শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

জান্নাত কাঁধে বহন করেছে নিজাম

নিজাম এক রোহিঙ্গা তরুণের নাম। কাঁধে দুটি ঝুড়ি ঝোলানো। একটিতে বাবা। অন্যটিতে মা। বাবার বয়স ৯৬। মায়ের ৮৭। দুজনেরই দৃষ্টিশক্তি নেই। পায়ের নেই চলৎশক্তিও। হাঁটতে পারেন না একদমই। তারা নাফ নদী পেরিয়ে আসতেও চাননি এমন বিদেশ-বিভূঁইয়ে। যে ভূমির আলো-বাতাসে এতো যুগ কাটিয়েছেন সেখান থেকে কে আসতে চায়? তারা কেবল চেয়েছিলেন প্রিয় সন্তান নিজামকে এপারে পাঠিয়ে নবজন্ম দিতে। হয়তো কিছুটা অপরাধবোধও ছিল, সন্তানদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে পারেননি বলে। কিন্তু মাতা ও পিতাগতপ্রাণ নিজাম তা মানতে পারছিল না। বুড়ো মা-বাবার কী হবে? কোথায় রেখে যাবে নিজাম তাদের? হায়েনাগুলো যে ওদের ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে! এসব ভাবতে ভাবতে দু'দিন কেটে যায়। হয়তো কিছুদিন পর স্বাভাবিকভাবেই তাদের জীবনাবসান হতো। এরপরও মিয়ানমার সৈন্যদের হাতে মা-বাবার মৃত্যু যাতে না হয়, সেটাই চেয়েছিল নিজাম। যারা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন তাদের মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে কোনওভাবেই পা এগুচ্ছিল না নিজামের। কাকুতি মিনতির পর অবশেষে মা-বাবা রাজি হন। কিন্তু রাজি হলেইতো শেষ নয়। দক্ষিণ মংডুর যেখানে নিজামদের বাড়ি, সেখান থেকে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত অন্তত ৩৫ কিলোমিটার দূরে। কোনও গাড়ি নেই। দু’পা-ই একমাত্র ভরসা। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেয় নিজাম, পায়ের ওপর ভরসা করেই মা-বাবাকে নিয়ে রওয়ানা হবে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে।

ঘরের মালপত্র নেবার ঝুড়িতে তুলে নিলো মা-বাবাকে। তারপর হাঁটা শুরু। সারাদিন হেঁটেছে নিজাম। রাতে বিশ্রাম নিয়েছে । পরদিন আবার হাঁটা শুরু। কর্দমাক্ত রাস্তা, জমি, দুর্গম পাহাড়, জঙ্গল, নদী পার হয়ে পাঁচদিন পর গত ১০ সেপ্টেম্বর রোববার পৌঁছে বাংলাদেশে। ওই দিনেই দুপুর নাগাদ কুতুপালংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হয় নিজামের। ক্লান্তিভরা বিধ্বস্ত দেহ-মন নিয়েও কষ্টের কথাগুলো জানায় নিজাম। পুত্রের বহন করা ঝুড়িতে তখনও ঘুমাচ্ছিলেন মা-বাবা। তরুণটি আরও জানায়, এ দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে, এতে তার কোনও কষ্ট হয়নি। মা-বাবাকে এখানে আনতে পেরেছে, এটাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। সত্যই, জান্নাত কাঁধে করে বয়ে নিয়ে বেড়ানো এমন রোহিঙ্গা তরুণ আর ক'জন আছে, কে জানে!

হ্যাঁ, নিজাম হয়তো তেমন লেখাপড়া জানেনা। কারণ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের লেখাপড়া নিষিদ্ধ। নিজেদের মক্তবে যেটুকু শেখা ওটুকুই। ওখানেই হয়তো শিখেছে মা-বাবার বিশেষত মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত। ইসলামের এ মহান বাণী তাকে হয়তো দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে মা-বাবার সেবায়। তাই নিজাম মিয়ানমারের মগ হার্মাদদের অমানবিক জুলুম-নির্যাতন থেকে শুধু নিজে বাঁচতে পালিয়ে আসেনি। মা-বাবাকেও কাঁধে করে দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে চলে এসেছে বাংলাদেশের কুতুপালংয়ে। আমাদের সমাজে অনেকে মা-বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মা-বাবাকে খেতে-পরতে দিতে পর্যন্ত অপারগতা প্রকাশ করেন। এমনকি কেউ কেউ মা-বাবার তিলেতিলে গড়ে তোলা সহায়-সম্বল কেড়ে নিয়ে তাদের বৃদ্ধনিবাসে নির্বাসন দেবার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেন। এমন দুর্ভাগ্য আমাদের কারুর যেন না হয়। তাই আমরা মনে করি, মিয়ানমারবাহিনীর জুলুম-নির্যাতন থেকে মা-বাবাসহ বাঁচতে আসা নিজামের কাছ থেকে আমাদের শিখবার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ