বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০
Online Edition

নাফ নদীতে ভাসছে হাজারো রোহিঙ্গা

সংগ্রাম ডেস্ক : করিমুল্লাহ। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের মংডুর বাসিন্দা। তিনি বলছেন, ‘তার পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। মংডুতে উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং অচলাবস্থার তৈরি হয়েছে।’

বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে টেলিফোনে তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাট জনমানবশূন্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, মার্কেটসহ সবকিছু বন্ধ রয়েছে। মানুষজন বের হচ্ছেন না।’

মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের দিকে ছুটছেন হাজারো রোহিঙ্গা মুসলিম। বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বলছে, শুক্রবার রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮৯ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে ৭২ রোহিঙ্গা বিদ্রোহী ও নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য রয়েছে।

দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এই হামলার কারণে সংঘাত নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে একই ধরনের হামলার পর দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমার সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে।

মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র বলছে, শনিবারও একটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেত্রী অং সান সু চি শুক্রবারের ওই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

শুক্রবার মিয়ানমার পুলিশের অন্তত ৩০টি পোস্ট ও সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে লাঠি, বন্দুক ও হাতে তৈরি বোমা নিয়ে হামলা চালায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা। পরে এসব স্থান থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রামবাসীকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়।

রাখাইনে আরও সহিংসতার আশঙ্কায় হাজারো রোহিঙ্গা বাংলাদেশের দিকে আসছেন। বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদীতে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা ভাসছেন বলে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির কক্সবাজার জেলার ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ আলী হোসাইন রয়টার্সকে এ তথ্য জানান।

রাখাইনের ১১ লাখ রোহিঙ্গা শান্তির নোবেল জয়ী অং সান সু চির ১৬ মাসের প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংখ্যালঘুদের দেশটির সেনাবাহিনীর নৃশংস নিপীড়ন ও তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে সু চির বিরুদ্ধে।

গত বছরের অক্টোবরে রাখাইনের সহিংসতার পর বাংলাদেশে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম ঢুকে পড়েছে বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী বলছে, রাখাইন থেকে স্থানীয়দের হেলিকপ্টারযোগে সরিয়ে নেয়া হবে। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও অনেককে সরিয়ে নেবেন। স্থানীয়রা বলছেন, নিরাপত্তা বাহিনী ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষে ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর প্রচুর গাড়ি দেখা যাচ্ছে।

প্রতিহিংসা না চালাতে মিয়ানমারকে যুক্তরাষ্ট্রের আহবান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর প্রতিহিংসামূলক কার্যকলাপ না চালানোর আহবান জানিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে দেশটির সেনাবাহিনীর সার্জিক্যাল অপারেশন শুরুর পর ১২ জন পুলিশ ও ৭৭ জন রোহিঙ্গা মারা যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এ আহবান জানাল।নতুন করে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, এধরনের হত্যা ও নির্যাতনের কোনো কারণ নেই, এটি সমর্থনযোগ্য নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে নিন্দোষ রোহিঙ্গাদের রক্ষায় ভূমিকা রাখারও আহবান জানিয়েছে।

এদিকে মিয়ানমারের নেত্রী অং সাং সুচি পুলিশর হতাহতের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, শুক্রবার তার দেশের সেনাবাহিনী ও সীমান্ত পুলিশ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় এবং এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। মিয়ানমার সরকার বলছে শতাধিক রোহিঙ্গা হামলাকারী বন্দুক ও ঘরে তৈরি গ্রেনেড নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

রাখাইন অঞ্চলের মংগদু শহরের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেনারা শুক্রবার সকাল দশটার দিকে গ্রামে ঢুকে পড়ে বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। এসময় তারা ১০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে বিনা উস্কানিতে গুলি করে হত্যা করে।

এদিকে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভ্যাশন আর্মি গত বৃহস্পতিবার অন্তত ২৫টি স্থানে হামলার কথা স্বীকার করে বলেছে তারা রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও লুটপাটের মত ঘটনার প্রতিবাদে এধরনের হামলা চালিয়েছে। টুইটারে দেওয়া এ বার্তায় তারা আরো জানান, রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে এধরনের হামলা বৈধ।

তবে অং সাং সুচি বলেছেন রোহিঙ্গাদের হামলা পরিকল্পিত ও রাখাইন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বিনষ্ট করার জন্যেই এধরনের হামলা করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র হিদার নুরেট এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ও তা মেনে চলা। রোহিঙ্গাদের মৌলিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘন না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখার জন্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়ে হিদার নুরেট বলেন, মিয়ানমারের আইন শৃঙখলা বাহিনীর উচিত কোনো সহিংসতা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

হিদার নুরেট বলেন, বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহিংসতা নিরসনে রাখাইন অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এর আগে এধরনের আহবান জানান, জাতিসংঘের একটি কমিশন। ওই কমিশনের নেতৃত্ব দেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। সুচির অফিস থেকে ফেসবুকে এক বার্তায় বলা হয়েছে, রাখাইন অঞ্চলে কফি আনানের দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন বাঞ্চাল করার জন্যেই পুলিশের ওপর এধরনের হামলা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, গত অক্টোবর পুলিশের ওপর হামলার পর রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অকথ্য নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ, হত্যা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালিয়ে আসছে। অন্তত ১ হাজার বাড়ি ঘর সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এর ফলে আরাকান স্যালভ্যাশন আর্মির মত সংগঠন এধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগামে উদ্বুদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছে ও হামলার ঘটনা ঘটছে।

দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার হারিয়ে নির্যাতনের কবলে পড়েছে। ২০১২ সালের পর থেকে শত শত রোহিঙ্গা নারী পুরষকে হত্যা করা হয়েছে। অন্তত ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ঘর বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে খোঁজে অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমিয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা গত অক্টোবরের পর পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ