বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মহিলাদের ঈদগাহে গমন শরঈ বিশ্লেষণ

ঈদ মুসলিম জীবনে এক আনন্দের দিন। রাসূল (সা:) যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন মদিনাবাসীদের দেখলেন তারা দুই দিন উদযাপন করছে। তখন তিনি তাদেরকে এ ব্যাপারে  জিজ্ঞাসা করলেন। তখন তিনি তাদের পূর্বপুরুষগণ প্রাক-ইসলামী যুগে উদযাপন করতেন। তখন রাসূল (সা:) বললেন: ‘আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের এ দুই দিনকে উত্তম দুই দিন-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা দ্বারা পরিবর্তন করে দিলেন।’ দুই ঈদের দিনই দু’টি বিশেষ ইবাদাতের সাথে সম্পর্কিত। এক ঈদুল ফিতর যা রমযান মাসের শেষে আগত হয়। আর ঈদুল আযহা হাজ্জের মওসুম আরাফার দিবসের পর আগমন করে। ঈদের নামায আদায় করার উত্তম জায়গা হলো ময়দান। তবে ময়দানে নারীরা যাবে কিনা এ নিয়ে আমাদের সমাজে ভিন্ন মতেরও প্রচলন আছে। নারীদের ময়দানে যাওয়া নিয়ে নিম্নে সামান্য আলোচনা তুলে ধরা হলো।
সুন্নাত হচ্ছে মহিলারা দুই ঈদেই ঈদগাহে যাবেন। সহীহুল বুখারী-সহীহ্ মুসলিম অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে উম্মু আতিয়্যাহ (রা:) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আমাদেরকে নবী (সা:) আদেশ করেছেন, আমরা যেন পরিণত বয়স্কা মেয়েদেরকে ও পর্দানশীন মেয়েকে ঈদের নামাযে যাওয়ার জন্য বলি এবং তিনি ঋতুবতী নারীদেরকে আদেশ করেছেন তারা যেন মুসলিমদের সালাতের স্থান থেকে কিছুটা পৃথক থাকে। [মুসনাদ আহমদ-৫/৮৫, সহীহুল বুখারী-১/৯৩, সহীহ মুসলিম-২/৬০৫-৬০৬ (হা: ৮৯০)।
অপর বর্ণনায় এসেছে, উম্মু আতিয়্যাহ (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (ঈদের দিন) আমাদেরকে বের হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাই আমরা ঋতুমতী, যুবতী এবং তাঁবুতে অবস্থানকারীনী মহিলাগণকে নিয়ে বের হতাম। ইবনু আওন (রা.)-এর এক বর্ণনায় রয়েছে, অথবা তাবুতে অবস্থানকারীনী যুবতী মহিলাগণকে নিয়ে বের হতাম। অতঃপর ঋতুমতী মলিাগণ মুসলমানদের জামাত এবং তাদের দু’আতে অংশগ্রহণ করতেন। তবে ঈদগাহে পৃথকভাবে অবস্থান করতেন। [আহমদ-৫/৮৫, ৬/৪০৯, বুখারী-২/৮-১০, আবু দাউদ-১/৬৭৭ (হা: ১১৩৯), আবু ইয়া’লা-১/১৯৬ (হা: ২২৬), ইবনু হিব্বান-৭/৩১৪ (হা: ৩০৪১), বায়হাক্বী ৩/১৮৪]
আত্ তিরমিযীর বর্ণনায় এসেছে যে, উম্মু আতিয়্যাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহগার দিন কুমারী, তরুণী, প্রাপ্তবয়স্কা, পর্দানশীন এবং ঋতুবতী সব মহিলাদের (নামাযের জন্য) বের হওয়ার (ঈদের মাঠে যাওয়ার) হুকুম করতেন। ঋতুবতী মহিলারা নামাযের জামাত হতে একপাশে সরে থাকত কিন্তু তারা মুসলমানদের দু’আয় অংশগ্রহণ করতেন। এক মহিলা বললেন, হে মহান আল্লাহর রাসূল! যদি কোন নারীর নিকট (শরীর ঢাকার মত) চাদর না থাকে? তিনি বললেন, তার (মুসলিম) বোন তার অতিরিক্ত চাদর তাকে ধার দিবে। (আহমাদ-৫/৮৪-৮৫, বুখারী-১/৯৩, মুসলিম-২/৬০৬, আবু দাউদ-১/৬৭৬ (হা: ১১৩৬), আত্্ তিরমিযী-২/৪১৯-৪২০ (হা: ৫৩৯), ইবনু মাজাহ-১/৪১৪-৪১৫ (হা: ১৩০৭), দারেমী-১/৩৭৭, তবরানী ফীল কাবীর-২৫/৫০-৫২ (হা: ১০১-১০৯), ইবনু হিব্বান-৭/৫৬, ৫৮, বাগাবী-৪/৩১৯ (হা: ১১১০)।
সুনান আন্ নাসায়ীতে এসেছে, হাফসাহ্ বিনতু সীরীন (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মু আতিয়্যাহ (রা:) রাসূল (সা:)-এর নাম উচ্চারণ করলেই বলতেন, ‘আমার পিতা উৎসর্গিত হোক’। একদা আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি রাসূল (সা:)-কে এরূপ বলতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমার পিতা উৎসর্গিত হোক। তিনি বলেছেন, বালেগা হওয়ার নিকটবর্তী বয়সের বালিকা, অন্তঃপূরবাসিনী ও ঋতুবতী মহিলাগণ নেক কাজে এবং মুসলমানদের দু’আর মজলিসে উপস্থিত হতে পারে, তবে ঋতুবতী মহিলাগণ সালাতের স্থান থেকে দূরে থাকবে। [নাসায়ী, হাদীস নং-৩৯০]
উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে বলা যায় যে, মহিলাদের ঈদের নামাযে উপস্থিত হওয়ার সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। http://www.alifta.net/ fatawa/fatawaDetails.aspx?Vew, Page & PageID-2866 PageNo=1 &BookID=3
ইমাম শাওকানী উল্লেখিত প্রথম হাদীসকে কেন্দ্র করে বলেন, হাদীস থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হচ্ছে যে, মহিলারা দুই ঈদে ইদগাহে যাবে। সে হোক না কেন কুমারী, তালাকপ্রাপ্ত, যুবতী, বৃদ্ধা বা ঋতুবতী মহিলাও হোক না কেন। যদি সে সীমালঙ্ঘনকারীনী না হয়। কিংবা কোন গ্রহণযোগ্য ওযর বা ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। [নাইলুল আওতার-৩/৩০৬]
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ্ বলেছেন যে, মহিলাদের এ সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, জামাতে এবং জুমার নামাযে উপস্থিত হওয়ার থেকে তাদের বাড়িতে নামায পড়াই উত্তম। তবে ঈদের নামায ব্যতীত। সেখানে যাওয়ার জন্য তাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে। কারণ-
* এক বছরে তা দুইবার। যা জুমার নামায ও জামাতে নামায পড়ার বিপরীত।
* ঈদের নামাযের কোন বদলি নামায নেই। জুমার নামায ও জামাতে নামায পড়ার বিপরীত। কেননা জুমার নামাযের বিপরীতে বাড়িতে জোহরের নামায আদায় করতে হয়।
* তারা ময়দানে বের হবে মহান আল্লাহকে স্মরণ করতে। বিভিন্ন দিক থেকে তা হজ্জের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এ জন্য হজ্জের মাসে হাহীদের সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে ‘ঈদুল আযহা’কে ‘আল-ঈদুল আকবার’ বলা হয়।
ইবনু উসাইমিনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, মহিলাদের ময়দানে যাওয়া উত্তম না বাড়িতে থাকা উত্তম?
তিনি উত্তর দেন যে, উত্তম হচ্ছে তারা ময়দানে যাবে। কেননা, রাসূল (সা.) মহিলাদের নির্দেশ দিয়েছেন ময়দানে নামায পড়তে যেতে। এমনকি ঐ সমস্ত মহিলারাও যাবে যারা সাধারণত বাড়ির বাইরে যায় না। ঋতুবতী মহিলারাও যাবে তবে তারা নামাযের জায়গা থেকে দূরে থাকবে, নামাযে শরীক হবে না। কেননা, ঈদগাহের নামাযের জায়গা মসজিদের মত। আর মসজিদে ঋতুবতী মহিলাদের অবস্থান করা ঠিক না। সুতরাং হাদীসের আলোকে বলতে পারি, মহিলারা ঈদের নামায আদায় করার ক্ষেত্রে ময়দানে যাওয়ার ব্যাপারে আদিষ্ট। তারা পুরুষদের সাথে ঈদের নামায আদায়ে অংশীদার হবে এবং তারা দুআ, যিকর ও কল্যাণ কামনা করবে। [মাজমু’ ফাতাওয়া আশ-শাইখ ইবনু উসাইমীন-১৬/২১০।]
ইমাম ইবনুল কায়্যিম আজ-জাওযী ‘কিতাবু আহকামিন নিসা’ গ্রন্থে (পৃ. ৩৮) বলেন, আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, মহিলাদের ঈদগাহে যাওয়া শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত। তবে যদি ফিতনার আশঙ্কা করা হয় তাহলে না যাওয়াই উত্তম। কেননা প্রথম যুগের মহিলা-পুরুষদের মন-মানসিকতা বর্তমান যুগের মহিলা-পুরুষদের মন-মানসিকতা থেকে অনেক উত্তম ছিল।
নারীদের ঈদগাহে যাওয়ার ‘আমলটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশের কিছু কিছু এলাকায় আজও প্রচলিত আছে। সুতরাং যেসব এলাকায় তা চালু নেই সেসব স্থানের সচেতন ‘আলেম সমাজ এবং নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের কর্তব্য হলো, মহান আল্লাহর রাসূল-এর সুন্নাতকে পুনর্জীবিত করার লক্ষ্যে মহিলাদেরকেও ঈদের এই আনন্দঘন পরিবেশে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানের জন্য এগিয়ে আসা। এ জন্য ময়দান কমিটি মহিলাদের নামাযের জন্য ময়দানে আলাদা ব্যবস্থা করবে। মহিলাদের উদ্দেশ্য থাকবে মহান আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করা, মুসলিমদের সাথে দু’আয় যোগদান করা এবং ইসলামের নিদর্শন প্রকাশ করা। তবে তারা পূর্ণ পর্দা অনুসরণ করবে। সুগন্ধি ব্যবহার করবে না এবং নিজেদের শরীর বা সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না। নামায শেষে মহিলাদেরকে আগে যাওয়া সুযোগ দিতে হবে। যেসব লোক একথা বলেন যে, বর্তমান যুগ ফিতনার যুগ, মেয়েদের নিরাপত্তা নেই বলে মেয়েদেরকে ঈদের সালাত থেকে বঞ্চিত রাখছেন, তাদের এ অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যেন প্রকারান্তরে হাদীসের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। শেষ যামানার ফিতনা বাড়বে একথা নবী (সা.) আমাদের চেয়ে বেশি অবগত থাকার পরও মহিলাদেরকে ঈদের সালাতে যেতে হুকুম দিয়েছেন। মেয়েদের নিরাপদ পরিবেশে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা থাকলে, কোন ফিতনার দোহাই দিয়ে মেয়েদেরকে ঈদগাহে যাওয়া থেকে বিরত রাখা বৈধ হবে না। মহান আল্লাহ্ অধিক ভাল জানেন। (সংগৃহীত সাপ্তাহিক আরাফাত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ