সোমবার ০১ জুন ২০২০
Online Edition

এবারও ঢাকা দক্ষিণে বসছে অবৈধ ছয়টি পশুর হাট?

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : কুরবানির ঈদ এলেই যেন উপরি কামাইয়ের একটা মওকা চলে আসে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে। যেখানে ঈদ মানে খুশি-ঈদ মানে আনন্দ,  সেখানে ওই দুই সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছে ঈদ মানে বাড়তি চাওয়া,  ঈদ মানে বাড়তি পাওয়া। এবারও এ সবের কোনো ব্যতয় ঘটছে না। নানা কিছিমের ফন্দি ফিকিরের মাধ্যমে কুরবানীর ঈদ এলেই যেন বাড়তি চাওয়া-বাড়তি পাওয়ার জন্য কোমর বেধে নেমে পড়েন তারা। আর তাদের এ কোমর বেধে নামার অবস্থার প্রেক্ষিতে যারা কুরবানীর পশুর হাটের ইজারা নেবেন,  তারাও সুযোগ সন্ধানী হয়ে ওঠেন। দফায় দফায় দেন দরবার আর  প্রভাব খাটিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তুষ্ট করে কি ভাবে নিজদের টার্গেট মাফিক দরদাম দিয়ে পশুর হাটের ইজারা নেয়ার কাজটি হাসিল করা যায় তা নিয়েই ইজারাদের গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের দৌড়ঝাপের অন্ত নেই। এবারও রাজধানী ঢাকার বুকে বসতে যাওয়া অস্থায়ী পশুর হাটগুলো থেকে কাংখিত দর পাচ্ছে না দুই সিটি কর্পোরেশনই। অভিযোগ উঠেছে,  বরাবরের মতো এবারও কুরবানীর অস্থায়ী পশুর হাটগুলো সিন্ডিকেটের কবলে।

এদিকে, ডিএসসিসির তালিকাভুক্ত অস্থায়ী পশুর হাটের বাইরে প্রতিবারই একাধিক হাট বসে থাকে,  যেগুলোকে অবৈধ বলা হলেও নানা কারণে উচ্ছেদ করার নজির বিগত দিনে নেই। সেই নজিরের ভিত্তিতে এবার যাতে তালিকার বাইরে পশুর হাট বসতে পারে সে জন্য কৌশলী ভূমিকাও নিয়েছে ডিএসসিসি। যাতে করে এবার অবৈধ হাট বলা না যায়। এ জন্য খাস আদায়ের ভিত্তিতে হাসিল আদায়ের মাধ্যমে অবৈধ হাটগুলোকে বৈধতা দিতে এ বছর কয়েকটি হাটের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। যে সব স্থানে এ সকল হাট বসার প্রক্রিয়া প্রভাবের ভিত্তিতে বসার কথা সে সব হাট নিয়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ওই হাটগুলো নিয়ে যাতে কোনো প্রকার আপত্তি কেউ তুলতে না পারে,  সে জন্য নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয় বলে জানা গেছে। 

ঈদুল আজহার এখনও ৭ দিন বাকি। ঢাকা শহরের কুরবানির পশুর হাটগুলোতে ঈদের তিনদিন আগ থেকে বেচা কেনার নিয়ম থাকলেও এ বছর ৭ দিন আগেই শুরু হয়েছে। অথচ ঈদের ৬দিন আগে হাটে বাঁশ খুটি লাগানোও আইনতো নিষেধ। এদিকে কোনো প্রকার নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে টেন্ডার আহ্বান ছাড়াই ডিএসসিসি’র সম্পত্তি বিভাগ থেকে ছয়টি হাট ইজারা দেয়া হয়েছে। এ বছরও পছন্দের প্রার্থীকে হাট ইজারা দেয়ার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নানা কৌশল আবলম্বন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৩ হাটের টেন্ডার আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত ৯টি হাটের ইজারা চূড়ান্ত করা গেছে। এই ৯টি হাট ইজারা পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতা কর্মীরা। বাকি চারটি হাটের তিনদফা টেন্ডার আহ্বান করেও কাক্সিক্ষত দর না পাওয়ায় ইজার বাতিল করে বিকল্প ব্যবস্থায় নানা কৌশলে নতুন ৬টি হাট ইজারা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে এ বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন শুধু কুরবানির হাট ইজারা থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে বসেছে। যদিও সম্পত্তি বিভাগ থেকে এ বছর কুরবানির হাট থেকে প্রায় তিন কোটি টাকার রাজস্ব কম পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন,  এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো ডিএসসিসি’র সম্পত্তি বিভাগ দেখে থাকেন। এ বিষয়ে কোনো কিছু জানার থাকলে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জেনে নিন।  

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী  বলেন,  পরপর তিনবার টেন্ডার আহ্বান করেও ডিএসসিসি’র ১৩ হাটের মধ্যে ৪টি হাটের কাক্সিক্ষত দর পাওয়া যায়নি। যে কারণে গত বছরের চাইতে এবছর ডিএসসিসি প্রায় ৩ কোটি টাকা রাজস্ব কম পাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন,  উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সংগত কারণে আমাদেরকে বিকল্প ব্যবস্থায় খাস আদায়ের ভিত্তিতে ৬টি হাট বসানোর উদ্যোগ নিতে হয়েছে। তিনি বলেন,  এ হাটগুলো না বসালে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ কুরবানির পশু সংগ্রহ করেত দুর দূরান্তে যেতে হতো। এতে নগরবাসীকে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হতো। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট হাট এলাকাবাসীর অনুরোধে এ হাটগুলোর ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়েছে। তিনি বলেন,  ডিএসসিসি’র হাট সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক এবং ডিএসসিসি’র সম্পত্তি কর্মকর্তা শাখাওয়াত হোসেনকে সদস্য সচিব বরে এ ছয়টি হাটের জন্য পরিচালনা কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে।

খাস আদায়ের ছয়টিসহ এবার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অস্থায়ী পশুর হাট বসবে ১৫টি। আগে বরাদ্দ দেয়া নয়টি হাটের ইজারাও পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। সেগুলো ইজারা দেয়া হয়েছে ৬ কোটি ২৯ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। কিন্তু দরপত্র ছাড়া দেয়া নতুন ছয় হাট কত টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে,  তা গতকাল পর্যন্ত জানায়নি সিটি কর্পোরেশন। প্রসঙ্গত,  উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাতটি হাট ইজারা দেয়া হয়েছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকায়।

ডিএসসিসি নতুন যে ছয়টি হাট দলের নেতা-কর্মীদের দিয়েছে সেগুলো হলো কাউয়ার টেক সাদেক হোসেন খোকা মাঠের আশেপাশের খালি জায়গা। গোলাপবাগ মাঠ,  সংলগ্ন স্কুল মাঠ ও ডিএসিসি’র আশেপাশের খালি জায়গা। বংশালের সামসাবাদ ঈদগাহ মাঠের আশপাশের খালি জায়গা। পোস্তগোলা শিপ্লাঞ্চলের আশেপাশের খালি জায়গা। লালবাগ বেড়িবাঁধ রাজনারায়ণ ধর সংলগ্ন ডিএসসিসি’র খালি জায়গা। বেড়িবাধ সংলগ্ন ঢাকা হাইট মাঠের আশেপাশের খালি জায়গা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  গত বৃহস্পতিবার এই হাটগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ওই দিনই গোলাপবাগ মাঠে পশুর হাট বসে গেছে। এই হাটটি দেয়া হয়েছে ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবুল কালামকে। তাঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ডিএসসিসির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং এই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বাদল সরদার। সামসাবাদ ঈদগাহ মাঠের আশপাশে হাট বরাদ্দ পেয়েছেন বংশাল থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান হোসাইন।

ডিএসসিসির একাধিক বিভাগের কর্মকর্তা ও কাউন্সিলরদের অভিযোগ,  দলীয় বিবেচনায় এই হাটগুলো বরাদ্দ দিয়েছেন ডিএসসিসির মেয়র। এ ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়নি। এর আগে এই প্রক্রিয়ায় হাট বরাদ্দ দেয়ার কোনো নজির নেই বলে জানান তাঁরা।

গত ৬ জুলাই ডিএসসিসিভুক্ত এলাকার ১৩টি স্থানে পশুর হাট বসানোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৬ জুলাই আটটি এবং ১০ আগস্ট একটি হাটের দরপত্র চূড়ান্ত করা হয়। বাকি চারটি হাট সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে কম দর পড়ায় পরপর তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও ইজারাদার পায়নি বলে জানায় সিটি কর্পোরেশন। পরে করণীয় ঠিক করতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয় সংস্থাটি। এর মধ্যে উচ্চ আদালতের নির্দেশে আরমানিটোলা মাঠের ইজারা বাতিল করা হয়েছে।

প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন,  দরপত্র চূড়ান্ত করতে না পারা ওই চারটি হাটের বিষয় মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। আর আগের দরপত্রের বাইরে অনেকেই অস্থায়ী হাটের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই হাট বাজার ইজারার সব নিয়মনীতি মেনেই হাটগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

তবে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন,  পশুর হাট ইজারা দিতে হলে আগে স্থান পরিদর্শন করবেন একজন সার্ভেয়ার। তাঁর প্রতিবেদনের আলোকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে ডিএসসিসি। যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর দরপত্র আহ্বান করবে ডিএসসিসি। কিন্তু নতুন এই ছয়টি হাটের বিষয়ে তেমন কোনো কিছুই করা হয়নি।

গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়,  প্রায় তিন একর আয়তনের গোলাপবাগ মাঠের দক্ষিণ পাশে সারিবদ্ধভাবে দুই শতাধিক গরু রাখা আছে। পশ্চিম ও উত্তর পাশে আরও অর্ধশতাধিক গরু বেঁধে রাখা হয়েছে। উত্তর পাশে পশু রাখার জন্য বাঁশ পুঁতছেন ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক। মাঠের পূর্ব পাশে চারটি ট্রাক থেকে গরু নামাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মাঠে কোনো ক্রেতা দেখা যায়নি। তবে মহল্লার শিশু-কিশোরেরা পশুর হাটে ভিড় জমিয়েছেন।

গোলাপবাগ মাঠের হাট ইজারাদার আবুল কালাম বলেন,  খাস আদায়ের ভিত্তিতে ডিএসসিসি’র মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন আমাদেরকে এ হাটটি ইজারা দিয়েছে। ডিএসসিসির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিএনপির নেতা বাদল সরদার বলেন,  গোলাপবাগে হাট বসাতে ৮ আগস্ট আমরা মেয়রের কাছে দাবি জানাই। মেয়র আমাদের হাটটি খাস আদায়ের ভিত্তিতে দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ