শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গোপনীয়তা মৌলিক অধিকার -ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

 

২৪ আগস্ট, হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি : ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আজ গোপনীয়তাকে মৌলিক অধিকার বলে রায় দিয়েছে। আদালতের ওই রায় কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় ধাক্কা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের নেতৃত্বাধীন ৯ সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে ওই রায় ঘোষণা করেন।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, ডিজিটাল যুগে গোপনীয়তা কারো মৌলিক অধিকার হতে পারে না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের ওই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপাল সুপ্রিম কোর্টে তার সাফাইতে বলেছিলেন, ‘তথ্যের গোপনীয়তা’ গোপনীয়তার অধিকার নয় এবং তা কখনই মৌলিক অধিকারও হতে পারে না।’   

আদালতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা তার সাফাইতে বলেন, ‘এখন ডিজিটালের সময়, এতে গোপনীয়তা বলে কিছু নেই।’

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের তথ্য সুরক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বি এন শ্রীকৃষ্ণের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটিতে ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’র মুখ্য কর্মকর্তাকেও রাখা হয়েছে।

আদালতের বাইরেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সাফাই দিয়েছিলেন, বর্তমান সময়ে সবকিছু ডিজিটাল সেজন্য এর মধ্যে গোপনীয়তা বলে কিছু নেই।  

আদালতের রায়কে কংগ্রেসসহ বিরোধীদলীয় নেতারা স্বাগত জানিয়েছেন। সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ও কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা পি চিদম্বরম বলেন, ‘ গোপনীয়তা রক্ষা মৌলিক অধিকার। ১৯৪৭ সালে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, তা আরো সমৃদ্ধ হল। গোপনীয়তা রক্ষাই ব্যক্তি স্বাধীনতার ভিত্তি প্রস্তর। সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদ আরো গুরুত্ব পেল।’  

কংগ্রেসের মুখপাত্র রণদীপ সূর্যেওয়ালা বলেন, সুপ্রিম কোর্ট আজ ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। সংবিধানের ফাঁকফোকর তুলে ধরে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল মোদি সরকার। সুপ্রিম কোর্ট সেই চেষ্টা ভেস্তে দিয়েছে। স্বাধীনতার জয় হয়েছে।’

সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মনীশ তিওয়ারি বলেন, ‘আশাকরি এবার অন্তঃত মোদি সরকার আমার রান্নাঘর, শোয়ার ঘর এবং আলমারির কাছে ঘুরঘুর করবে না। আড়ি পাতবে না ব্যক্তিগত কথোপকথনে।’  

সিপিআই(এম)-এর মহাসচিব সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, ‘মানুষের মৌলিক অধিকার খর্বের সবরকম অশুভ পরিকল্পনা করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। আইনজীবী, সমাজকর্মীসহ যারা তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছেন, তাদের সকলকে অভিনন্দন।’

 কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ‘আধার’ কার্ড চালু হওয়ার পর নাগরিকদের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে হচ্ছে বলে গত কয়েক মাসে আদালতে একাধিক আবেদন জমা পড়ে। আধার কার্ডের বহু তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে বলে অভিযোগ ওঠে। এরফলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে গোপনীয়তা বলে কিছু অবশিষ্ট থাকছে না বলে অভিযোগ।  

আদালতে আবেদনকারীরা দাবি করেন, ‘আধার’ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও আদানপ্রদান গোপনীয়তা রক্ষার ‘ মৌলিক’ অধিকারের লঙ্ঘন।

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের ফলে ‘আধার’ সংক্রান্ত আইনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন উঠে গেল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এদিকে ‘আধার কার্ড’ নামে একটি পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করতে গিয়েই আইনি প্রতিরোধের শিকার হয় নরেন্দ্র মোদি সরকার। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ১২ ডিজিটের নম্বরযুক্ত ওই কার্ড বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি রিট আবেদন হয়। জারি করা হয় রুল। সেগুলো নিষ্পত্তি করে গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আভাস দিয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের যুগান্তকারী এই রায়ের পর ‘আধার কার্ড’ নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদির সরকার।

সামাজিক সুরক্ষা খাতের বিভিন্ন সুবিধা পেতে কেন্দ্রীয় সরকার আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয়। আধারের কার্ড নিতে গেলে নাগরিকদের চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ দিতে হয়, যা তথ্যভাণ্ডারে জমা থাকবে। এছাড়া নাম-ঠিকানা ও আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রায় যাবতীয় তথ্য সেখানে রক্ষিত থাকবে।

আধার কার্ডের জন্য নাগরিকের ব্যক্তি জীবন প্রকাশ্যে আসবে না বা তার অধিকার খর্ব হবে না বলেই দাবি ছিল নরেন্দ্র মোদির এনডিএ জোট সরকারের। তারা দাবি করে আসছিলো, ব্যক্তিগত গোপনতা নাগরিকের মৌলিক অধিকার নয়। বিপরীতে আধার কার্ড বাতিল চেয়ে করা আবেদনকারীদের ভাষ্য ছিল, এর ব্যবহারে জোর জবরদস্তি গোপনীয়তা ভাঙার শামিল। আধারের তথ্যভাণ্ডারে নিবন্ধন একটি ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরে এতে তথ্য দেওয়া প্রত্যেক ভারতীয়কেই একটি পরিচিতিপত্র দেওয়ার প্রস্তাব ছিল বলে দাবি তাদের। সর্বোচ্চ আদালতের রায় গেছে তাদেরই পক্ষে।

রায়ে ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’কে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া বিচারকরা বলছেন, ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে দেওয়া জীবন ধারণ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার রক্ষার অংশ হিসেবেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার আধার কার্ডকে প্রায় সর্ব ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক করে তুলেছিল। রায়ের ফলে সেই আধার আইনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন উঠল। এই রায়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আধার সংক্রান্ত নিয়মকানুনও নতুন করে বিচার্য হতে চলেছে। গোপনীয়তার অধিকারের পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। এই রায়ের ফলে আধার কার্ড এর অচল হয়ে পড়ল কিনা সে ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট কিছু বলেনি বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো মনে করছে, আইডি কার্ডে ব্যক্তিগত গোপন তথ্য লাগে, বিধায় এই রায়ে মোদি সরকারের আধার কার্ড চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তারা জানিয়েছে, এ ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত নেবে বিচারপতিদের ৫ সদস্যের একটি বেঞ্চ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ