বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কূটনৈতিক তৎপরতা আর সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের উদ্যোগে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন বন্ধে করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেছেন,মায়ানমানের রোহিঙ্গা ইস্যু এক দিনের কোন সমস্যা নয়। দীর্ঘ দিনের চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই রাখাইন প্রদেশ থেকে মুসলমানদের উচ্ছেদ করছে সেদেশের সেনা বাহিনী। আর এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি প্রয়োজনে সামরিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। বক্তারা বলেন, বার্মাতে যখন মুসলমানদের জীবন নিয়ে হুলি খেলা হচেছ তখন বিশ্ব মোড়লরা একেবারে নিরব। তাই এখন সময় এসেছে মুসলিম জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করার। বার্মায় মুসলামদের এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপরও দাবি জানান বক্তারা। আন্তর্জাতিক আদালতে বার্মার বিরুদ্ধে মামলা করারও দাবি জানান তারা।

গতকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন বন্ধে-করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদ। 

পরিষদের সভাপতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন হাফেজ্জি হুজুরের সাহেবজাদা বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীরে শরীয়ত আল্লামা শাহ আতাউল্লাহ। 

আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মাওলানা মুহিউদ্দীন রব্বানী, চেয়ারম্যান- আইম্মা পরিষদ। ড. খলীলুর রহমান মাদানী, সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ পরিষদ, মুফতী ফয়জুল হক জালালাবাদী, যুগ্ম মহাসচিব- ইসলামী ঐক্যজোট, মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী, ফুরফুরা দরবারের খলিফা মুফতি আব্দুল কাইয়ুম, মুফতী আজীজুল হক আজীজ, মুফতী ফয়জুল্লাহ আশরাফী,জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা লুৎফর রহমান, একাত্তর অনলাইন এক্টিভেট সভাপতি মাওলানা তাসনীম আলম, মুফতি তাজুল ইসলাম, প্রিন্সিপাল রফিকুল ইসলাম, মাওলানা কামরুল হাসান,অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাইন মুফতি আব্দুল কুদ্দুস সহ প্রমুখ দেশবরেণ্য ওলামায়ে কেরামগণ।

প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেভাবে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে আমরা সত্যিই খুবই উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট তবে আমাদের আরো অনেক কিছুই করার আছে। তিনি বলেন, একজন ঈমানদার হিসেবে আমাদের এখন ফরজে আইন হচেছ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো। সরকার এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দকেও চেষ্টা করতে হবে যাতে রোহিঙ্গারা তাদের অধিকার নিয়ে নিজ দেশে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। প্রয়োজনে রোহিঙ্গা তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের অধিকার রক্ষায় প্রস্তুত করতে হবে। রাখাইন প্রদেশের মুসলিম নারী পুরুষ আর শিশুদের জীবন রক্ষার জন্য আমাদেরকে জেহাদের প্রস্তুুতি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। 

ফুরফুরা দরবার শরীফের মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল কাইউম বলেন, সমগ্র মুসলমান সমাজের একটি দেহ সমতুল্য। এর এক স্থানে আঘাত আসলে সারা শরীরেই ব্যথা অনুভূত হয়। তেমনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের যেভাবে হত্যা করা হচেছ তাতে বিশ্ব মুসলিম সমাজকে প্রতিবাদ জানাতে হবে। সরকার যদি বার্মার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলে তাহলে সরকারের পক্ষেই সবাই থাকবে। তিনি বলেন বার্মাতে যা হচ্ছে তা বর্বর ইতিহাসকেও হার মানায়। তবে নির্যাতন করে অন্যায় করে কেউ কোন দিন টিকে থাকে না। 

মাওলনা মুহিউদ্দীন রব্বানী বলেন, ইতিহাসে যত নির্যাতনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার সবগুলোকে হার মানিয়েছে বার্মার রাখাইন প্রদেশে মুসলমানদের উপর নির্যাতন। বিশ্ব ইসলামী নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য দাবি জানান। তিনি বলেন এই ক্ষেত্রে সৌদী সরকারের যে ভূমিকা নেয়ার কথা ছিল তা নেয়া হচ্ছে না। একটি মুসলিম জাতি সংঘ প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বার্মাকে সামরিক চাপে ফেলারও দাবি জানান তিনি। 

ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, আরাকান জ্বলছে, রোহিঙ্গা নিধন চলছে। বিশ্ব মোড়লরা কানে তালা ঝুলিয়ে ঘুমাচ্ছেন। তাদের কোন টনক নড়ছে না। তিনি বলেন আমাদের প্রতিবেশি মুসলিম ভাই বোনদের রক্ষায় বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দকে এখনি এগিয়ে এসে এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই বার্মার রাখাইন প্রদেশ দখলের চক্তান্ত করছে বার্মা সরকার। 

মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী বলেন, রাখাইন প্রদেশের মুসলমাদের জন্য অনেক দেশই মায়াকান্না করছেন অথচ কোন প্রকার কূনতৈনিক চাপ বা বার্মার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না। তিনি বলেন নিজ ভূমিতে রাখাইনদের প্রতিষ্ঠিত করতে সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে হবে। 

মাওলানা জাফরুল্লাহ খান বলেন, আমরা যদি ঈমানের দাবীদার হয়ে থাকি তাহলে এই মুহূর্তে আমাদের আরাকান অভিমুখে রওয়ানা দেয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তিনি বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের রক্ষায় মুসলিম জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। 

মুজিবুর রহমান হামেদী বলেন, রোহিঙ্গাদের আজ নিজেদের জন্মস্থান থেকেই উচ্ছেদ করা হচ্ছে। বার্মাকে বয়কট করতে বিশ্ববাসীকে চায় প্রয়োগ করতে হবে। আরাকান স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। মুফতী ফয়জুল হক বলেন, এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ তৎপরতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সমমনা ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি চাপ প্রয়োগ করতে হবে যাবে যাতে কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেন। 

 অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্যের মূল দাবি ছিল, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। আর এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন ওলামা মাশায়েখ সংগঠনের নেতারা। বক্তারা রোহিঙ্গা নির্যাতনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বক্তারা তাদের বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর,পৈশাচিক নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরেন।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, মায়ানমার সেনাবাহিনীর এই ভয়াবহ নির্যাতনে সবারই প্রতিবাদ জানানো উচিত। সেখানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন বন্ধে মায়ানমার সরকারকে হুশিয়ার করতে হবে। ওলামা মাশায়েখগণ আরো বলেন, বার্মার সৈন্যরা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে অন্যায়ভাবে হত্যা করছে। রোহিঙ্গা মুসলমানরা আরাকানে হাজার বছর ধরে বাস করছে। তারা বহিরাগত না। মিয়ানমার সরকার গণহত্যার মাধ্যমে একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিধনের অপচেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তারা। তারা বলেন, আজকের মুসলিম বিশ^ কি অভিভাবকহীন ? 

সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা আবু তাহের জিহাদী বলেন, বার্মার এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ হিসেবে আমাদেরকে এখনি বার্মার সব পণ্য বর্জনের ঘোষণা দিতে হবে। বার্মার মুসলমানদের জন্য কুনুতে নাজেলা আমল বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে থাকা অন্য ধর্মের লোকদের অত্যাচার না করে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। 

অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয় আগামী শুক্রবার বাদ জুম্মা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ইসলামী দল সমূহের লাখ লাখ মুসলিমের গণ-জমায়েত অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি মসজিদ থেকে দলে দলে ইমাম-খতীবদের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে গণ জমায়েতে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষ ভাবে আহ্বান জানানো হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ