শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

চারিদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার প্রকৃত বানভাসিরা ত্রাণ পাচ্ছেনা

গতকাল রোববার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : দুর্গত-অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ না করে প্রধানমন্ত্রী নৌকা প্রতীকে ভোট চাইতেই বেশি ব্যস্ত বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল রোববার দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে আবদুল্লাহ আল নোমান একথা বলেন। তিনি বলেন, বন্যাদুর্গতদের ত্রাণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নৌকা প্রতীকে ভোট চাচ্ছেন। আমরা লক্ষ্য করছি যে, সরকার যেখানে তার ত্রাণ সামগ্রি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা সেখানে প্রধানমন্ত্রী জনসভা করছেন। সেই জনসভায় তিনি মানুষের কাছে ভোট চেয়েছেন। যেখানে আর্ত মানবতার সেবায় সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সেখানে ত্রাণ কাজে নিয়োজিত হওয়ার কথা, সেখানে নৌকা মার্কায় ভোট চাইছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত দু:খজনক।
অতীতে খালেদা জিয়া ত্রাণকার্যক্রমে গিয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেননি মন্তব্য করেন সাবেক খাদ্য মন্ত্রী নোমান বলেন, সেই সময়ে আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন এলাকায় এলাকায় গিয়ে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। ত্রাণ সামগ্রি বিতরণ করতে গিয়ে তিনি রাজনীতিকে সেখানে প্রাধান্য দেননি।
বিএনপি উত্তরাঞ্চলসহ ২৭টি জেলায় দলীয়ভাবে ত্রাণ সামগ্রি বিতরণ করছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ত্রাণ কমিটির প্রধান সমন্বয়ক। তিনি বলেন, যেটুকু আমরা খবর পাচ্ছি, বন্যা এলাকার জনগন আমাদের কাছে অভিযোগ করেছেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যারা ত্রাণ দিতে যাচ্ছে, তা খুব একটা লক্ষ্যনীয় না। তারা সেইসব ত্রাণসামগ্রি তাদের কর্মী ও তাদের লোকজনকে বিতরণ করছে, সাধারণ মানুষদের ত্রাণ বিতরণ করছে না।
নোমান বলেন, সারাদেশে ভয়াবহ বন্যায় বন্যাকবলিত মানুষ এক অবর্ণনীয় দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ ২৭টি জেলা বন্যায় ভাসছে, সীমাহীন কষ্টে নিপতিত বানভাসিরা। ইতোপূর্বে বাংলাদেশে বন্যার মতো এতবড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেনি। একদিকে খাদ্য সংকট অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্র্রগুলোতে বানভাসি মানুষের উপচে পড়া ভিড়ের দৃশ্য সত্যি হৃদয়বিদারক। আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে কোন রকমে স্থান করে নিয়েছে অসহায় নিরন্ন বন্যার্ত মানুষ। বন্যাদূর্গত এলাকাগুলোতে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এখনও প্রকৃত বানভাসিরা ত্রাণ পাচ্ছেনা, চারিদিকে ক্ষধার্ত মানুষের হাহাকার। দু’মুঠো ভাতের জন্য কাঁদছে মানুষ। আমি বন্যাদুর্গত জামালপুর, শেরপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায় ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে দেখেছি-তাদের দু:খ-দুর্দশা ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র। বন্যাদুর্গতারা পানি সাঁতরিয়ে কিভাবে খাবারের জন্য আসে, সেই দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসছে। অথচ বিএনপি’র ত্রাণ কার্যক্রমেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারী দলীয় লোকেরা বাধার সৃষ্টি করছে।
নোমান বলেন, সারাদেশে এমন অবস্থা হলেও এই মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় বর্তমান সরকারের কোন মাথাব্যথা নেই, তাদের একটিই মাথাব্যথা-সেটি হলো কিভাবে বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান তথা জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে, কুৎসা রটিয়ে, সর্বোপরি বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বানোয়াট, ভুয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়েরের মাধ্যমে গ্রেফতার ও কারান্তরীণ করে বিএনপি-কে ধ্বংস করা যায়। তাছাড়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ঘোষণার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী নেতারা প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগকে নিয়ে যেভাবে আক্রমনাত্মক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন-তাতে সরকার হিতাহিত জ্ঞানশুণ্য হয়ে গেছে বলেই মনে হয়। আর এসব কারণেই জনগণের দু:খ দুর্দশা নিয়ে ভাববার সময় তাদের নেই। বর্তমান সরকার যেহেতু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নয় বরং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে জোর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তাই জনগণের নিকট তাদের কোন জবাবদিহিতা থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। আর জবাবদিহি করার কিংবা জনগণের ভোটের প্রয়োজন হয় না বলেই তারা মানুষের দু:খ দুর্দশা লাঘবেও উদাসীন। বন্যাকবলিত এলাকার অসহায় মানুষগুলো বাড়ীঘর, সহায় সম্পদ, ফসলাদিসহ সবকিছু হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। জাতিসংঘ বন্যাদুর্গতদের দু:খ-দুর্দশা ও দেশের খাদ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা লাগামহীনভাবে মিথ্যাচার করে বলছেন দেশে কোন খাদ্য ঘাটতি নেই। আগামী বোরো মৌসুমে ধানবীজ ক্রয়ে অপারগতার দু:শ্চিন্তায় প্রহর গুণছে বানভাসিরা। সরকার বানভাসি মানুষদের পূনর্বাসন ও সাহায্যার্থে বোরো মওসুমের আগেই সুদবিহীন কৃষিঋণ প্রদানের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে শুধু ভুক্তভোসি বন্যার্ত মানুষগুলোই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও এর বিরুপ প্রভাব পড়বে।
নোমান বলেন, আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে ও তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধায়নে আমাদের নেতৃবৃন্দ বন্যা এলাকার সর্বত্র কাজ করে যাচ্ছে। বিএনপি, যুব দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, মহিলা দল, ছাত্র দল বন্যা এলাকায় কাজ করছে। এই ত্রাণ কার্য্ক্রম চলবে। ক্ষমতায় আমরা নেই কিন্তু আমরা জনগনের সাথে আছি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও আছি, ত্রাণ কাজেও আছি। জনগন যেখানে বিএনপি সেখানে।
তিনি জানান, আজ সোমবার থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে দূর্গত এলাকায় কৃষকদের মধ্যে সীমিত আকারে ‘ধানবীজ ও জালা’ প্রদান এবং ‘ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব’ দূর্গত এলাকায় চিকিৎসক টিম প্রেরণ করে মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপনের কর্মসূচি শুরু করবে বলে জানান নোমান।
বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রতি ৭ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন আবদুল্লাহ আল নোমান। এগুলো হচ্ছে, সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রদান, অতিদ্রুত গৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা, গো-খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, কৃষকদের বিনামূল্যে ধানের চারা বিতরণ, গোবাদি পশু কেনার জন্য বিনাসুদে আর্থিক অনুদান প্রদান, বানভাসিদের জন্য ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সামগ্রি প্রদান, বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকুপ স্থাপন, প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবারহ, ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তা ঘাট সংস্কার, ক্ষতিগ্রস্থ স্কুল-কলেজ মেরামত।
সাংবাদিক সম্মেলনে মাহিদ উদ্দিন ভুঁইয়া দূর্গতদের জন্য ওরস্যালাইনের প্যাকেট কেন্দ্রীয় ত্রাণ কমিটির কাছে হস্তান্তর করেন। নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান দুদু, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, আবদুস সালাম, আতাউর রহমান ঢালী, ফজলুল হক মিলন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আজিজুল বারী হেলাল, মীর সরফত আলী সপু, আবদুস সালাম আজাদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, আবদুল আউয়াল খান, মাহবুবুল হক নান্নু, নেওয়াজ হালিমা আরলী, সুলতানা আহমেদ, হেলেন জেরিন খান প্রমূখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ