বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ত্রাণ এবং পরিত্রাণের প্রশ্ন-

টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বড় বড় দুর্নীতিবাজদের এখন সরকারই সুরক্ষা দিচ্ছে। একই সাথে দেশে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডও বেড়েই চলছে। প্রতিনিয়ত আইন-শৃঙ্খলারও অবনতি ঘটছে। খর্ব হচ্ছে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়েছে, ২০১৬ সালে দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৯৫ জন, ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিলো ১৯২ জন। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও উঠেছে। উল্লেখ্য যে, ১৭ সেপ্টেম্বর নিজস্ব কার্যালয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
টিআইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে তথ্য ও মতামত প্রদানের ব্যাপারে কিছু বিধানের অপব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে যোগাযোগ ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা উদ্বেগজনকভাবে অপব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে বিতর্কিত আইনের ওই ধারা বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে। রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন উদ্যোগের পরও বাংলাদেশে দুর্নীতি ও ঘুষ, অর্থ পাচার, মৌলিক স্বাধীনতার ব্যত্যয় ও মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত পর্যায়ে কার্যকর নয়। এর পেছনে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, নির্বাহী বিভাগ ও প্রশাসনের আধিপত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই জনগণের কাছে জবাবদিহিতার কোন কাঠামো নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থাও দুর্বল। আইনি সংস্কারের সুপারিশে বলা হয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া সরকারি কর্মচারিদের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, অধিকার ও দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য পাবলিক সার্ভিস আইন প্রণয়ন, পুলিশকে জনবান্ধব করতে পুলিশ আইন-১৮৬১ সংস্কার, বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ ধারা বাতিল প্রয়োজন।
টিআইবি’র রিপোর্টে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া প্রায়োগিক পর্যায়ের সুপারিশে বিচারবহির্ভূত হত্যার তদন্ত, সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও পুলিশী হেফাজতে মৃত্যুর তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তা সরকারের আমলে নেয়া উচিত। এতে শুধু জনগণের নয় সরকারেরও কল্যাণ হতে পারে।
পত্রিকার পাতা উল্টালেই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং পুলিশী হেফাজতে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সাতক্ষীরায় পুলিশের নির্যাতনে কলারোয়া হটাৎগঞ্জ দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা সাইদুর রহমানের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার ফরহাদ জামিল মৃত্যুর এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, শুক্রবার রাত ২টার দিকে সাতক্ষীরা জেলখানা থেকে এক রোগীকে ভর্তি করানো হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রামে খবরটি মুদ্রিত হয়।
মৃত মাওলানা সাইদুর রহমানের স্ত্রী ময়না বেগম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে পুলিশের ৩ জন সদস্য তাদের বাড়িতে এসে তার স্বামীকে গ্রেফতারের কথা বলেন। কোন কারণে তাকে গ্রেফতার করা হবে জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। এ সময় তার গ্রেফতারি পরোয়ানা চাইলে পুলিশ ময়না বেগমের সাথে দুর্ব্যবহার করে। মাওলানা পুলিশকে জানান, তিনি অসুস্থ রোগী, প্রতিদিন তাকে ওষুধ খেতে হয়। ধরে নিয়ে গেলে তিনি বাঁচবেন না। কিন্তু পুলিশ কোন কথা না শুনে তাকে গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ মাওলানা সাইদুর রহমানকে নিয়ে স্থানীয় এক ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু চিকিৎসা না দিয়ে পুলিশ তাকে সাতক্ষীরা সদর থানা হাজতে রাখে। সদর থানাতে মাওলানার সাথে দেখা করতে যান তার স্ত্রী ময়না। এ সময় তিনি স্ত্রীকে বলেন, পুলিশ তাকে অনেক মারপিট করেছে। তার গায়ের পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে গেছে। পুলিশের কাছে ওষুধ চাইলে পুলিশ তা দেয়নি। পরে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে তাকে নেয়া হয়। পরে শুক্রবার সন্ধ্যায় কোর্টে হাজিরার মাধ্যমে তাকে জেলে পাঠানো হয় বলে মাওলানার স্ত্রী জানান।
সাতক্ষীরা হাসপাতালের আরএমও ডা. ফরহাদ জামিল বলেন, হাসপাতালে আনার পর তার চিকিৎসা চলছিল। শনিবার ভোরে মারা যান তিনি। চিকিৎসক জানান, নিহত মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা সাইদুর রহমানের দেহে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সদর থানার এসআই মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, আমি তাকে গ্রেফতার করলেও নির্যাতন করিনি, তার কাছে ঘুষও চাইনি। গ্রেফতারের পর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এদিকে সদর থানার ওসি মারুফ আহমদ জানান, মাওলানা হার্ট এ্যাটাকে মারা গেছেন। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, এসআই ও ওসির বক্তব্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। উল্লেখ্য যে, সাতক্ষীরা সদর থানার এসআই মোঃ আসাদুজ্জামান গ্রামে গ্রামে আসামী ধরার নামে বেপরোয়া আচরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি রাতে আসামী ধরে মারপিট করে তাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। কারণ পুলিশের কাজ তো নাগরিকদের নির্যাতন করে ঘুষ আদায় করা নয়। বরং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনই পুলিশের কর্তব্য। পুলিশের বিধিবিধান মেনে যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে জনগণের কাছে পুলিশ বন্ধু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিধিবিধান মানার ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতার কথা সবারই জানা। এমন দুর্বলতা না থাকলে সুশাসনের ক্ষেত্রে আমরা অনেকটা এগিয়ে যেতে পারতাম। আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবে সুশাসনের পরিবর্তে এখন দুঃশাসনের মাত্রাই প্রবল হয়ে উঠছে। ফলে রাজনৈতিক বাতাবরনে সংলাপ-সমঝোতা ও আস্থা-বিশ্বাসের পরিবর্তে লক্ষ্য করা যাচ্ছে দমন-অবদমন, সংঘাত-সংঘর্ষ ও ব্লেমগেমের পরিবেশ। এমন পরিবেশে উন্নত জীবনবোধ ও মানবিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে কেমন করে? আমরা জানি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এক সংকটজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ঐক্য ও সহ-অবস্থানের চেতনায় যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে বন্যার সময় আমরা একই ভেলায় সাপ ও মানুষকে অবস্থান করতে দেখেছি। এ সময় সাপ ফোঁস করে না, মানুষও আঘাত করে না। দুর্যোগের সময় তাদের এই যে সহ-অবস্থান তা থেকে শেখার মত বিষয় রয়েছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সংকটকালে সহ-অবস্থানের তেমন উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারছে না। বরং তারা যা করছেন তা মানুষের জন্য পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। মিয়ামনমারে গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা ক্ষুধার্ত, অসুস্থ এবং আতঙ্কিত। বিশ্বের বহু দেশ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং তাদের প্রতি মানবিক সাহায্যের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। কিন্তু এ  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অসুস্থ বাক্যবান লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা খুবই দুঃখজনক।
গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে কক্সবজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য বিএনপি’র ত্রাণ বিতরণ নিছক মায়াকান্না। আর প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। প্রশ্ন হলো, বিপর্যস্ত রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতি এমন  বাক্যবানের কোন প্রয়োজন ছিল কি? ত্রাণ কাজেও কি ব্লেম গেমের রজানীতি করতে হয়? এমন আচরণ থেকে উপলব্ধি করা যায়, আমাদের রাজনীতি শুধু মেধাশূন্য নয়, অন্তঃসারশূন্যও হয়ে পড়েছে। আর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কেন্দ্র করে বিএনপি নেতারাও যে ভাষায় সরকারের সমালোচনা করছেন তাও জনগণের মধ্যে বিরক্তি উৎপাদন করছে। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুধু বিচার-বিবেচনার অভাব নয়, সহিষ্ণুতার অভাবও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ কারণে জনগণ ক্রমেই রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এটা জাতির জন্য এক অশনি সংকেত। এমন ধারা অব্যাহত থাকলে দেশ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি থেকেই শুধু বঞ্চিত হবে না, জবাবদিহিতার চেতনা থেকেও শাসক-প্রশাসকরা অনেক দূরে অবস্থান করবেন। এমন পরিস্থিতি দেশকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলবে। বর্তমান জটিল ও আগ্রাসী বিশ্বে এটা আমাদের জন্য কোন ভাল খবর নয়।
ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করে আরো ন্যক্কারজনক খবর মুদ্রিত হয়েছে পত্রিকার পাতায়। নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের কাছে বিতরণের জন্য পাঠানো বিএনপি’র ত্রাণবাহী ট্্রাক আটকে দিয়েছে পুলিশ। একই সাথে তারা বিএনপি’র নেতাদরেও অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে বিকেলে নেতারা হোটেলে গিয়ে অবস্থান নিলেও ত্রাণবাহী ট্রাকগুলো কক্সবাজার জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সম্মুখে সার্কিট হাউজ সড়কের একপাশে পুলিশের ব্যারিকেডের মধ্যে ছিল। এমন ঘটনায় বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের প্রশ্ন, আমরা কি ত্রাণও দিতে পারব না? এমন অবস্থায় আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে আশাবাদী হব কেমন করে? দেশের রাজনীতি যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে তাতে আমাদের রাজনীতিবিদরা কি তুষ্ট আছেন?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ