বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

মোশাররফ হোসেন খান : বাংলাসাহিত্যের অনিবার্য কবি

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ : মোশাররফ হোসেন খান। সাহিত্যচর্চায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়া আপাদমস্তক একজন কবি। পেশা নেশা এবং কল্পনার রাজ্যেও যিনি একজন চলমান লিখিয়ে। সময়ের পাহাড়কে বুকে ধারণ করে তিনি লিখে চলেছেন অনবরত বয়ে চলা নদীর মতো। গ্রীস্ম-বর্ষার কোন প্রভাব তাঁর লেখালেখির স্্েরাতকে কখনো ব্যাহত করেনি। বরং জীবন সমস্যার মোকাবেলায় তিনি কলমকে শক্তিশালী পরমবন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নিজের তৃপ্তির মশাল জ্বালান। লিখে চলেছেন কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, জীবনমুখী গদ্যসাহিত্যসহ শিশু-কিশোরদের সাহসী স্বপ্নবোনার নানা অনুসঙ্গ নিয়ে। তিনি স্বপ্ন দেখেন মানবতার মুক্তির। হেরার রাজতোরণ তাঁর মঞ্জিল, শান্তিময় আবাস হবে লাল-সবুজের বাংলাদেশ- মানবতার জন্য হবে পৃথিবী। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা নয়, ভালোবাসার খেলা, জীবনের খেলা। গালাগালি নয়, গলাগলি হবে মানুষে মানুষে। সাদা-কালো, বর্ণভেদ, মানবতার অবমূল্যায়নকে তিনি ঘৃণা করেন, ভালোবাসেন কুসুমিত হাসি। সেই হাসিতেই গেয়ে ওঠেন শান্তির গান, গড়ে তোলেন সবুজের স্বপ্ন। তাইতো নিরাপদ পৃথিবীর স্বপ্নে তিনি বলে উঠেন, ‘আমার হাতের তালুতে সুন্দর শিশুর মতো/ নিরাপদে হেসে ওঠে উজ্বল পৃথিবী।’

যশোর জেলা মানেই সাহিত্য-সংস্কৃতির উর্বরভূমি। ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া গ্রামেই তাঁর জন্ম। ডা. এম এ ওয়াজেদ খান এবং বেগম কুলসুম ওয়াজেদ তাঁর গর্বিত বাবা-মা। ১৯৫৭ সালের ২৪ আগস্ট তাদের কোল আলোকিত করে পৃথিবীতে আসেন তিনি। লেখালেখি আর সম্পাদনার মধ্যদিয়ে তিনি কাটিয়ে দিলেন জীবনের ছয়টি দশক, ষাটটি শীত-বসন্ত। স্ত্রীÑবেবী মোশাররফ, পুত্রÑনাহিদ জিবরান, কন্যাÑ নাওশিন মুশতারী ও নাওরিন মুশতারীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করছেন দীর্ঘদিন থেকে। সবুজাভ গ্রামের ঐতিহ্য এবং শহরের রঙিনস্বপ্নের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সাহিত্যের ক্যানভাস।

কবি মোশাররফ হোসেন খানকে জানি আমার স্কুলজীবন থেকেই। কবি মতিউর রহমান মল্লিক, গোলাম মোহাম্মদ, আবদুল হাই শিকদার, সোলায়মান আহসান, আসাদ বিন হাফিজ, হাসান আলীম, মুকুল চৌধুরী, বুলবুল সরওয়ার, চৌধুরী গোলাম মওলা প্রমুখ কবির নামগুলোর সাথে পরিচয় ঘটে সে সময়ই। আশির দশকের এ সব তারকাকবির লেখার সাথে পরিচয় ঘটেছে তখন থেকেই। সাহিত্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকায় তাদেরও পাঠ করতাম হৃদয়ের গভীরতম উপলব্ধি থেকে। ছোটকাগজ সম্পাদনার মাদকতায় নিজেকে বিমোহিত রাখতাম। আশির দশকের শেষদিকে সারিয়াকান্দি উপজেলা মফস্বল থেকেই সম্পাদনা করতাম সাহিত্যের ছোটকাগজ ‘আল ইশরাক’। নব্বইয়ের শুরুতে সাহিত্যের ছোটকাগজ ‘সমন্বয়’ সম্পাদনা করার সময় ঢাকায় গিয়ে বাসায় বসে  মোশাররফ হোসেন খানের কাছে থেকে লেখা নিয়ে এসেছিলাম। বাসায় গিয়ে লেখা নিয়ে এসেছিলাম কবি ও গীতিকার চৌধুরী গোলাম মওলার। আমার জেদ রক্ষা করতে গিয়ে মোশাররফ হোসেন খান তরতাজা কবিতার জন্মদিয়েই সদ্যপ্রসুত লেখাটি আমার হাতে দিয়েছিলেন। ‘আরাধ্য কাফন’ নামের সে কবিতাটি ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ক্রীতদাসের চোখ’ কাব্যের চৌদ্দতম কবিতা হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে। তবে ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত সেই ছোটকাগজ ‘সমন্বয়’ এ ছাপা কবিতাটি গ্রন্থবদ্ধ হবার আগে কিছুটা সংস্কারও করা হয়েছে।

লেখার সাথে কাটাছেঁড়া শব্দটি বেশ যুতসই এবং যুগলবন্দী। প্রলয় ধ্বংস নয়, নতুন সৃষ্টির বেদনামাত্র। ভাঙতে পারেন তিনিই যিনি নতুন করে গড়তে জানেন। কবিদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটে না। বরং প্রকৃত কবি তিনিই যিনি নিজের কবিতার ব্যবচ্ছেদ করেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে। খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষের মতো বারবার নিজের কবিতা উল্টেপাল্টে পড়েন এবং শব্দরানি সাজাতে প্রয়াস চালান। কবি ফররুখ আহমদের হাতেলেখা পা-ুলিপি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। প্রতিটি পাতায় পাতায় এমন কাটাকাটি যে, অনেক ক্ষেত্রে পুরো কবিতা পুনঃলিখন হয়ে গেছে। এমনটি ঘটেছে কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কাব্যখাতায়। তিনি গোটা কবিতার পাতা জুড়ে ডালপালা তৈরী করেছেন নতুন শব্দ বসিয়ে। আমি রশিকতা করে বলতাম, মল্লিক ভাই, এগুলো কি বৃক্ষের পত্র-পল্লব? তিনি চিরায়ত ঢঙে হাসিমুখে বলতেন, ভালো করে খেয়াল করো, ফুল ফলও আছে। কবি মোশাররফ হোসেন খানও তার কোন ব্যতিক্রম করেননি। ‘ক্রীতদাসের চোখ’ এ ঠাঁই পাওয়া সেই ‘আরাধ্য কাফন’ কবিতাটি পড়ে আবারো মুগ্ধ হলাম। মনে পড়ে গেল কবিতাটির জন্মকথা। আবার একগাদা বই আর কাগজের ভীড় ঠেলে সমন্বয়ের সংখ্যাটি বের করলাম। মিলিয়ে দেখলাম। সত্যিই খানিকটা পরিবর্তন এসেছে কবিতার গায়ে। নতুন নতুন পোষাক উঠেছেÑ উপমার পোষাক। নতুন করে বেড়েছে দৈহিক অঙ্গ-প্রতঙ্গ, সৌন্দর্য-আলো। অযাচিত এবং আরোপিত সৌন্দর্যের পরিশীলন করে শারীরিক গঠনে পরিবর্তন হয়ে কী সুন্দর স্বাস্থ্যবতীও হয়ে উঠেছে কবিতাটি। সে এখন অনন্ত যৌবনা কবিতাসুন্দরী। এর নামই ভাঙা-গড়া, এর নামই কাটাছেঁড়া। বাগান পরিচর্যার মতোই মালির ভূমিকায় থাকেন বলেই এসব কবির কবিতা অনন্তযৌবনা থাকে, কড়া নাড়ে পাঠকের অন্তরাত্মায়, নোঙর করে ভালোবাসার সৌখিন মোহনায়।

কবিদের জীবন খুব বেশি গোছালো থাকে না। সংকট আর মেঘলা আকাশের বিজলিচমক লেগেই থাকে শারীরিক ছায়ার মতো। কবি মোশাররফ হোসেন খানের জীবনটাও এ থেকে মুক্ত নয়। খুব কাছে থেকে তাঁকে আবিষ্কারের সুযোগ ঘটেছে আমার। বিশেষকরে উনিশশো আটানব্বই-নিরানব্বই সালে একান্তই কাছে থেকে দেখেছি তাঁকে। পাশে থেকে অভিমানী মনে ফুলের চাষবাসে সহযাত্রী হিসেবে সময় কাটানোরও চেষ্টা করেছি। ঢাকা থেকে রাজশাহীতে ফিরলেও তখন থেকে আজ অবধি দূরত্ব কখনো দূরে ঠেলে দেয়নি। ভালোবাসার ঝিলে তাঁকে নিয়ে তুলে যাচ্ছি জীবনের শাপলা-শালুক, রঙিন স্বপ্নপদ্ম। বারবার অনুভব করেছি তাঁর জীবন নদীর বাঁকমোহনা। কতরঙে কতঢঙে বয়ে গেছে নানা ধরনের ঝড়ঝাপ্টা, উঠে এসেছে সোনালী স্বপ্নের ভোর। তবুও পরিস্থিতি সামলে নিয়ে তিনি আকণ্ঠ নিমগ্ন থাকেন সৃষ্টিশীলতার উর্বর ভূমিতে একজন নিরিবিলি চাষির মতো। সময়ের নিমগ্ন কবি হিসেবে তিনি নির্মাণ করে যাচ্ছেন সৃষ্টিশীলতার জীবনমুখী ক্যানভাস।

দীর্ঘকাল বলা না গেলেও জীবনের ছয়দশক মানে সাক্ষ্যসময়। নিজেকে প্রমাণ করা, পাঠকের মূল্যায়ন নীতির মাপকাঠি চালানো কিংবা কলমবন্দনার নিয়ামককালই বটে। কৈশোরের উড়নচ-ি মন, যৌবনের উচ্ছলতায় রঙিনঘুড়ির সুতোটানা, জীবন-সংসারের ঘানি টানতে টানতে নতুন প্রজন্মকে স্বপ্নউঠোনে এগিয়ে দেয়া, অতঃপর তৃতীয় প্রজন্মের কোমলতা স্পর্শের নয়াসন্ধিক্ষণ হৃদয়মনে ভীড় করে চঞ্চল অনুভূতি। কবি মোশাররফ হোসেন খানের জীবনে এ ধরনের মাইলফলকে পা রাখার সুযোগ হয়েছেই বলা যায়। তাইতো তাঁকে নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে পাঠকের। মতামতের দোলাচালে চলতে চলতে এখন বলাই যায় কোন অবস্থানে উড়ছে তার সৃষ্টিশীলতার বিমান। মঞ্জিলের কোন পর্যায়ে তিনি। 

কিন্তু কবির মঞ্জিল বলে কোন কথা আদৌ যুক্তিসঙ্গত কি? হ্যাঁ, কবির মঞ্জিল নির্ণয় তাঁর জীবদ্দশায় ভীষণ কঠিন। নানা ধরনের বৈরী বাতাসে উড়ে চলে তাঁর হাতের নিশান। সময়, কাল, পরিবেশ, পরিপ্রেক্ষিত সব কিছুই নাড়িয়ে চলে কবিকে। তাইতো তাঁকে নিয়ে ছয়দশকের জীবদ্দশাতেই খুব বেশি কথা বলা যায় না। তবে সকালের আবহাওয়া দিনের আভাস বলে দেয় কিছুটা হলেও। তাছাড়া কবিদের সৃষ্টিকর্ম যেহেতু বায়ুবীয় নয়, চোখের সম্মুখচিত্র। তাই কিছু কথা তো বলাই যায়। কেননা প্রতিনিয়ত তাঁর অবস্থান বর্ণনা করছে তাঁর সৃষ্টিকর্ম। কবি মোশাররফ হোসেন খানের অবস্থান জানাতে প্রথমেই নাড়া দিয়েছিল তাঁর কাব্যগ্রন্থ হৃদয় দিয়ে আগুন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থটি তাঁকে কবিতার মাঠে দাঁড় করিয়ে দেয় সাহসের সাথে। অতঃপর ‘নেচে ওঠা সমুদ্র, আরাধ্য অরণ্যে, বিরল বাতাসের টানে’ কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁকে ঝড়ের মাঝে শক্তমাঝির ভূমিকায় পরিচিত করে। তবে ১৯৯৫ সালে কবিতার মাঠে হৈচৈ ফেলে দেয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘পাথরে পারদ জ্বলে’। তরুণ প্রজন্ম তাঁর জন্য হৃদয়ে নির্মাণ করে ভালোবাসার সবুজ গালিচা। ‘ক্রীতদাসের চোখ’ ‘নতুনের কবিতা, ‘বৃষ্টি ছুঁয়েছে মনের মৃত্তিকা, ‘দাহন বেলায়, ‘কবিতাসমগ্র, ‘সবুজ পৃথিবীর কম্পন, পিতার পাঠশালা, স্বপ্নের সানুদেশ’ তাকে কাব্যভূবনে শক্তিশালী অবস্থানে অধিষ্ঠিত করে। গদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁকে খ্যাতির দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছে তাঁর ‘সাহসী মানুষের গল্প’। বিশেষকরে তরুণ প্রজন্মের সৎসাহসের বীজ বুনে দিতে এ গ্রন্থের পাঁচটি খ-ই নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। রহস্যের চাদর, অবাক সেনাপতি, দূর সাগরের ডাক, কিশোর কমান্ডার, ছড়ির তরবারি, কিশোর গল্প জীবন জাগার গল্প, সুবাসিত শীতল হাওয়া, আগুন নদীতে সাঁতার, অবাক করা আলোর পরশ, ছোটদের বিশ্বনবীসহ জীবনীগ্রন্থ ‘হাজী শরীয়তুল্লাহ, ‘সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর, ‘মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ‘মুনশী মোহাম্মদ মেহেরউল্লাহ, ‘তিন নকীব, তাঁকে শিশু-কিশোর সাহিত্যে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে তুলেছে। সেইসাথে ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য, গবেষণামূলক চিন্তার বিকাশে পরিচিত করেছে সাহিত্যের উঠোনে। কথাসাহিত্যের গল্পশাখাতেও তাঁকে হাঁটতে দেখা যায় স্বকীয় ঢঙে। গল্পগ্রন্থ ‘প্রচ্ছন্ন মানবী, ‘সময় ও সাম্পান, ডুবসাঁতার এবং কিশোর উপন্যাস ‘বিপ্লবের ঘোড়া, সাগর ভাঙার দিন, ঝিমায় যখন ঝিকরগাছা, কিশোর উপন্যাসসমগ্র, স্বপ্নের ঠিকানা এবং ‘বাঁকড়া বিলের বালি হাঁস’ তাঁকে কথাসাহিত্যের মাঠে চঞ্চলতার সাথে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সম্পাদনার মাঠেও তিনি একজন পরিচিত খ্যাতিমান রেফারি।

কবি মোশাররফ হোসেন খান এখনও প্রবাহবান নদী। লিখে যাচ্ছেন তিনি দু’হাতে। সাহিত্যের সকল শাখায় তার সরব বিচরণ পাঠককে আরো বেশি আশান্বিত করছে। ইতোমধ্যে যা পাওয়া গেছে হয়তো আরো ভালো কিছু বেরিয়ে আসবে তাঁর কলম থেকে। তাছাড়া সকল লেখাই সকল সমালোচকের কাছে পৌঁছাও সময়ের ব্যাপার। শুধু আশির দশকের অন্যতম কবিই নন, তিনি যে বাংলা সাহিত্যের একজন অনিবার্য কবি এ কথা দৃঢ়তার সাথে বলাই যায়। ইতোমধ্যে ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফারসি, হিন্দি, গুজরাটি, অহমিয়া, এবং রুশÑভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে তাঁর কবিতা-গল্প প্রকাশিত হচ্ছে। এটিও নিঃসন্দেহে শুভসকালেরই ইঙ্গিত বহন করে বৈকি। অচিরেই বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেও তাঁর অবস্থান নির্ণয়ের খবর আমরা পাবো- এ প্রত্যাশা করতেই পারি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ