সোমবার ০১ জুন ২০২০
Online Edition

‘বাবার সম্মানে হলেও চলচ্চিত্রে নিষিদ্ধ নিষিদ্ধ খেলা বন্ধ করুন’

 

স্টাফ রিপোর্টার : ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক বাইরের লোক ঢুকে গিয়েছে, যারা আমাদের যুদ্ধে নামিয়ে দিয়ে তালি বাজিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটতে চায়। আমরা আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকে আবারও ফেরত পেতে চাই। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি এখন ফিল্মের লোকের হাতে নেই, বাইরের লোকের হাতে।’

সম্প্রতি মরহুম ঢালিউড মহানায়ক রাজ্জাকের স্মরণে গতকাল শনিবার সকালে এফডিসিতে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবার’ এর ব্যানারে আয়োজিত স্মরণসভায় আবেগমথিত হয়ে পড়েছিলেন তার বড় ছেলে চিত্রনায়ক ও প্রযোজক বাপ্পারাজ। চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান অস্থিরতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভ ঝরেছে এক সময়কার জনপ্রিয় এ নায়কের কণ্ঠে। তার বাবার আত্মার শান্তির জন্য, স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য হলেও সবাইকে এক ছাদের নিচে আসার অনুরোধ করেছেন। না হলে আর কখনোই এফডিসিতে পা রাখবেন না বলে জানিয়েছেন বাপ্পারাজ।

বাপ্পারাজ বলেন, ‘আমার বাবা চলে গেছে। তার উসিলায়, তার সম্মানে, আজকে থেকে আমরা এই  নিষিদ্ধ নিষিদ্ধ খেলাটা বন্ধ করে দিই। আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যকে বুকে নেয়ার অভ্যাসটা গড়ে তুলি, যদি যুদ্ধ করতে হয় আমাদের বাইরের কোনো লোকের সঙ্গে যুদ্ধ করব, নিজেদের মধ্যে না।’

অভিমানভরা কণ্ঠে বাপ্পারাজ বলেন, আজকে এটাই বলে গেলাম, হয়তো এটাই আমার শেষ আসা, আমি ফিল্মে আর কোনো দিনই আসব না। যদি আমি কালকে না শুনি যে হ্যাঁ আমরা আবার মিলে গেছি, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে, তাহলে আসব।

নিজেরা নিজেদের সম্মান দিতে না পারায় এই অবস্থা হয়েছে মন্তব্য করে বাপ্পারাজ বলেন, আমরা বলি আমরা পরিবার, কিন্তু সদস্যদের খালি বহিষ্কারই করে দিই। পরিবার কখনো তার সদস্যকে বহিষ্কার করে না, শাসন করে। শাসন করবেন। একসঙ্গে থাকবেন। আমাদের মুরুব্বিরা এখনো আছেন। যারা আমাদের শাসন করতে পারে, পথ দেখাতে পারে, এ জন্য আমাদের বেতের বাড়ি মারার দরকার নেই।

আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করেন বাপ্পারাজ, আজকে সুচন্দা আন্টি সামনে আছেন, উনি যদি কালকে শাকিবকে ফোন করে বলে, তুমি এফডিসিতে পরিচালক সমিতিতে আসো, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব। ফারুক সাহেব, আলমগীর সাহেব যদি অফিসে বসে বলে, শাকিব আসো, তোমার সঙ্গে কথা বলব। শাকিব অবশ্যই আসবে। এটার জন্য নোটিশ করার দরকার হয় না। পুলিশ পাঠানোর দরকার হয় না।

এ প্রজন্মের তারকাদের সিনিয়রদের প্রাপ্য সম্মান করারও অনুরোধ করলেন বাপ্পারাজ, যারা বেঁচে আছেন, তাদেরকে সম্মান দেবেন। ছোটদের উচিত অগ্রজদের সম্মান দেয়া। তাদের যে যোগ্যতা যে আসন, সেটা যেন আমরা দিতে পারি।

সবাই মিলে-মিশে থাকলেই তার বাবাকে সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে বলে মনে করেন বাপ্পারাজ, আপনারা অনেকেই বলছেন, রাজ্জাক সাহেব এই , রাজ্জাক সাহেব সেই। রাজ্জাক সাহেব কিন্তু কখনোই বিভেদ করেন নাই, বিভাজন করেন নাই, কাউকে বহিষ্কারও করেন নাই, নিষিদ্ধও করেন নাই।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গণের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি অভিনেতা ও বাংলার মানুষের প্রাণপ্রিয় নায়ক রাজ্জাকের রুহের মাগফেরাত কামনা করে চলচ্চিত্র পরিবার কাঙ্গালীভোজ ও দোয়া মাহফিলেরও আয়োজন করে। ছিল তার চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও। চলচ্চিত্রাঙ্গনের ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি নায়করাজের ভক্ত ও শুভ্যানুধ্যায়িরা এ আয়োজনে অংশ নেয়।

মহানায়ককে স্মরণ করে স্মৃতিচারণে অংশ নেন নায়ক ফারুক, আলমগীর, সোহেল রানা, সৈয়দ হাসান ইমাম, চিত্রনায়িকা সুচন্দা, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, নায়ক শাকিব খান, ফেরদৌস, ওমর সানি, সুব্রত, আলীরাজ, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি অভিনেতা মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক নায়ক জায়েদ খানসহ আরও অনেকে। আর নায়করাজের পরিবারের পক্ষ থেকে বাপ্পারাজের পাশাপাশি ছোট ছেলে স¤্রাটও কথা বলেন।

নায়ক ফারুক বলেন, নায়করাজ নেই, কিন্তু তার সৃষ্টিকর্ম রয়ে গেছে। আছে তার বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র ও গান। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে এ প্রজন্মের শিল্পীরা যেমন মূল্যায়ন করছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বিশ্লেষণ ও গবেষণা করবে।

নায়ক আলমগীর বলেন, আমরা আমাদের অভিভাবককে হারিয়েছি। তিনি সব সময় স্বপ্ন দেখতেন চলচ্চিত্র পরিবার এক থাকবে। রাজ্জাক ভাইয়ের এ স্বপ্ন, আমাদের সবার স্বপ্ন। তিনি বলেন, ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া হতে পারে, দ্বন্দ্ব হতে পারে, এমনকি মারামারিও হতে পারে। কিন্তু রাজ্জাক ভাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে, আমাদের এই ভাইয়ে-ভাইয়ের দ্বন্দ্ব মিটমাট করে চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সুচন্দা বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের পথিকৃৎদের একজন রাজ্জাক ভাই। তার অবদান ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে ভেবেছেন। তিনি বলেন, তার সঙ্গে অনেক ছবিতে জুটিবদ্ধ হয়ে কাজ করেছি। সব স্মৃতি ভেসে উঠছে। আমি কিছুতেই মানতে পারছি না নায়করাজ আর নেই। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যদি কোনদিন বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিতে পারে, তাহলে সত্যিকার অর্থে রাজ্জাক ভাইয়ের স্বপ্ন সার্থক হবে, তার আত্মা শান্তি পাবে।

শাকিব খান বলেন, এখনকার প্রজন্ম এবং আগামী যত প্রজন্ম আসবে তাদের কাছে নায়ক রাজ রাজ্জাক প্রেরণা হয়ে থাকবে। আমরা একজন আইডল হারালাম। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতিষ্ঠানতূল্য এ অভিনেতা গত সোমবার কার্ডিয়াক এ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। তিনি নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তাকে বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ