সোমবার ০১ জুন ২০২০
Online Edition

ঝুঁকিতে ট্রেন ও লঞ্চ যাত্রা 

 

কামাল উদ্দিন সুমন : সড়ক পথের বেহালদশার কারণে এবার ঈদ যাত্রায় ট্রেন ও লঞ্চে ঘরমুখী মানুষের ভয়াবহ চাপ বাড়বে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে নৌ ও রেলপথ। ইতোমধ্যে লঞ্চ ও রেলটার্মিনালে যাত্রী চাপ বাড়তে শুরু করছে। ঈদুল আযহার কারণে অনেকে এবার আগেভাগে গ্রামের বাড়িতে যেতে শুরু  করছেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণত ঈদযাত্রায় বাসের চেয়ে ট্রেনের টিকিটের চাহিদা বেশি থাকে। সম্ভাব্য আবহাওয়া পরিস্থিতি, সড়কের বেহাল অবস্থাসহ কয়েকটি কারণে এবার ট্রেনের টিকিটের চাহিদা আরও বেশি। বাস ও ট্রেনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণাই মিলছে।

এবারে ঈদ হচ্ছে ২ সেপ্টেম্বর। বাস ও ট্রেনের অগ্রিম টিকিট ছাড়া শুরু হয় গত ১৮ আগস্ট থেকে। রাজধানীর মিরপুর রাইনখোলা এলাকার বাসিন্দা মনির হোসেন নিজে আগামী ৩০ আগস্ট বগুড়া যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিটের লাইনে দাঁড়ান। ওদিকে তিনি ওই দিন পরিবারের আরেক সদস্যের মাধ্যমে বাসের টিকিটও সংগ্রহ করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনির বলেন, ‘বাস ও ট্রেনের টিকিট একসঙ্গে সংগ্রহ করেছি। ট্রেনের টিকিট পাব কি না, তার নিশ্চয়তা ছিল না। এখন একই দিনে বাস ট্রেনের টিকিট পাওয়ায় বাসের টিকিট বিক্রির জন্য লোক খুঁজছি। তাঁর কথা, এবারে সড়কের অবস্থা খারাপ আর সম্ভাব্য যানজটে পড়ার কথা চিন্তা করে বাসে যাচ্ছি না।’

অনেক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, যাঁরা সাধারণত বাসে বাড়ির পথ ধরেন, তাঁরা এবার ট্রেনকে বেছে নিয়েছেন। এ কারণে ট্রেনের টিকিটের চাহিদা বেশি। অনেক পরিবহন মালিক এবারের ঈদে বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন।

কল্যাণপুরের বাসিন্দা জমির হোসেন বলেন, তিনি ৩১ আগস্ট দিনাজপুর যাবেন। সে অনুযায়ী ট্রেনের টিকিটও কেটেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘এবারই প্রথমবারের মতো ট্রেনে বাড়ি যাব। আগে সব সময় বাসে গিয়েছি। এবার যেভাবে যানজটের খবর পাচ্ছি, তাতে বাসে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি।’

জানতে চাইলে কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্ত্তী বলেন, সড়কপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এবার যেকোনো ঈদ থেকে ট্রেনে যাত্রীদের চাপ বেশি। প্রচুর মানুষ বাসে না গিয়ে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করেছেন। তবে অনেকে প্রত্যাশিত টিকিট না পেয়ে ফিরে গেছেন।

মফিজুর রহমান নামের একজন বলেন, তিনি এস আর ট্রাভেলসে ৩০ আগস্টের টিকিট কাটতে গিয়ে শোনেন ৩০ ও ৩১ তারিখের টিকিট তারা দিচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস আর ট্রাভেলসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাই, রাস্তার বেহাল। যে বাস ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে, তা সঠিক সময়ে আসছে না। ১০ ঘণ্টার পথ লাগছে ১৫ ঘণ্টা। এ অবস্থায় টিকিট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েও বাস বন্ধ করে দিতে হয়েছে।’

হানিফ এন্টারপ্রাইজের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক আবদুস সামাদ  বলেন, গত ঈদে উত্তরবঙ্গের রুটগুলোতে দৈনিক সোয়া দুইশ পর্যন্ত ট্রিপ চালানো হয়েছে। এবার তা ১৭০-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রতি রুটেই দুই-তিনটি করে ট্রিপ কমেছে।

তাঁর কথা, ‘এমনিতে ঈদের সময়ে দুই-তিন ঘণ্টা দেরিতেই যাত্রীরা অস্থির হয়ে ওঠেন। সেখানে যদি কাউকে সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তো সবার জন্যই বিপদ। তাই বেশি পরিমাণে আগাম টিকিট বিক্রি করে আমরা কাউকে বেকায়দায় ফেলতে চাই না।

এদিকে সড়কের বেহালদশার কারনে অনেক যাত্রী এবার ঈদে ঘরে ফেরার জন্য লঞ্চকে বেছে নিয়েছে। ফলে নৌ পথে বাড়বে অতিরিক্ত যাত্রী। লক্ষ্মীপুরের বায়পুরের বাসিন্দা ইয়ামুম জানান, ঈদে আমার পরিবার পরিজন নিয়ে সাধারনত সায়েদাবাদ থেকে বাসে যেতাম কিন্তু এবার ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং রায়পুর কুমিল্লা আঞ্চলিক সড়কের যে বেহাল দশা তাকে করে রাস্তায় ভয়াবহ যানজটে পড়তে পারি। এমন আশংকা থেকে আমরা লঞ্চে চাঁদপুর হয়ে বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। 

এদিকে ঈদুল আযহা উপলক্ষে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘরে ফেরা মানুষের চাপ থাকে কয়েকগুণ বেশি। তাই রাজধানী থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরে ফেরা যাত্রীদের চাপ সামলাতে ও নিরাপত্তায় এবার অতিরিক্ত কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। এবারও সব ধরনের অনাকাঙ্কিত পরিস্থিতি এড়াতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) একযোগে কাজ করবে। এছাড়া এবার যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সদরঘাটের ১৪টি প্রবেশপথে মোট ২৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য চার হাজার ২০০ বর্গফুট পার্কিং স্পেস করা হয়েছে।

সদরঘাটের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক জয়নাল আবেদীন জানান, এবারের ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে কয়েকটি স্তরে নেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), কোস্টগার্ড, র‌্যাব, আনসার বাহিনী, বিআইডব্লিউটিএর নিজস্ব ডুবুরি দল, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) এবং নৌ-নিরাপত্তার ক্যাডেট দল কাজ করবে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে সে দিকে বিশেষ নজর রাখছি আমরা। কোনো লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের প্রতিটি লঞ্চে পর্যাপ্ত মাস্টার ও ড্রাইভার রয়েছে কিনা তা ইতোমধ্যেই পরীক্ষা করেছে বিআইডব্লিউটিএ এবং প্রতিটি লঞ্চে যাত্রী সংখ্যা অনুপাতে বয়া ও লাইফ জ্যাকেটের সংখ্যা বাড়ানো, সার্ভে সনদ ছাড়া কোনো নৌযান ঘাটে ভিড়তে পারবে না, কোনো লঞ্চ মাঝ নদীতে রাখা যাবে না ও নৌকা দিয়ে লঞ্চে যাত্রী ওঠানো যাবে না বলে নির্দেশনাও দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে এরই মধ্যে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন মরমুখী মানুষ। এ উপলক্ষে যাত্রীদের সুবিধার্থে এবং অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে ২৭ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, ঢাকা বন্দর হতে চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, ইচুলী, মাদারীপুর, কালাইয়া, আমতলী, বোরহানউদ্দীন, পটুয়াখালী, হুলারহাট, লালমোহন, রাঙ্গাবালী, টরকী এবং লেতরা বাজার রুটে এই বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চলাচল করবে।

এছাড়া চাঁদপুর নদী বন্দর থেকে বরিশাল এবং নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর থেকে চাঁদপুর, তালতলা, রামচন্দ্রপুর, মাছুয়াখালী, সুরেশ্বর ও মতলব রুটেও ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চলাচল করবে।

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সারা দেশে রেল, সড়ক ও নৌপথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেন, এবারের ঈদযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী বলেন, প্রতি ঈদে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের কাছে যায়। তাই প্রতিবছর ঈদে নির্বিঘেœ যাতায়াত নিয়ে নানা সমস্যা ও শঙ্কা দেখা দেয়। ঈদের আগে তড়িঘড়ি করে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্ত এভাবে শুধু ঈদকে সামনে রেখে দায়সারা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলে হবে না, সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

মনজুরুল আহসান খান বলেন, বন্যা ও অতি বর্ষণের কারণে অনেক সড়ক ও রেলপথ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নৌপথের ওপর চাপ বেশি পড়বে। তাই এবার ঈদে সড়ক, নৌ ও রেলপথ তথা সমগ্র পরিবহন ব্যবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি  বলেন, জনগণের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। যেহেতু রাষ্ট্রের চালক সরকার, তাই নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। দুর্ঘটনা ও জনভোগান্তি রোধে সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ