সোমবার ১৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় বারবার পড়তে হবে

জিবলু রহমান : [বার]
এটা ভুললে চলবে না যে জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ছাড়া এ দেশের আর কেউ ১৩ বছরের অধিক কারাভোগ করেন নাই। তাই মাননীয় প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। ইতিহাস এ কথাও বলে যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জনগণের দেওয়া ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
আজ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এই বাস্তব সত্যকে পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে, সেটাই আমার জন্য অনেক কষ্টের এবং লজ্জার। তাই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে আমাদের নিরীক্ষায় মাননীয় প্রধান বিচারপতির রায়ে যেসব আপত্তিকর এবং অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য আছে, সেগুলো এক্সপাঞ্জ করার উদ্যোগও আমরা নিব।
এখানে উল্লেখ করতে আমি বাধ্য হচ্ছি যে দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির, অপরাধীদের নৈরাজ্যে, অপসংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করার প্রথা থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারই মুক্ত করেছে। তাই রায়ে যখন উল্লেখ থাকে যে আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করছি ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা, তখন ব্যথিত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না।
আমি আর একটা কথা বলেই শেষ করছি, মাননীয় প্রধান বিচারপতি মামলার ফ্যাক্ট ইন ইস্যুর বাইরে গিয়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে সংবিধান পরিপন্থী বলে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তাতে আমরা বিস্মিত হয়েছি। আমরা ধন্যবাদ জানাই সেই চারজন বিচারপতিকে, যাঁরা তাঁর ওই পর্যবেক্ষণের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। আর শুধু এটুকু বলতে চাই যে এই ১১৬ অনুচ্ছেদকে সংবিধান পরিপন্থী আখ্যায়িত করার আমার মনে হয় মাননীয় প্রধান বিচারপতির যে রায় তা যুক্তিতাড়িত নয়, বরং আবেগ ও বিদ্বেষতাড়িত। আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে, প্রধান বিচারপতির আসন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং যেকোনো ব্যক্তি সেই আসন অলংকৃত করলে তাঁকেও আমরা সেই প্রতিষ্ঠানের সাথে এক করে ফেলি। তাই আমাদের সকলের দায়িত্ব এই প্রাতিষ্ঠানিক আসনটির মর্যাদা রক্ষা করা।
পরিশেষে আমি শুধু বলতে চাই, ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় এবং প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দেশ বড়। আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ১১ আগস্ট ২০১৭)
এরপর আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। আদালতের রায় সরকার কিভাবে প্রত্যাহার করবে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী কিছু বলেননি। অন্যদিকে রিভিউ আবেদন করার বিষয়ে তিনি বলেন, রায় আরো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিষয়ে রায়ে যে পর্যবেক্ষণ রয়েছে তা মানা বাধ্যতামূলক কি না-সে প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘দেখেন, এটা আদালতের পর্যবেক্ষণ। সর্বোচ্চ আদালত দিয়েছেন। তাই অপ্রাসঙ্গিক কিছু থাকলে তা দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি বলেন, রায় সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সংবিধানে সংশোধনী আনা যায়-এ কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জনগণ যা চাইবে সরকার তাই করবে।
আইনমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সামরিক সরকারের সময় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলো। এটা বহাল থাকার পরও সে সময়কার সরকার বিচারপতি কে এম সোবহান, বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি এস এম হোসেনকে জোর করে অপসারণ করল। এরপর বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হলো। কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত আসার আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন। বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফয়জীর এলএলবি সনদ নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হলো। তিনিও পদত্যাগ করলেন। এরপর একজন সিটিং জাজ হেফাজতের লিফলেট বিতরণ করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিয়ািল কাউন্সিল বসেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলো না। কী প্রক্রিয়ায় তিনি অব্যাহতি পেলেন তা জানা গেল না।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর তড়িঘড়ি করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বৈঠক ডাকা দুঃখজনক। মন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মতো ব্যবস্থা ষোড়শ সংশোধনীর আওতায় করা খসড়া আইনেও ছিল। তিনি বলেন, ‘এখানে একটা জিনিস বুঝতে হবে, ষোড়শ সংশোধনীতে আমরা বলেছিলাম, শুধু দুটি কারণে একজন বিচারককে অপসারণ করা যাবে। অসামর্থ্যতা ও প্রমাণিত অসদাচরণ। সে ক্ষেত্রে একটা খসড়া আইনও করেছিলাম। এটা স্পষ্ট ছিল, সেখানে তদন্তভার থাকবে বিচারপতিদের হাতে। সেখানেও যে ইনভেস্টিগেটিভ কমিটি ছিল, সেটা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মতোই ছিল। তাদের কর্তব্য ছিল, অভিযোগটা তদন্ত করবে। করে সংসদের স্পিকারের কাছে প্রতিবেদন পাঠাবে। তিনি সন্তুষ্ট হলে সেটা সংসদের কাছে উত্থাপন করবেন। ’আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ধারণা, এই প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক দেশের ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কিভাবে বিচার করবে, সেটা কিন্তু আপনারা দেখতে পারবেন না। তাদের রায় জানতে পারবেন।’
আনিসুল হক বলেন, ‘একজন বা তিনজনের রায় থেকে ১০০, ৩০০ জন বা সাড়ে ৩০০ জন সংসদ সদস্যের ডেলিবারেশন অনেক স্ক্রুটিনাইজড। সেই জন্যই ষোড়শ সংশোধনী করা হয়েছিল। অবশ্যই এটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া।’
রায়ের বিষয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘ওনারা কোর্ট মানেন না, বিচারককে ওনারা সম্মান দেখান না, একজন জামিনপ্রাপ্ত আসামি (খালেদা জিয়া) বিদেশ যেতে আদালতের অনুমতি নেন না। আদালতকে এইভাবে অবজ্ঞা করেন। সে ক্ষেত্রে ওনাদের মুখে আইনের শাসনের কথা সাজে না। ওনারা ওই সব ঠিক করে এসে উপদেশ দিক, আমি সেটা গ্রহণ করব।’
রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে বলা হয়েছে  যে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সিদ্ধান্ত ছিল আরো দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর অভিমত সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক টেনে আনার অবকাশ নেই।
বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কোনো টানাপড়েন আছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, কোনো টানাপড়েন নেই।
প্রধান বিচারপতি নিজেই বলেছেন যে রায় নিয়ে যেন রাজনীতি না হয়। সেটাকে কিভাবে দেখবেন জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, ‘তিনি সঠিকই বলেছেন।’
সংবিধান সংশোধন করা যায় কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণ চাইলে, জনগণের ইচ্ছায় সময়ে সময়ে সংবিধান সংশোধন করা যায়। আর জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন সংসদ সদস্যরা।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ (সংসদ সদস্যদের ফ্লোর ক্রসিংসংক্রান্ত) নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দল যদি কোনো সিদ্ধান্ত দেয় তবে তার বিরুদ্ধে ওই দলের সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন না। তবে দল যদি কোনো সিদ্ধান্ত না দেয় তবে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত বা ভোট দিতে পারেন। তিনি বলেন, ‘বিচারক অপসারণের বিষয়ে উনারা তো জানেন না যে দলের ভোট হবে নাকি উন্মুক্ত ভোট হবে। আমরা বিচারক অপসারণের আইনের যে খসড়া করেছিলাম সেখানে সব স্পষ্ট করা হয়েছে। শুধু দুটি বিষয়ে বিচারকরা তদন্তের আওতায় আসবেন-তা হলো প্রমাণিত অসদাচরণ এবং অসামর্থ্য। এর বাইরে কিছু করা হবে না। সুতরাং ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে যা বলা হয়েছে তা তথ্যনির্ভর নয়।’
নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতার জায়গা আছে, সংসদ সদস্যদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়; কিন্তু বিচার বিভাগের জবাবদিহি বা দায়বদ্ধতা কার কাছে হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সব ক্ষমতা জনগণের। তাদের কাছেই এ দায়বদ্ধতা। এটা কেউ নিতে পারবে না। রায় দিয়েও নিতে পারবে না। এ বক্তব্য সরকারের বক্তব্য কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সরকারেরই বক্তব্য। (সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ ১১ আগস্ট ২০১৭)
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত রায় নিয়ে রাজনীতি না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
১০ আগস্ট ২০১৭ আপিল বিভাগের ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বক্তব্য আপিল বিভাগের নজরে এনে ওই বক্তব্যের কারণে আদালত অবমাননার রুল জারি করার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি এক নম্বর বেঞ্চে আইনজীবীদের উপস্থিতিতে  তিনি বলেছেন, ‘এ রায় নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না। আপিল বিভাগের সাত বিচারপতি সর্বসম্মতভাবে রায় দিয়েছেন। এ রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা কেউ করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীও গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারেন। সেটা গ্রহণযোগ্য। তবে বিচার বিভাগকে রক্ষা করতে হলে কোনো রাজনীতি টেনে আনবেন না। সরকার বা বিরোধী দল কারো ট্র্যাপে (ফাঁদে) পড়ব না। আমরা এ নিয়ে সচেতন।’
ওই সময় উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মমতাজউদ্দিন ফকির, সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম, সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন এমপিসহ অনেক আইনজীবী।
শুরুতেই অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘তিনি (বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক) যা বলেছেন তা খুবই আদালত অবমাননামূলক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে চাই।’
ওই সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বারের সভাপতি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলবেন এটাই তো স্বাভাবিক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রায় দেয়ার পর তা নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা যায়। সেটা যে কেউ করতেই পারেন। সেটা গ্রহণযোগ্য।’
তখন আইনজীবীদের বেঞ্চে বসা অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন এমপি বলেন, ‘তাঁর (জয়নুল আবেদীন) বক্তব্য সমিতির নয়। এটা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের (বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের সংগঠন) বক্তব্য।’
এটা শোনার পর প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘কে বললেন? কে বললেন?’ এরপর নুরুল ইসলাম সুজন উঠে দাঁড়ান। পরে তিনি আরো সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসেন।
ওই সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘যেকোনো রায়ের পর আমরা সব সময় গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করি। এটা বিচার বিভাগের জন্য ভালো।’
এরপর অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যেটা বলেছেন সেটা আদালত অবমাননার শামিল।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের ভুল হতেই পারে। তবে তার গঠনমূলক সমালোচনা কাম্য। আপনাদের বলব, রাজনীতি টেনে আনবেন না। আমরা যে রায় দিয়েছি তা একদিন ইতিহাস বিচার করবে।’
আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম তখন কিছু বলতে গেলে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘উনি (জয়নুল আবেদীন) বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলছেন। বিচার বিভাগকে রক্ষা করতে হলে কোনো রাজনীতি টেনে আনবেন না। বিচার বিভাগ রায় দিয়েছেন। যা দেওয়ার তা দিয়েছেন। এ নিয়ে কথা হচ্ছে। আমরা কি এর প্রতিবাদ করব? বিচার বিভাগ এর প্রতিবাদ দেবে না।’
ওই সময় জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘সমিতির সভাপতি হিসেবে আমি বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার জন্য বলছি।’
তখন শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘আপনি যা বলছেন তা নিয়ে সমিতির কোনো রেজল্যুশন নেওয়া হয়নি। তাই এটা বলতে পারেন না।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা সচেতন।’
ওই সময় সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যেটা বলেছেন সেটা আদালত অবমাননামূলক। তাই তাঁর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করার আবেদন জানাচ্ছি।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব, সবাই সংযত আচরণ করবেন, যা সবার জন্য মঙ্গলজনক। সরকার বা বিরোধী দল, কারো ট্র্যাপে (ফাঁদে) পড়ব না। আমরা এ নিয়ে সচেতন। আমরা সাতজন বিচারপতি চিন্তাভাবনা করে রায় দিয়েছি। এ রায় নিয়ে কেউ রাজনীতি করবেন না। ’
তখন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে বিচার বিভাগ ও দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে কলঙ্কিত করা হয়েছে।
এ পর্যায়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মমতাজউদ্দিন ফকির দাঁড়িয়ে বলেন, ‘তাঁরা যেটা বলছেন তার রেজল্যুশন কোথায়?’
তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদালতের নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলুন। ’ তিনি জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনারা বারের (সমিতি) সাবেক সভাপতি। কেউ যাতে এ নিয়ে ফায়দা লুটতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি দেবেন। সবাই সংযত আচরণ করবেন।’
জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘এর আগে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে অর্থমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা সেটা আদালতে নিয়ে আসিনি। এখন একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির রায় নিয়ে মন্তব্য করেছেন। আমরা সেটা আদালতের নজরে এনেছি। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা এ নিয়ে অবহিত। সচেতন আছি।’
ওই সময় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেছেন যে এ রায় পূর্ব ধারণাপ্রসূত। এ কথা বলে তিনি আদালত অবমাননা করেছেন।’
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রায়ের পর দেশের যেকোনো জনগণ এর সমালোচনা করতে পারেন। তবে সেটা হতে হবে গঠনমূলক। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এর সমালোচনা করতে পারেন। সেটা গঠনমূলক হলে আমরা গ্রহণ করব। মনে রাখবেন, যে রায় হয়েছে ইতিহাস তার বিচার করবে।’ (সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ ১১ আগষ্ট ২০১৭)
সংসদের কার্যবিধির ২৭০ বিধির (বক্তৃতাকালে পালনীয় বিধি) ৩ উপবিধিতে বলা আছে (কোনো সদস্য বক্তৃতাকালে), ‘কোন আলোচনা যথাযথ ভাষায় লিখিত বাস্তব-প্রস্তাবভিত্তিক না হইলে, রাষ্ট্রপতি বা সুপ্রিমকোর্টের কোন বিচারকের ব্যক্তিগত আচরণ সম্পর্কে কটাক্ষের সমতুল্য কোন মন্তব্য করিবেন না।’ অথচ সেদিনের বিতর্কে সাংসদেরা যে তাঁদের কাছে বিচারপতিদের জবাবদিহি করতে বাধ্য করানোর জন্য কতটা সচেষ্ট তার নমুনা তুলে ধরেছেন। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে গিয়ে তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন যে তাঁদের সুপারিশে পাঁচ বছরে খুনের মামলাসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধের মোট ৭ হাজার ১৯৮টি মামলা প্রত্যাহার করানো হয়েছে। শেষ বৈঠকে ৪০টি খুনের মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। (সূত্র :  দৈনিক প্রথম আলো ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪)।  [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ