শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রাণ বাঁচাতে পলায়নরত রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে গুলী করে হত্যা

মংড়– কাইন্দাপাড়ায় মগ সেনাদের নির্বিচার গুলীতে নিহত এক রোহিঙ্গা নারী (বামে) বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডের কাদা-পানির মধ্যে আটকা পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা (ডানে)

শাহনেওয়াজ জিল্লু, কক্সবাজার (দক্ষিণ) : উখিয়ার বালুখালী সংলগ্ন ঘুমধুম পয়েন্টের ওপারে ঢেকিবনিয়া এলাকায় গত শনিবার মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রচন্ড গুলীবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে। গুলীবর্ষণের ফলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মুসলমানেরা গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে অন্যত্র। সেই সাথে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশীরাও পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে। 

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সহিংতায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাটা তারের বেড়ার সন্নিকটে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের লক্ষ্যে করে বেপরোয়া গুলী চালিয়েছে বিজিপি। এতে ঢেকিবনিয়া এলাকার মসজিদের খতিব মাওলানা এরশাদ গুলীবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এছাড়াও মিয়ানমারের ফকিরাবাজার এলাকায় বিজিপি’র গুলীতে গুরুতর আহত আব্দুর রহিম (৭০) মারা গেছেন বলে দাবি করেছে রোহিঙ্গারা। তাছাড়া চমেকে মুছা নামের এক গুলীবিদ্ধ রোহিঙ্গা মারা গেছে। এছাড়াও মগ সেনাদের গুলীতে আহত মংডু কাইন্দাপাড়ার এক যুবতীও নিহত হয়েছে।

সর্বশেষ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মংডু পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের আশে পাশের রোহিঙ্গা পল্লীতে সরকারি বাহিনীর সহায়তায় অগ্নিসংযোগ করেছে রাখাইনরা। এসময় দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখা যায় রোহিঙ্গাদের বসতঘর। গতকাল রোববার বার্মার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫ টায় এ ঘটনা ঘটে। এখনও সেখানে জ্বলছে রোহিঙ্গা বসতবাড়ি। সূত্র জানিয়েছে, শত শত রাখাইন যুবক ও সৈন্য মিলে মংডুর বড় ফুটবল মাঠের উত্তর ও পূর্ব পাশের রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে প্রথমে আগুন দেয়। এর পর একেক করে সব গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয়। এসময় সাধারণ রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে দিক বিদিক ছুটে পালালে সৈন্যরা বেপরোয়া গুলী চালায়। দূরের পাহাড়ের উঁচু চূড়া থেকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলীবিদ্ধ হয়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা বিলের মাঝে ঢলে পড়ে।

সরেজমিন ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলি, ঘুমধুম লাল ব্রিজ, তুমব্রু সীমান্ত পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, হাজার হাজার রোহিঙ্গা কাটা তারের ওপারে আর্তনাদ করছে। তাঁদের চিৎকার করে বলতে শোনা গেছে, কোন রকম জীবন বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশে তাঁদেরকে আশ্রয় দেওয়া হউক। প্রয়োজনে না খেয়ে মরবে বাংলাদেশে তারপরও মিয়ানমারের সেনা ও রাখাইনের নির্যাতন থেকে বাঁচানোর আকুতি জানান এসব রোহিঙ্গা। এদিকে বিজিবি’র কড়া প্রতিরোধের মুখেও জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে কাটা তারের বেড়া পার হয়ে ঝাঁপ দিচ্ছে রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর ও বয়োবৃদ্ধরা।

৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল মনঞ্জুরুল হাসান খাঁন জানান, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত জুড়ে ব্যাপক গুলীর শব্দ শোনা গেছে গত শনিবার দুপুরে। এতে সীমান্তে অবস্থানকারী স্থানীয়রাও অজানা ভয়ভীতিতে পালিয়ে যাচ্ছে অন্যত্রে। তারপরও বিজিবি’র রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে।

ঘুমধুম বিজিবি’র নায়েক সুবেদার জাকির বলেন, সীমান্তের জলপাইতলি এলাকা দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় প্রায় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করে রাখা হয়েছে। তাদেরকে সুযোগ বুঝে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে।

উখিয়া থানার এসআই মোঃ মাঈন উদ্দিন বলেন, সীমান্তে বিজিবি’র পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধে কাজ করছে। গত শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫৪ জন রোহিঙ্গাকে অনুপ্রবেশের সময় আটক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ঘুমধমু জলপাইতলি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অভ্যন্তরে চলে আসা ঢেকিবনিয়া এলাকার বাসিন্দা লোকমান হাকিম (৫০) ও তাঁর ভাই মোঃ নোমান (৪৫) বলেন, তারা স্ত্রী, পুত্র, জায়গা-জমি, গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী ফেলে জীবন বাঁচাতে চলে এসেছেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে বিজিবি’র হাতে আটক অবস্থায় রয়েছে এরা। তাঁরা জানান, বিজিপির গুলীতে তাঁদের এলাকার হাবিবুল্লাহর ছেলে মাওলানা এরশাদ মারা গেছেন। একই এলাকার জয়নাল আবেদীন (৩৩) বলেন, গত শনিবার দুপুরে অতর্কিত প্রচন্ড গুলীর শব্দ শুনে তিনি স্ত্রী ছৈয়দা খাতুন (২৯), ছেলে হাসান (৭), মোঃ ইছা (৫) ও মেয়ে মাহিদাকে (২) নিয়ে কাটা তারের বেড়ার উপর দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যান্তরে অনুপ্রবেশ করেছেন। বয়োবৃদ্ধ শামারুব (৯০) অস্পষ্ট কন্ঠে বলেন, দুপুরে খেতে বসলে শোনা যায় গুলীর শব্দ তখন তার ছেলে জামাল আহমদ তাঁকে কাঁধে করে নিয়ে এসে সীমান্ত পার করিয়েছে। তিনি হাটতেও পারেন না।

রেজু আমতলি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা মোঃ আলম জানান, তাঁদের গ্রামের আব্দুর রহিম নামের এক যুবক বিজিপি’র গুলীতে গুরুতর আহত হলে তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা বাংলাদেশে নিয়ে আসার সময় ওয়ালিদং পাহাড়ের চিককুম এলাকায় পৌঁছলে তিনি মারা যান। বর্তমানে তাঁর মৃতদেহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চিককুম এলাকায় রয়েছে বলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান। অপরদিকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলীতে আহত মুছা ও মোক্তার ২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুছা মারা যায়।

বাও ন্যু আই’য়ে মা’ও ন্যু আই’য়ে

বাও ন্যু আই’য়ে মা’ও ন্যু আই’য়ে। অর্থাৎ পিতা-মাতা কেউ আসেনি মিয়ানমার থেকে। এর বেশি কিছু বলতে পারেনি অনুপ্রবেশকারী এক রোহিঙ্গা শিশু। নাম ছৈয়দুল আমিন। বয়স মাত্র ৪ বছর। কথা বলার সময় বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। মিয়ানমারের ফকিরাবাজার মিজ্জাইলিপাড়া এলাকার বাসিন্দা কালা চাঁন মিয়ার ছেলে মোঃ আলম (২৮) এর সাথে এই শিশুটি চলে আসে বাংলাদেশে। শিশুটি কিছু বলতে না পারলেও মো. আলম জানান, সে যখন ফকিরাবাজার সংলগ্ন পাহাড়ী অঞ্চলে ঢুকে পড়ে তখন সেই শিশু ছেলেটিকে দেখতে পায়। তখন জিজ্ঞাসা করা হলে সে তার বাবা, মা’র নাম ঠিকানা কিছুই বলতে পারেনি। আমি নিজের সন্তান মনে করে তাঁকে নিয়ে এসেছি। তাঁর ধারণা মিয়ানমারে সহিংসতা শুরু হলে গত শুক্রবার রাতে তাঁর বাবা, মা, অসাবধানতা বশতঃ শিশুটিকে ফেলে জীবন বাঁচাতে বাড়ী থেকে পালিয়ে যায়। পরে আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

রাখাইনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৮

রয়টার্স জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে থাকায় সেখান থেকে অন্তত চার হাজার অমুসলিমকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার সরকার। অপরদিকে গতকাল রোববার রাখাইন রাজ্যের কয়েক হাজার মুসলিম রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। গতকাল রোববার মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে, গত শুক্রবার রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা রাখাইনে পুলিশের ৩০টি চৌকিতে একযোগে হামলা চালালে নতুন করে যে সহিংসতা শুরু হয় তাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৮০ জন বিদ্রোহী ও ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বলে জানিয়েছে তারা। দেশটির সরকার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রাখাইনের পুরো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কয়েকশত রোহিঙ্গার লড়াই গত শনিবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সবচেয়ে হিং¯্র লড়াইয়ের ঘটনাটি ঘটেছে ওই এলাকার সবচেয়ে বড় শহর মংডুর কাছে। আরো সহিংসতার আশঙ্কায় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি, নাফনদী ও স্থল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সীমান্তে অবস্থানরত রয়টার্সের সাংবাদিক গতকাল রোববার মিয়ানমারের দিক থেকে গুলীর শব্দ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। গত শুক্রবারে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় দুই হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। 

গত অক্টোবরে মিয়ানমারের সীমান্ত পুলিশের চৌকিতে রোহিঙ্গাদের কথিত প্রাণঘাতী হামলার পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মম সামরিক অভিযান চালালে সহিংতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ওই অভিযানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। রাখাইনের সহিংসতা কবলিত এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবং সহিংসতার বিস্তারিত প্রতিবেদনে না পাওয়ায় পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরো ধারণা করা কঠিন হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সর্বশেষ হামলাটি এত ব্যাপক ছিল যে তা নিয়মিত বিদ্রোহীদের হামলা না হয়ে বরং আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বিদ্রোহী ও বেসামরিকদের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে সামরিক বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। রাখাইনের ওই সূত্রটি বলেছেন, “সব গ্রামবাসী বিদ্রোহী হয়ে গেছে, তারা যা করছে তা বিপ্লবের মতো হয়ে গেছে। মরবে কী বাঁচবে পরোয়া করছে না তারা। তাদের মধ্যে কে বিদ্রোহী কে নয় তা বলতে পারছি না আমরা।”

গুলীবিদ্ধ আরও ৪ রোহিঙ্গা সিএমসিতে ভর্তি 

চট্টগ্রাম অফিস : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন মিয়ানমারের মংডু এলাকায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে গুলীবিদ্ধ হয়ে আরও ৪ রোহিঙ্গা। শনিবার দিনগত রাতে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং রোববার সিএমসিতে ভর্তি হয়। তারা হলেন- জিয়াবুল (২৭), মো. ইলিয়াছ (২০), মো. তোহা (১৬) ও মোবারক হোসেন (২৫)। সিএমসি পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই আলাউদ্দিন তালুকদার জানান, মিয়ানমারে গুলীবিদ্ধ ৪ রোহিঙ্গা সকালে সিএমসিতে ভর্তি হয়েছে। তাদের শরীরে গুলীর চিহ্ন রয়েছে। হাসপাতালের ২৬ ও ২৮ নং ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা চলছে। এরআগে আরো ৩ রোহিঙ্গা গুলীবিদ্ধ হয়ে সিএমসিতে ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে একজন মারা গেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ