বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া স্থগিত করতে ১৫৭ ব্রিটিশ এমপির চিঠি

সংগ্রাম ডেস্ক :মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও চরমপন্থী বৌদ্ধদের হাতে দেশটির সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্বিচারে হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ১৫৭ জন সংসদ সদস্য। এক চিঠির মাধ্যমে তারা মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া স্থগিত করতেও আহ্বান জানান। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে বার্মার দ্য ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চিকে সতর্ক করেছেন যে জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের দমন-পীড়ন দেশটির খ্যাতিকে কলঙ্কিত করেছে। পার্লামেন্ট সদস্যরা জনসনের এই বক্তব্যকে স্বাগত জানায় এবং পাশাপাশি তারা বার্মিজ সামরিক বাহিনীকে ব্রিটিশ প্রশিক্ষণ স্থগিত করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানায়। গত বছর বার্মিজ সামরিক বাহিনীর পেছনে প্রশিক্ষণ ব্যয় বাবদ যুক্তরাজ্য ৩,০৫,০০০ পাউন্ড খরচ করেছে। মিয়ানমারের রাখাইনে সাম্প্রতিক সহিংসতায় দেশটির সেনাবাহিনী বিরুদ্ধে গলা কেটে হত্যা, ধর্ষণ এবং শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে গুলী করার অভিযোগ ওঠেছে। যুক্তরাজ্য যুদ্ধ প্রশিক্ষণ প্রদান করে না বরং গণতন্ত্র, নেতৃত্ব এবং ইংরেজী ভাষায় সৈন্যদের প্রশিক্ষিত করার চেষ্টা করে। গত বছরের নভেম্বরে তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মাইক পেনিং বলেছিলেন যে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযানে জড়িত কোনো সৈন্যকে যুক্তরাজ্য কর্তৃক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে কিনা সরকার সে সম্পর্কে অবগত নয় এবং প্রশিক্ষণ মানবাধিকারের উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রেখেছে কর্মকর্তারা তা মূল্যায়ন করে নি। মিয়ানমারের সেনাদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে গত দুই সপ্তাহে ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। লেবার পার্টির এমপি রুশনার আলীর নেতৃত্বে পার্লামেন্ট সদস্যরা লিখিত চিঠিতে বরিস জনসনকে বলেন, ‘জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন এবং রোহিঙ্গা সংগঠনসমূহের রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা মিয়ানমারের ইতিহাসের জগন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করছি।’বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশনারা আলী মিয়ানমারের গণতন্ত্রের জন্য গঠিত সর্বদলীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান। এতে বলা হয়, ‘চার শতাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে বলে মিয়ানমার সরকার স্বীকার করেছে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য রোহিঙ্গা সূত্রগুলোর মতে এই সংখ্যা ২ হাজার থেকে ৩ হাজারের মধ্যে।’চিঠিতে বলা হয়, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী সেখানে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সেনারা নির্বিচারে গুলী চালিয়ে হত্যা করছে, তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে শুয়ে থাকতে তাদের বাধ্য করার পর মাথার পিছনে গুলী করে হত্যা করা হচ্ছে। এছাড়াও, তাদের শিশুদের, শ্বাসরোধ করে হত্যার পাশাপাশি ঘরের ভিতর আটকে রেখে তারপর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছে। তারা শিশুদেরকেও ইচ্ছাকৃতভাবে গুলী করে হত্যা করছে।’ এছাড়াও, তারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান মিন অং হেইঙ্গকে চাপ প্রয়োগ করতে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জনসনের প্রতি আহ্বান জানায় এবং বলেন যে, ‘বার্মিজ সামরিক বাহিনীর প্রতি সরকারের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই পর্যালোচনা করা উচিত’। বিবিসি বাংলা

 রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে দালাইলামার আহ্বান

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দমনপীড়ন বন্ধ করতে দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সুচির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাইলামা। বুদ্ধের শিক্ষা উদ্বুদ্ধ হয়ে নির্যাতিত মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতে বৌদ্ধদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এদিকে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেছেন, নির্যাতন বাড়ায় বহু রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। এত সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া ও তাদের খরচ বহন করা তার দেশের জন্য কষ্টসাধ্য বলেও মন্তব্য করেছেন রাজাক। সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বানও জানান তিনি। জাতিসংঘের হিসাবে রাখাইনে চলমান সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। চলমান নির্যাতন-সহিংসতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে ইরান, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশে।

‘আমার পায়ে গুলী লেগেছে ॥ গ্রামে অনেককে হত্যা করা হয়েছে’

১৬ বছরের মোহাম্মদ জুনায়েদকে হাসপাতালের বিছানার সঙ্গে বেঁধে রাখতে হয়েছে। গুলীর আঘাত তার শরীরে। ব্যথানাশক মরফিনের কার্যকারিতা কমে এলে যন্ত্রণায় জুনায়েদ বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে। সেটি বন্ধ করতেই এমন ব্যবস্থা। জুনায়েদ রোহিঙ্গা কিশোর। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে তার। এক দিন আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে জুনায়েদের মাথায় গুলী লাগে। জুনায়েদের বাবা মোহাম্মদ নবী এএফপিকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনারা আমার চোখের সামনে জুনায়েদকে গুলী করে। এরপর থেকেই তীব্র ব্যথায় কাতর সে।’সীমান্তবর্তী এলাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই গুলীতে গুরুতর আহত রোহিঙ্গাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর থেকে এই হাসপাতালে গুরুতর আহত রোহিঙ্গাদের ভিড় বেড়েছে। সহিংসতা থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসা গুরুতর আহত অনেক রোহিঙ্গা চিকিৎসা নিচ্ছে এখানে। হাসপাতালের বিছানায় আর জায়গা হচ্ছে না। মেঝেতে আহত ৭০ রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে আরও আহত রোহিঙ্গা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মিয়ানমার সীমান্ত থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। সেখানকার অস্ত্রোপচারবিদ (সার্জন) কামাল উদ্দিন বলেন, ‘চিকিৎসাসেবার সরঞ্জাম সীমিত। দরিদ্র রোহিঙ্গাদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তারা গুরুতর আহত। তাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।’জাতিসংঘ বলছে, দুই সপ্তাহ আগে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। ফেরা যাক জুনায়েদের বাবার কাছে। মংডু থেকে পালিয়ে আসার সময় জুনায়েদের বাবা নবী ও তাঁর ছয় সন্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে নবী শুনেছেন, তাঁর সন্তানেরা সীমান্ত পার হতে পেরেছে। নবীর সবচেয়ে ছোট ছেলে বশির উল্লাহ। ১৪ বছরের রোহিঙ্গা কিশোর বশিরউল্লাহরওপায়ে গুলী লেগেছে। সীমান্তের কাছে বেসরকারি একটি হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে বশির উল্লাহ এএফপিকে বলে, ‘প্রাণ বাঁচাতে যখন আমরা ছুটছিলাম, তখন তাঁরা (মিয়ানমারের সেনাবাহিনী) নির্বিচারে গুলী ছোড়ে। আমি মাটিতে পড়ে যাই। পায়ে গুলী এসে লাগে। আমি সৌভাগ্যবান। গুলী লাগলেও আমার খুব বেশি রক্তক্ষরণ হয়নি। গ্রামে আরও অনেককে হত্যা করা হয়েছে।’নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সরকার সহিংসতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সুচি এই সহিংসতার জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করেছেন। ২২ বছরের রোহিঙ্গা তরুণ হোসেন জহুর বলেন, ‘মাঝরাতে সেনারা আমার গ্রামে ঢোকে। তারা আমাকে ও আমার পরিবারকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে। সেনারা আমাদের মারধর করে এবং অত্যাচার চালায়। একপর্যায়ে আমি পালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এক সেনা আমার দিকে বোমা ছোড়ে। বোমা বিস্ফোরণে আমার হাতের কিছু অংশ উড়ে যায়।’আঘাত সত্তে¦ও জহুর হেঁটে সীমান্ত পার হন। তিনি এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জহুর বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী আমাদের সঙ্গে কুকুরের মতো আচরণ করে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করছে। তারপরও সেনারা রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করতে চায়।’

সু চির নোবেল কেড়ে নিতে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষের স্বাক্ষর

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির শান্তিতে নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেয়ার দাবিতে এক পিটিশনে স্বাক্ষর করেছে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ। কিন্তু এ আবেদনে সাড়া দিচ্ছে না নরওয়ের নোবেল কমিটি। তারা বলেছে, যাকে একবার নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় তা আর ফিরিয়ে নেয়া হয় না। নোবেলজয়ী যে কাজের জন্য নোবেল পেয়েছেন তা-ই তারা ধর্তব্যের মধ্যে রাখে। নরওয়ের অসলোতে নোবেল ইন্সটিটিউটের প্রধান ওলাভ জোলস্টাড বলেছেন, যখন কাউকে একবার নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়ে যায় তখন তা আর বাতিল করা একেবারেই অসম্ভব। বার্তা সংস্থা এএফপি’কে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফ। এতে বলা হয়, চেঞ্জ ডট অর্গ নামের অনলাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদে সুচির নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেয়ার পিটিশন করা হয়। এতে কমপক্ষে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছে বৃহস্পতিবার নাগাদ। এতে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনী যে অভিযান পরিচালনা করছে তাতে কিভাবে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। ওই পিটিশনে বলা হয়েছে, নিজের দেশে মানবতার বিরুদ্ধে চলমান অপরাধ বন্ধে কার্যত কিছুই করছে না মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি। সুচিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় ১৯৯১ সালে। ওই সময় তিনি সামরিক জান্তার হাতে ছিলেন গৃহবন্দি। দীর্ঘ কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান ২০১০ সালে। এরপর নিজ দলের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। স্বাধীনতার পর প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি সরকার গঠন করেন। কিন্তু রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর তার সেনাবাহিনী অকথ্য নির্যাতন, ধর্ষণ, গণহত্যা, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে থাকে। এর ফলে শরণার্থীদের ঢল নামে বাংলাদেশে। এর ফলে সুচি নেতৃত্বাধীন সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ বলেছে, গত দুই সপ্তাহে কমপক্ষে এক লাখ ৬৪ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সব মিলে তাদের মোট সংখ্যা আড়াই লাখেরও বেশি। এর অর্থ হলো অক্টোবরে সৃষ্ট সহিংসতার পর রাখাইনের ১০ লাখ রোহিঙ্গার এক চতুর্থাংশের বেশি আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। কিন্তু এ সমস্যাকে অং সান সুচি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে ভয়াবহ আকারে মিথ্য খবর প্রচার করা হচ্ছে। তার ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে ‘ টেরোরিস্ট’দের স্বার্থকে উৎসাহী করা হচ্ছে। ওলাভ জোলস্টাড বলেছেন, আলফ্রেড নোবেলের যে উইল বা নোবেল ফাউন্ডেশনের যে নীতিমালা তাতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য বা শান্তিতে যাদেরকে পুরস্কার দেয়া হয় তা ফেরত নেয়ার কোনো বিধান নেই। তবে এক্ষেত্রে যদি পুরস্কার হস্তান্তরের আগে কোনো ঘটনায় এমন দাবি ওঠে তা যাচাই করে দেখতে পারে নোবেল কমিটি।

গ্রামের ভবনগুলো জ্বলছে ॥ রামদা-তলোয়ার হাতে টহল দিচ্ছে বৌদ্ধ তরুণরা’

রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমারের নেত্রী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি যা-ই বলুন, বাস্তব অবস্থা কিন্তু ভিন্ন। কোনো বিদ্রোহী কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নয়, স্থানীয় বৌদ্ধ তরুণরাই সেখানকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। তলোয়ার আর রামদা হাতে টহল দিচ্ছে সারাক্ষণ। তাদের সামনে পড়ার ভয়ে রোহিঙ্গারা নিজেদের ভিটেবাড়ি ফেলে পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের এ অসহায় অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংবাদদাতা জোনাথন হেড। বৃহস্পতিবার রাখাইন রাজ্য ঘুরে এসে বিবিসির এক প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের গাড়ি তখন মংডু জেলার গাউদু যারা গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সাধারণত গ্রামের চিহ্ন হিসেবে ধানক্ষেত থাকে। আমাদের পেছনে ধানক্ষেতগুলোর মধ্যে সারিবদ্ধ গাছের ভেতর থেকে ধোঁয়ার কু-লী দেখতে পেলাম। আমরা গাড়ি থেকে বের হলাম এবং ধানক্ষেত পেরিয়ে সেখানে যাওয়ার জন্য দৌড় দিলাম। প্রথমেই দেখতে পেলাম গ্রামের ভবনগুলো কেবল জ্বলছে। গাওদু যারা গ্রামের বাড়িগুলো ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে ছাইয়ে পরিণত হয়ে গেল। মাত্র কিছুক্ষণ আগেই এখানে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। একটু হেঁটে যাওয়ার পর একদল তরুণকে রামদা, তলোয়ার ও গুলতি হাতে চলে যেতে দেখলেন সাংবাদিকরা। তারা তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা ছিল সবাই রাখাইন বৌদ্ধ। তাদের মধ্যে একজন স্বীকার করল, সে গ্রামে অগ্নিসংযোগ করেছে এবং পুলিশ তাকে সহযোগিতা করেছে। মংড়ুর পরিস্থিতি দেখতে মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ২৪ জন সাংবাদিকের একটি দলের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। জোনাথন হেড ছিলেন সেই গ্রুপেরই সদস্য। এ সফরে যোগ দেওয়ার পূর্বশর্ত ছিল সাংবাদিকরা দলবদ্ধ থাকবেন এবং স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতে পারবেন না। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সরকারের বাছাই করা স্থানে যেতে হবে তাদের। সবসময় অন্যান্য এলাকায়, এমনকি কাছের কোনো স্থানেও তাদের যাওয়ার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছিল নিরাপত্তার অজুহাতে। বিবিসির ওই প্রতিবেদনে অন্য আরও কয়েকটি গ্রামের রোহিঙ্গা চিত্র তুলে ধরে তিনি লিখেছেনথ ‘আমরা আর একটি গ্রামে গেলাম। সুনসান নীরবতা, কোনো মানুষই নেই। রাস্তার ওপর গৃহস্থালি সামগ্রী, শিশুদের খেলনা, নারীদের কাপড়চোপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। রাস্তার মাঝে একটি খালি জগ দেখতে পেলাম যেটার ভেতর থেকে তখনও পেট্রোলের ঝাঁজ বের হচ্ছিল, আরেকটি পড়ে থাকা জগে কিছুটা পেট্রোল অবশিষ্ট ছিল। যখন আমরা বের হয়ে আসছিলাম, তখন পোড়া বাড়িগুলোতে আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছিল, কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছিল চারপাশ। চলতি পথেমাঝেমাঝে যাদের দেখেছিলাম, তারা ছিল হামলাকারী। আরেকটু সামনে এগোনোর পর একটি মাদ্রাসা দেখতে পেলাম যেটির ছাদ তখনও জ্বলছে। আগুন আরেকটি বাড়ির পাশে ছড়িয়ে পড়ায় তিন মিনিটের মাথায় সেটি রীতিমতো নরকে পরিণত হলো। মংড়ুর এক শহরের বর্ণনায় হেড লিখেছেন, ‘দক্ষিণের শহর আই লি থান কিয়াঅ পরিদর্শন শেষে আমরা ফিরছিলাম। শহরটি তখনও জ্বলছিল, যা দেখে বোঝা যায় বেশ কিছু সময় আগে এতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পুলিশ আমাদের জানাল, মুসলমান বাসিন্দারাই তাদের নিজেদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। আমরা উত্তর দিকে বেশ কিছুটা দূরে কমপক্ষে ধোঁয়ার তিনটি কু-লী দেখতে পাচ্ছিলাম। এ সময় থেমে থেমে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলীর শব্দ শোনা যাচ্ছিল।’

রোহিঙ্গাদের ঢল ॥ ত্রাণ সহায়তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো

মিয়ামারের রোহিঙ্গারা  যে হারে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে তাতে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর সব হিসাব উলোট-পালট হয়ে যাচ্ছে। সংস্থাগুলোর ধারণা ছিলো শরণার্থীর সংখ্যা হবে ৩ লাখ। কিন্তু তাদের হিসাবে ইতিমধ্যে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং বাংলাদেশ মুখি সেই ¯্রােত এখনো অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এই শরণার্থীদের জন্য খাদ্যসহ মানবিক সহায়তা যথেষ্ট নয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে কি পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে? জানতে চাইলে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি আজহারুল হক জবাবে বলেন, ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের মোট ৭৪ থেকে ৭৫ হাজার মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশে করেছিলো। কিন্তু এখন নতুনভাবে ২৫ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় দেড় লক্ষ লোক প্রবেশ করেছে। এখন তাদের সামলনো আসলেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শরণার্থীদের সহায়তা দিতে রেড ক্রিসেন্ট সাহায্য সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছে কিনা তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হিমশিম তো আছেই। কারণ সমস্যা সমাধান অসম্ভব হয়ে দাড়াচ্ছে। মানুষের যে ঢল, মানুষগুলো সমস্ত নিঃস্ব হয়ে তারা ওপাড় থেকে এপাড়ে চলে আসছে। এখানে আইএফসি, আইআরসি, জাতীয় রেড ক্রিসেন্ট্, কাতার রেড ক্রিসেন্ট প্রতিনিধিরা এসেছেন, আমরা দেখছি এখানে যেভাবে মানুষের ঢল নামছে আসলে এটা সমাধন করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। আপনাদের প্রস্তুতি কতটা রেখেছিলেন? জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো ৭৫ হাজার মানুষের জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, আর সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যেভাবে মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে সে তুলনায় প্রস্তুতি ছিলো না। কিন্তু এখন আমাদের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। আমরা নতুন করে মাঠে নামছি। আন্তর্জাতিকভাবে কী ধরণের ফান্ড যোগান দেয়া হচ্ছে বা কী ধরণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা যদি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ফেডারেশন রেড ক্রস, ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেড ক্রস এবং কাতার ও আমেরিকান রেড ক্রসেরসাথেই মিটিং করেছি। আমরা সাহায্যের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ