সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০
Online Edition

ট্রান্সফরমার পুড়ে এক বছরে বিদ্যুৎ বিভাগের ১ হাজার ২শ’ কোটি টাকা ক্ষতি 

 

কামাল উদ্দিন সুমন : এক দিকে নি¤œমানের ট্রান্সফরমার ব্যবহার অন্যদিকে সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন না করে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের কারণে বেড়েই চলছে ট্রান্সফরমার পুড়ে যাওয়ার ঘটনা। এতে করে  সরকারের যেমন অর্থ অপচয় হচ্ছে পাশাপাশি গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুরে ফিরে ক্ষতির দায় গ্রাহকের ঘাড়েই চাপছে। 

বিদ্যুৎ  বিভাগের তথ্যমতে, ওভারলোডের কারণে গত এক বছরে (২০১৬-১৭ অর্থবছরে) সারা দেশে ৫৬ হাজার তিনটি ট্রান্সফরমার পুড়ে গেছে। এতে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, ট্রান্সফরমারের ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে আনা ও পুড়ে যাওয়া রোধে ২০১৪ সালে নীতিমালা করে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর আওতায় বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়। তবে পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি। ফলে ট্রন্সফরমার পুড়ে যাওয়ার হার খুব বেশি কমেনি।

ওভারলোডের পাশাপাশি নিম্নমানের ট্রান্সফরমার ব্যবহারকেও পুড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যুৎ খাতের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, আগে কোরিয়া-জাপান থেকে উন্নতমানের ট্রান্সফরমার কেনা হতো। এখন ভারত ও চীন থেকে সস্তায় এগুলো কেনা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশেও নিম্নমানের ট্রান্সফরমার তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া নির্বিচারে সংযোগ প্রদান করে ওভারলোড সমস্যা বাড়ানো হয়েছে। এসবের খেসারত হিসেবে এখন বছরে কোটি কোটি টাকার ট্রান্সফরমার পুড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশে তৈরি ট্রান্সফরমার বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশীয় শিল্পকে উৎসাহ দিতে কেনা হলেও এগুলোর মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। ১০০ কেভির (কিলো ভোল্ট) ট্রান্সফরমার সাধারণত ৮০ কেভি লোড নিতে পারে। এর ওপর নতুন সংযোগ বেড়ে যাওয়ায় বেড়ে গেছে ওভারলোড। ফলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ট্রান্সফরমার।

সূত্র জানায়, গত অর্থবছর সবচেয়ে বেশি ট্রান্সফরমার পুড়েছে মে মাসে। প্রচন্ড গরম থাকায় ওই মাসে সারা দেশে সাত হাজার ৫৩২টি পুড়ে যায়। আর জুনে পুড়েছে সাত হাজার ৩৯১টি ও এপ্রিলে ছয় হাজার ৭৩৮টি। এছাড়া গত বছর আগস্টে পাঁচ হাজার ৩৬৪টি, জুলাইয়ে পাঁচ হাজার ২৪২টি ও সেপ্টেম্বরে পাঁচ হাজার ২৫টি ট্রান্সফরমার পুড়ে। 

সূত্র জানায়, ওভারলোডেড ও পুড়ে যাওয়া ট্রান্সফরমারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। এজন্য সংস্থাটির বিভিন্ন সমিতির আওতায় নতুন সংযোগ প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এরপরে রয়েছে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি)। তবে ঢাকা পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) 

তথ্যমতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ছাড়া দেশের বাকি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব আরইবির। তবে সংস্থাটি অনেক এলাকায় সক্ষমতার বেশি সংযোগ দেয়া হয়েছে। এতে হঠাৎ কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে না দিলে বিতরণ ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দেয়। পুড়ে যায় ট্রান্সফরমারও।

সূত্র জানায়, বর্তমানে আরইবির ট্রান্সফরমার রয়েছে আট লাখ ৬৩ হাজার ১৪২টি। এর মধ্যে গত অর্থবছর পুড়ে গেছে ৫৪ হাজার ৯৬৮টি। এতে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। আর চট্টগ্রাম ও ঢাকা শহরের আশপাশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা পিডিবির ট্রান্সফরমারের সংখ্যা ১৫ হাজার ৩৫৯টি। এর মধ্যে গত অর্থবছর সংস্থাটির ১৫২টি ট্রান্সফরমার পুড়েছে। 

এদিকে ঢাকা শহরের দক্ষিণাংশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ডিপিডিসির ট্রান্সফরমারের সংখ্যা ১১ হাজার ৪৭৭টি। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পুড়ে গেছে ৪৯৯টি। আর ঢাকার উত্তর অংশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ডেসকোর ট্রান্সফরমার ছয় হাজার ৫৬৭টি। এর মধ্যে গত অর্থবছর পুড়েছে ১৯৭টি, যা কোম্পানিটির ট্রান্সফরমারের তিন শতাংশ।

 দেশের পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকোর অধীনে ট্রান্সফরমারের সংখ্যা ছয় হাজার ৪৪৭টি। এর মধ্যে গত অর্থবছর ১৮৩টি পুড়ে যায়। তবে গত ডিসেম্বরে পিডিবি ভেঙে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পৃথক কোম্পানি গঠন করা হয় নর্থওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (নওজোপাডিকো)। এর অধীনে ছয় হাজার ৯৩৩টি ট্রান্সফরমার রয়েছে। এর মধ্যে চারটি পুড়ে যায়।

এদিকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা উন্নত করে লোডশেডিং সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

কমিটির পক্ষ থেকে  জানানো হয়, বিদ্যুৎ বিভাগ ও এর আওতাধীন সংস্থাসমূহে চলতি অর্থ বছরে মোট ৯৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তন্মধ্যে মূল এডিপিভুক্ত প্রকল্প ৮২টি এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প ১৬ টি। 

এছাড়া বিদ্যুতের  নিরবচ্ছিন্ন সঞ্চালন ও বিতরণের জন্য প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নতুন সঞ্চালন লাইন এবং প্রায় এক লক্ষ ৫০ হাজার কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ