শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

উন্নয়নের মহাসড়কে...

সাধারণভাবে আগে থেকে প্রচারণা থাকলেও পবিত্র ঈদুল আযহার প্রাক্কালে জনগণকে সরকারের উন্নয়নের প্রকৃত নমুনা দেখতে হচ্ছে। বলা বাহুল্য, নানামুখী এই নমুনার কোনো একটিও স্বস্তি বা আনন্দদায়ক নয়। লাফিয়ে বেড়ে চলা বাজার দরের বিষয়ে নিশ্চয়ই কথা বাড়ানোর দরকার পড়ে না। গতকালকের সংবাদপত্রেও এলাচ ও জিরাসহ সকল মশলার দাম বেড়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। মাছ ও সব ধরনের সবজির দাম তো বাড়ছেই। ওদিকে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে প্রচুর পশু আমদানির খবর জানা গেলেও একই সঙ্গে পথে পথে চাঁদাবাজির খবরও জানাজানি হয়েছে। বেপারীরা জানিয়েছে, এবারের চাঁদাবাজি নাকি অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে-সেখানে যথেচ্ছভাবে চাঁদাবাজি করছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। তাদের সঙ্গে যথারীতি যোগ দিয়েছে পুলিশ এবং স্থানীয় গুন্ডা-মাস্তানেরা। সে কারণে পশু প্রতি তিন-চার হাজার টাকা দাম না বাড়িয়ে পারছে না বেপারীরা। এই টাকার বোঝাও শেষ পর্যন্ত ক্রেতা সাধারণকেই বইতে হবে। এরই মধ্যে বইতে হচ্ছেও।
পশুর হাটগুলো এখনো জমে না উঠলেও খবরে বলা হয়েছে, এতদিনের প্রচারণাকে ভুল প্রমাণ করে লাখের অংকে ভারতীয় গরু ঢুকে পড়েছে সত্য কিন্তু প্রধানত চাঁদাবাজির কারণে পশুর দাম কমার তেমন সম্ভাবনা নেই। কুরবানীর পশু মানুষকে যথেষ্ট দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে। কিনতে হবেও। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে সততার সঙ্গে সামান্য সদিচ্ছা দেখানো হলেই পরিস্থিতির এতটা অবনতি ঘটতো না। কারণ, দেশের ভেতরে কৃষক ও খামারীরা ঈদে বিক্রির জন্য যে পরিমাণ পশু প্রস্তুত করেছিল তা দিয়েই চাহিদা পূরণ হওয়ার কথা ছিল। তার ওপর আবার বন্যার কারণেও অনেক কৃষক ও গৃহস্থ তাদের পশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে দেশের পশু দিয়েই এবারের ঈদুল আযহার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু একদিকে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে যথেচ্ছ চাঁদাবাজি এবং অন্যদিকে ভারতীয় গরুর কারণে সব আশাই তছনছ হয়ে গেছে। এসবের সঙ্গে বন্যার তান্ডব তো রয়েছেই।
ওদিকে ঈদ উপলক্ষে বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে গিয়েও মানুষকে উন্নয়নের নমুনা দেখতে তথা প্রচন্ড অসুবিধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এবারও ট্রেনের টিকেট নিয়ে জালিয়াতি ও প্রতারণা যথেষ্টই হয়েছে। খুব কম সংখ্যক মানুষই নিজেদের ইচ্ছা ও সুবিধা মতো দিন-তারিখের টিকেট পায়নি। তার ওপর ছিল কালোবাজারিদের অনিয়ন্ত্রিত দৌরাত্ম্য। ফলে টিকেট কিনতে হয়েছে বেশি দাম দিয়ে। বাস ও লঞ্চ-স্টিমারের ব্যাপারেও একই কথা জানা গেছে। সবচেয়ে বেশি আশংকার সৃষ্টি হয়েছে সড়ক-মহাসড়কের ভয়াবহ অবস্থার কারণে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল হয়ে উত্তরাঞ্চল অভিমুখীন প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কের অবস্থাই অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে পড়েছে। এর ফলে পাঁচ ঘণ্টার দূরত্ব অতিক্রম করতে কম করে হলেও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগছে।
প্রকাশিত খবরে উদাহরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, আগে যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে সিরাজগঞ্জের হাটিরকুমরুল থেকে রংপুর যেতে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা সময় লাগতো। আজকাল সে একই দূরত্ব অতিক্রম করে রংপুর পৌঁছাতে হলে কমপক্ষে সাত-আট ঘন্টা সময় লাগছে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতের প্রবেশদ্বার হিসেবে চিহ্নিত হাটিরকুমরুলে কিছুদিন আগে সরকার একটি গোল চত্বর নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছে। নির্মাণ কাজের সঙ্গে চলছে আশপাশের সড়কে মেরামতের কাজও। ফলে প্রতিদিন চত্বরটির চারপাশে আটকে পড়ছে শত শত যানবাহন। সেগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে। ভুক্তভোগী ও তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে গোল চত্বর নির্মাণের কাজে হাত দেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত ছিল প্রথমে খানাখন্দকগুলো মেরামত করে মহাসড়কটিকে যানজট মুক্ত করা। কিন্তু সেটা করা হয়নি বলেই যানবাহনের পাশাপাশি যাত্রী সাধারণকেও কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে তাদের মূল্যবান সময়। এর সঙ্গে অতি সম্প্রতি আবার যুক্ত হয়েছে মহাস্থানের করতোয়া সেতুতে সৃষ্ট ফাটল। এই ফাটলের কারণে দু’ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সেতুর ওপর দিয়ে একমুখী নিয়মে গাড়ি পারাপার করা হচ্ছে। ফলে ঘন্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে শত শত যানবাহনকে। আর সেখানে একবার যানজটের সৃষ্টি হলে তার ধকল সইতে হচ্ছে সারাদিন। কখনো কখনো রাতও পেরিয়ে যাচ্ছে।
এখানে একটি মহাসড়কের উদাহরণ দেয়া হলেও বাস্তবে দেশের কোথাও কোনো সড়ক-মহাসড়কই এখন আর নির্বিঘ্নে চলাচলের উপযোগী নেই। কোনো কোনোটি ১০/১৫ ফুট এলাকাজুড়ে খানা-খন্দকে এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, সেগুলো যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন এক অবস্থার মুখে এসেই মাত্র দিন কয়েক আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো তৎপর হয়েছে- সেটাও আবার গণমাধ্যমের তুমুল সমালোচনার কারণে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তার মুখে আবারও সেই ২৪ ঘণ্টার কতাই শোনা যাচ্ছে। তাই বলে স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী কোনো ব্যবস্থা কিন্তু নেয়া হচ্ছে না। কেবলই দায়সারা ‘মেরামত’ করা হচ্ছে, যাতে ঈদের সময় মানুষ কোনোভাবে বাড়ি যাতায়াত করতে পারে। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা হচ্ছে, এমনভাবেই সরকার মেরামতের কাজ করছে যাতে অদূর ভবিষ্যতেই আবারও মেরামতের নামে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ নয়-ছয় করা যায়। বলা বাহুল্য, তেমন ক্ষেত্রে ঠিকাদারির কাজও কেবল ক্ষমতাসীন দলের লোকজনই পাবে। কমিশন বাণিজ্যও চলবে যথারীতি!
বলা দরকার, এভাবে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ এবং মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কর্মকান্ডকে সমর্থন করা যায় না। এমন মন্তব্যের কারণ, বিগত দুই-আড়াই মাসের বৃষ্টি এবং তার পরপর শুরু হওয়া বন্যায় প্রায় সকল এলাকার সড়ক-মহাসড়কগুলো বহুস্থানে ভেঙে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে শত শত ছোট-বড় গর্ত ও খানা-খন্দকের। গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সব মিলিয়ে দেশের ৪৫ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলোর প্রতিটিই বিপদজনকও হয়ে উঠেছে। ইট-বালু-সিমেন্ট সরে যাওয়ায় এবড়ো-থেবড়ো হয়ে পড়েছে প্রতিটি সড়ক-মহাসড়ক। একই কারণে যানবাহন চলাচলও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও উপলক্ষ পবিত্র ঈদুল আযহা বলেই মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যার যার বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করেছে। সামনের দু’দিনও হাজার হাজার মানুষ বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করবে। অথচ অবস্থা এমন হতো না, সরকার যদি ঈদুল ফিতরের পরপর এই মেরামতের জন্য তৎপর হয়ে উঠতো।
আমরা আশা করতে চাই, অনেক দেরিতে শুরু করলেও দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর মেরামতের ব্যাপারে সরকার সততা ও আন্তরিকতার প্রমাণ দেবে এবং মেরামত করবে দ্রুত গতিতে। সরকারকে একই সঙ্গে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে যানবাহন চলাচলের ওপর কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা চাই না, ঈদুল আযহার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটুক এবং হতাহতদের চিৎকার-আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে উঠুক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ