীগত উত্তেজনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়াড আমরা উদ্বিগ্ন।’ এর আগে এক সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেন, সহিংসতা বন্ধ এবং এ বিষয় কথা বলার সু চির এটাই শেষ সুযোগ। মিয়ানমারের দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ভন থিও জাতিসংঘে কথা বলবেন। সু চি বিশ্বনেতাদের এ অনুষ্ঠানে যোগ দেবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।

কে এই নাটের গুরু বৌদ্ধ ভিক্ষু?

মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গা সৃষ্টির পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছেন বৌদ্ধ ভিক্ষু অশিন উইরাথু। গত কয়েক দশক ধরে তিনি তার বক্তৃতা ও বিবৃতিতে মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি মুসলিম ধর্ম বিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার করেছেন। মিয়ানমারের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অশিন উইরাথু তার প্রচারণায় প্রকারান্তরে সেখানকার মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের নিশ্চিহ্ন? করার কথা বলেছেন। ধর্মীয় গুরু হিসেবে মিয়ানমারসহ সারা বিশ্বে তার কয়েক লক্ষ অনুসারী রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাকে বার্মিজ বিন লাদেন বলেও আখ্যায়িত করেছে। জানা যায়, অশিন উইরাথুর জন্ম ১৯৬৮ সালে তৎকালীন বার্মিজ শহর মান্ডালেতে। ১৪ বছর বয়সে তিনি স্কুল ছেড়ে ভিক্ষু বনে যান। ২০০১ সালে তিনি মুসলিম বিরোধী গ্রুপ ‘৯৬৯’ এ যোগ দিয়ে আলোচনায় আসেন। ইসলাম বিরোধী প্রচারণার জন্য মিয়ানমার সরকার ২০০৩ সালে তাকে ২৫ বছরের জেল দেয়। ২০১০ সালে তিনি অন্যান্য রাজবন্দীদের সঙ্গে ছাড়া পান। এরপর তার ইসলাম বিরোধী প্রচারণা আরো জোরদার হতে থাকে। বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী টাইম’স ২০১৩ সালে ২০ জুন অশিন উইরাথুকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপে। সেখানে প্রতিবেদনটির শিরোনাম দেয়া হয় “দ্যা ফেস অব বুদ্ধিস্ট টেরর”। উইরাথু ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গুজব ছড়ান। মান্ডালে শহরে মুসলমান সন্ত্রাসীরা একজন বৌদ্ধ নারীকে ধর্ষণ করেছে-এমন প্রচারণা চালালে সেখানে সহিংসতা শুরু হয়। পরে দেখা যায় ওই মহিলা আদৌ ধর্ষিতা হয়নি। এই বিষয়ে উইরাথুকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বিবিসিকে জানান, লোকমুখে শুনে তিনি এমনটি করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বৌদ্ধদের উত্তেজিত করেছেন। মিয়ানমারের এক টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, মুসলমানরা হচ্ছে আফ্রিকান কার্প জাতীয় মাছের মত। তারা সন্তান জন্ম দেয় বেশি। বৌদ্ধরা তা নয়। মিয়ানমারে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে একসময় বৌদ্ধ ধর্ম হুমকির মুখে পড়বে। মিয়নমারের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইন রাজ্যে যে সহিংসতা চলছে তা উইরাথুর উস্কানির ফল। মিয়ানমারের জান্তা সরকার প্রথমদিকে উইরাথুর কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করলেও এখন তার সাথে সুর মিলিয়েছে। এক্ষেত্রে সূচির অবস্থাও একই। সারাদেশে বিপুল সংখ্যক অনুসারী থাকায় সেনাবাহিনী এবং অং সান সূচি উইরাথুকে ঘাটানোর সাহস পান না। শুধু জাতিগত সহিংসতার উস্কানি নয় উইরাথু মিয়ানমারের নারীদেরও নানাভাবে হেয় করেছেন। মিয়ানমারের নারীরা যাতে অন্য ধর্মের পুরুষদের বিয়ে করতে না পারেন সেজন্য আইন প্রণয়নে উইরাথু চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছেন। তবে নারীবাদি সংগঠনগুলো তার বিরোধিতা করছে প্রবলভাবে। উইরাথু এসব নারীদের দুশ্চরিত্রা এবং বেশ্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বার্মিজ মহিলা লীগের মহাসচিব টিন টিন নাইয়ো বলেন, উইরাথু মিয়ানমারের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। তিনি যে কাপড় পড়েন তার পবিত্রতা নষ্ট করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ