বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

‘নজরুল’ এবং একটি অতুলনীয় কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’

শফি চাকলাদার : ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ১৩২৫ এর ০৯ আশ্বিন নজরুল রচনা করেন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। ৭৯ লাইনের কবিতা। বৃটিশ বিরোধী এই কবিতাটিতে নজরুলের ক্ষুব্ধ মনের প্রকাশ পাওয়া যায় জ্বালাময়ী শব্দের অন্তরালে। জ্বালাময়ী শব্দগুলোর আরো ক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করার লক্ষ্যে নজরুল হিন্দু-পুরাণ থেকে বেশ কিছু চরিত্র চয়ন করেছেন। অসাধারণ এই কবিতাটি পড়লে মনে হবে শুধু তলোয়ারই শক্তি-সাহস প্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে গণ্য নয়, বাংলা শব্দ যে কত শক্তিশালী এবং তরবারি থেকে উদ্ধৃত তা এই কবিতাটি এর প্রমাণ। কবিতাটি নিয়ে আলোচনায় যাবার পূর্বে নজরুল যে সকল চরিত্র চয়ন করেছেন তার উল্লেখ করছি-

* বিষ্ণু = নারায়ণ, কৃষ্ণ। নানা অবতারের রূপ ধরে অসংখ্য শত্রু ধ্বংস করেছেন।

* মহেশ্বর = মহাদেব। শিবের অন্য নাম

* অরবিন্দ = কমল-পদ্ম ফুল

* ব্রহ্মা = মহাপ্রলয়ের পর বিশ্ব যখন অন্ধকারে পতিত হয় তখন ব্রহ্মা নিজ শক্তি বলে অন্ধকার দূর করে পানি সৃষ্টি করলে সেই সৃষ্টির বীজ বপণ করা হয়।

* চিত্তরঞ্জন = চিত্রগুপ্ত (?) ব্রহ্মার অঙ্গ হতে জন্ম

* ধ্রুব = দিক নির্ণয়ী নক্ষত্র বিশেস

* সুরেন্দ = দেবতা ঈন্দ্র দেবরাজ

* ভীম = পা-বের ২য় পুত্র

* রবি = রবীন্দ্রনাথ

* বরুণ = জলের দেবতা

* লক্ষ্মী = মকবেদে শ্রী এবং ঈশ্বর্যের দেবী

* সরস্বতী = জ্যোতির্ময়ী দেবী

* গণেশ = দেবতা

* জামাইঠাকুর = কার্তিকেয়

* শিব = মহাদেবের অন্য নাম

* গঙ্গামাসি = উমা’র বোন

* পাগলি বেটি, ম্যয় ভুখা হুঁ = দেবী কালী

* ছিন্নমন্ডা = ইনি বাঁ হাতে নিজ মাথা ধরে লোল জিহ্বা দ্বারা নিজ কণ্ঠ থেকে রক্ত পান করেন

* কালী = দেবী

* জয় আকালী = শিখ সম্প্রদায়

* মৃন্বয়ী = মাটির তৈরি

* মহিষাসুর = অসুর বিশেষ

* ত্রেতা যুগ = দ্বিতীয় যুগ। ১২, ৯৬,০০০ বছরের সমান

* রাম = সূর্যবংশীয় অযোধ্যার রাজা

* রুদ্রানী = দেবীর রুদ্ররূপ

* সিরাজ = নবাব সিরাজদ্দৌলা

* টিপু = টিপু সুলতান

* মীর কাসিম

* চ-ী = দেবী দুর্গার মূর্তি

* যোগমায়া = যশোদার গর্ভজাত কন্যা। কংস তাঁকে দেবকীর ৮ম সন্তান মনে করে মেরে ফেলার জন্য তৈরি হন। যোগমায়া আকাশে উঠে বিশিষ্ট রূপ ধারণ করে, কংসকে বলে গেলে, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িয়েছে সে’।

* কাশ্মি রাণি = লক্ষ্মীরাষ্ট্র। বৃটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।

* মা ভবানী = দুর্গার অপর নাম

* দশভূজা, দুর্গা

* কৈলাশ = পর্বত। মানস সরোবরের উত্তরে।

* আগমনী = গিরিরাজ হিমালয় ও তার স্ত্রী মেনকা’র কন্যা উমা বা পরবর্তী বিয়ের পর শিবের গৃহে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনতে যে গান রচিত হয়। দুর্গাপূজাকে ঘিরে এই আগমনী গান গীত হয়।

* কমন্ড লু = সাধু-সন্নাসদের জলপাত্র।

* দলুজ = দানব

* উমা আনন্দময়ী = মহাদেবের স্ত্রী। উ (হে পার্বতী) মা (না) তপস্যা করো না = উমা।

* অসুর = যারা দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হতো তারাই মানুষ বেশে বিশ্বে জন্ম নিয়ে নানান বিপদ সৃষ্টি করত তাদেরকেই গ্রামচ্যুত বলা হয়।

‘ম্যয় ভূখা হুঁ- * পাগলি বেটি * খ্যাপা মেয়ে, * পাষাণ বাপ * পাষাণ মেয়ে * রাক্ষসী * গিরি রাণী * মা দুলালী ইত্যাদি দেব-দেবীদের অন্য-নামে পরিচিতি এই কবিতায়। 

‘এই আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটিতে ৩৮টি চরিত্র-উপমা তৈরি করেছেন কবি। এছাড়া ‘বিশেষণ’ এনে চরিত্র পাওয়া যায় পাগলি বেটি, ম্যয় ভুখাই হুুঁ, পাষাণ-বাপ, পাষাণ মেয়ে, রাক্ষসী, ঘোমটা-পরা কলা বৌ, গিরি রাণীর মা দুলালী কন্যা ইত্যাদি। অর্থাৎ সেই পুরাণ ইতিহাসের দেব-দেবীদের মধ্যে কী ধরনের অত্যাচার, ফন্দি, ভয়-ভীতি, করায়ত্তকরণ, কেউ বা মগ্ন যোগাসনে, চক্রান্ত ইত্যাদিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে বৃটিশ আমলের কুকীর্তির কারণ এবং ধরণগুলোকে তুলে এনেছেন। তাদের কীর্তিসমূহ যেগুলোকে কুকীর্তিই বলা যাবে সেগুলোতে কবি ক্ষুব্ধ হয়ে এই কবিতাটি রচনা করেন। এমন কবিতা বাংলা সাহিত্যে আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এতসব চরিত্র এবং তাদের কার্য-অনুযায়ী বর্ণনা করার মত এক অসম্ভব বর্ণনাকে সুকৌমলে উপস্থাপন করে পরিবেশন নজরুল দ্বারাই সম্ভব হয়েভে। এই সম্ভবটা হয়েছে নজরুল পরাধীন’ শব্দটিকে পছন্দ করতেন না, পছন্দ করতেন না তাদের যারা এই ‘পরাধীন’ শব্দকে জনগণের উপর চাপিয়ে দিতে বৃটিশদের তোষামোদী করতেন। 

কবিতাটির প্রায় শেষ প্রান্তে এসে নজরুল ক্ষুব্ধ মনের ভাব প্রকাশ করলেন দু’টি লাইনে-

বৃথাই গোল সিরাজ, টিপু, মীর কাসিমের প্রাণ-বলিদান

চ-ি! নিলি যোগমায়া-রূপ, বলল সবাই বিধির বিধান।

এ শুধু নজরুলের আক্ষেপ নয় এতো সকলেরই আক্ষেপ। এটা সকলেরই জানা যে, কোন একটি ভালো কাজ করার চেষ্টা হলে তার উপক্রম থেকে শুরু হয়ে যায় একটা বিরুদ্ধবাদী চক্রের কাজ। কখনো গোপনে কখনো সরবে। যে তিনটি শ্রদ্ধেয় নাম নজরুল এখানে উচ্চারণ করলেন তাদের পতনের কারণগুলো কে না জানে। বৃটিশরা তো তখন ভারতবর্ষে একেবারে নিñিদ্র খাঁটি বেঁধে শাসনকার্য চালাচ্ছেন, নজরুল যখন ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ রচনা করলেন সেই ১৯২২-এর ২৬ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ৯ই আশ্বিন ১৩২৯ সনে। এই সাথে উল্লেখ করতে চাই, নজরুল ‘বিদ্রোহী’ রচনা করেন ১৯২১ এর ২৫ ডিসেম্বর থেকে ১৯২২ এর ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২৯৩টি দিন নজরুল ভারবর্ষের স্বাধীনতার জন্য যে নিঃস্বার্থ কাজ করে গেছেন তা মহাকাল অবদি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এরপরে জেল-জুলুমের কথা তো আছেই। এই সময়তে নজরুল ছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আদায়ের জন্য ব্যস্ত। অপর একটি কবি-সাহিত্যিকের দল নজরুলের এই কলমকে নীরব করে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নজরুল তাদের শনাক্তও করেছেন। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার ২১ থেকে ২৪ লাইনে এভাবে তা তুলে ধরেন-

রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে,

 সে কর শুধু পশল না মা অন্ধ কারার বন্ধ ঘরে।

গগন-পথে রবি-রথের সাত সারথি হাঁকায় ঘোড়া,

মর্তে দানব মানব-পিঠে সওয়ার হয়ে মারছে কোঁড়া।

 এই ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ এবং ‘ধূমকেতুর পথ’ অনুবাদ করে কারা নজরুলের এই স্বাধীনতা স্পৃহাকে পিষ্ট করতে চেয়েছিল? রবি-রথের সাত সারথি কারা কারা ছিলেন। লাইনটির মধ্যে একটি নাম তো নজরুল উল্লেখই করেন, বাকিরা কারা? একদিকে আশীর্বাদ পাঠালেন ‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু’ আয় অন্যদিকে সাতজন সারথি নিয়ে বৃটিশদের প্রিয়ভাজন হতে বৃটিশদের বুঝাতে লেগেছিল, নজরুল  তোমাদের এদেশ থেকে পাততাড়ি গুটাতে উঠে-পড়ে লেগেছে। কেন এই স্বাধীনচেতা মানুষটির স্বাধীন-মনকে কলুষিতকরণ। নিজেরা তো স্বাধীন হতেই চাননি কখনো, নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে কারো বা জমিদারি কারো বা নানান সুবিধেগুলো না হাতছাড়া হয়ে যায়। এই কবিতাটিতেই নজরুল তাদের জন্য পরিচিতি-প্রকাশ খুলে দিলেন-

পুরুষ ছেলে দেশের নামে চুগলি খেলে ভরায় উদর,

টিকটিকি হয়, বিষ্ঠা কি নাই-ছি ছি এদের খাদ্য ক্ষুধার।

আজ দানবের রঙমহলে তেঁত্রিশ কোটি খোজা গোলাম

লাথি খায় আর চ্যাঁচায় শুধু ‘দোহাই হুজুর, মলাম মলাম।

এসব প্রকাশ করতেই নজরুল হিন্দু-পুরাণ থেকে এত এত চরিত্র সাহায্য নিয়েছেন। নজরুল ‘সাত-সারথি’ বিষয়টিতে এতটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন যে ‘ফরিয়াদ’ কবিতার ৮ম স্তবকেও এমনতর পাওয়া যায়-

অন্যায় রণে যারা যত দড় তারা তত বড় জাতি,

সাত-মহারথী শিশুরে বধিয়া ফুলায় বেহায়া ছাতি।

তোমার চক্র রুধিয়াছে আজ

বেনের রৌপ্য-চাকায়, কি লাজ।

এত আচার সয়ে যাও তুমি, তুমি মহামহীয়ান।

পীড়িত মানব পারে নাকো আর, সবে না এ অপমান।

ভগবান! ভগবান!

 

নজরুল এদেশের ‘স্বাধীনতা’ আন্দোলনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নিজেদের বৈশিষ্ট্যকে সংশোধন করার লক্ষ্যে সঙ্গীত, কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস যেখানেই পেরেছেন স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। দু’মুখো নীতি কখনোই নয়। সাহস সঞ্চর করতে নজরুল সকল সময় সজাগ ছিলেন। এই আনন্দময়ীর আগমনে’র ৪৩ থেকে ৪৬ লাইনে নজরুল কথা সাজানÑ

মাদিগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি নাকি,

খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি!

জান তরবার, আস মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,

মাদি গুলোয় কর মা পুরুষ, রক্তদে মা রক্ত দেখা।

এই অহিংসা-বোল, নাকি নাকি, ‘মাদিগুলোয় কর মা পুরুষ’ দেশবাসীকে লক্ষ্য করেই এমন শব্দ উচ্চারণ করেছেন। দেশবাসীকে লজ্জা দিতে নয় দেশবাসীকে সজাগ করতে উদ্বুদ্ধ করতে। দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে বিশ্বখ্যাত ‘আলী ভ্রাতৃদ্বয়’ এর মোহাম্মদ আলী জওহর তাঁর বক্তৃতা শুরু করতে প্রায় বলতেনÑ ‘মেরে পেয়ারে দাড়িওয়ালে বহিনো’। নজরুল তার “অশ্বিনীকুমার’ কবিতায় রচেনÑ

এক ঘর ছাড়ি আর ঘরে যেতে নারি

মর্দজাতি হয়ে আছে পর্দা-ঘেরা নারী।

৭৯ লাইনের কবিতার মাধ্যমে নজরুল আবারও প্রমাণ করেন যে তাঁর মতো দেশ-প্রিয়, স্বাধীনচেতা মানুষ দ্বিতীয়টি নেই। তাঁর জ্ঞানের পরিধি কত বিস্তৃত তারও প্রমাণ আরো একবার রাখলেন। নজরুলের পূর্বে সিপাহী বিপ্লবের সময় অর্থাৎ সেই ১৮৫৭ সালের কথা। পশ্চিম বাংলার বারাকপুরে সিপাহীরা প্রথম বিদ্রোহ করে সশস্ত্র। তারই রেশ ধরে ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর বৃটিশ সেনাদলের ৩৪নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার মোহাম্মদ রজব আলীর নেতৃত্বে চাটগাঁ শহরের প্যারেড ময়দান যে দাবানল জ্বলে উঠেছিল, সংগ্রামের যে অবিস্মরণীয় কাফেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল তা থেমে থাকেনি। প্রসিদ্ধ লেখক সত্যেন সেন-এর ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’ গ্রন্থে এবং ইংরেজ ঐতিহাসিক মিখাইল এডওয়ার্ড তার ‘ব্যাটল অব দি ইন্ডিয়ান’ গ্রনেথ এই সংগ্রামী ইতিহাসের বর্ণনা রয়েছে। অভিযানের এক পর্যায়ে এই বীর সৈনিক, বিপ্লব অভ্যুত্থানের নেতা হাবিলদার রজব আলী শাহাদ’ বরণ করেন।

হাবিলদার রজব আলীর মতো অপর অসম সাহসী বিপ্লবী শের আলী। ১৮৫৭ সালের মহা বিপ্লবের এই বীর শহীদের কথাও মনে হয় যেন আমরা ভুলে গেছি। শহীদ রজব আলী এবং শহীদ শের আলীর কথা ভুলে যাওয়াটা নিতান্ত দুখের বৈকি। শের আলী সম্পর্কে সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ রচিত ‘আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল (১ম খ-)’ থেকে উদ্ধৃত করছিÑ

“১৮৫৭-র মহাবিপ্লবের পর হতে মুসলমানদের দমনের নামে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা, লুণ্ঠন, জরিমানা, জমি-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল বড়লাট মেয়ো। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে বীর শের আলী তাকে হত্যার হুমকি দিলে বিচারে তাঁকে ১৪ বছর আন্দামান দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হয়। ঘটনাক্রমে ভারতের বড়লাট মেয়ো আন্দামনে পরিদর্শন কালে ১৮৭২ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি জোন্স টাউন জেটির কাছে শের আলীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন। অন্ডিম বিবৃতিতে শের আলী বলেন, ‘নিজের জীবন দিয়া যদি আর দশজনের অত্যাচারের মাত্রা কিচু কমাতে পারি, যদি তাদের সকলের দুঃসহ দুঃখের বোঝা সামান্যও হালকা করতে পারি, তবেই আমার এই মৃত্যুবরণ গৌরবের হবে। এই কথা মনে করে আমি স্বেচ্ছায় এই কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। যা করেছি তার জন্য আমি বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নই এবং উপযুক্ত পাঠান সন্তানের মতো মৃত্যুর সম্মুখীন হইতে পারছি বলে আপনাকে ভাগ্যবান মনে করেছি।”

হঠাৎ করেই এই ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নিয়ে লেখার ইচ্ছে হল তা নয় এই কবিতাটি নিয়ে উৎসুক্য জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যেই এমন আগ্রহ। ৭৯টি লাইনের মধ্যে এত এত মাইথলজিক্যল উপমায়ুক্ত কবিতা বাংলা সাহিত্যে আর একটি রয়েছে সেটি বিদ্রোহী’। নজরুলের প্রায় কবিতা-কাব্য গল্প উপন্যাস সঙ্গীতে ইসলামের ইতহাসের নানান চরিত্রের উপমা-উদাহরণ যেমমন রয়েছে তেমনি হিন্দু গ্রীক মাইথলজি থেকে উপমা রয়েছে। অতীতকে হাতের কাছে নিয়ে আসার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল নজরুলের। এই কবিতাটিতে সেই সময় স্বাধীনতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করণে স্পষ্ট ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। লানত, গলিজ, চুগলি, বিষ্টা, খোঁজাসহ নানান শব্দ যুক্ত করে নজরুল তার ক্ষুব্ধ মনের তীব্র জ্বালা প্রকাশ করেছেন। যারা বৃটিশের লেজুড় বৃত্তি করছে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ এবং মূলত পরাধীনতার অবসান-লক্ষ্যে জাতিকে ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ অনুপ্রাণীত করা এই কবিতার মূল লক্ষ্য। নজরুলই প্রথম কবি-ব্যক্তিত্ব যিনি ভারতবর্ষের পূর্ণ-স্বাধীনতার দাবি করেন। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬ আভিশ্বন ইংরেজি ১৩ অক্টোবর ১৯২২ ‘ধূমকেতু’র পথ’ নিবন্ধে নজরুল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রথম উচ্চারণ করলেন স্বাধীনতার কথা এইভাবেÑ

“সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।

স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোনো বিদেশীর মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লি করে দেশকে কমশান ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, কোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তারা শুনবেন না। তাদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদেরো এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।”

অপরদিকে মাওলানা হযরত মোহানী ১৯২১ সালে কংগ্রেসের আহমেদাবাদে অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উপস্থিত করেন। স্বাধী এই প্রস্তাবের বিরোধীতা করে বলেছিলেনÑ “দি ডিমেন্ড হ্যাজ গ্রিঙড মি বিকজ ইট সোজ ল্যাক অব রেসপনসিটিলিটি।” অর্থাৎ এই থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে কংগ্রেস-এর ভিতর প্রথম স্বাধীনতার দাবি তোলেন মাওলানা হযরত মোহানী এর জন্য তার জেল হয়েছিল সশ্রম কারাদন্ড এবং আহমেদাবাদ কংগ্রেস ভবনের সামনে তাকে দিয়েপথ ঝাড়–দেয়ার কাজও করিতেছিল শাসকবর্গ। অপরদিকে নজরুলকেও কারাবরণ করতে হয়েছিল এক বছর-সশ্রম কারাদ-।

সর্বদিকে সর্ববিষয়ে গুণান্বিত নজরুলকে আমরা স্মরণ করব। অনন্তকাল। নিঃশ্বার্থ এি ব্যক্তি সারা জীবন কষ্ট করেছেন। এই কষ্টের মধ্যেও তিনি দেশবাসীকে শান্তি দিয়েছেন শান্তি পথ দেখিয়েছেন। গানে সুরে স্বাধীনতার কথায় জাগ্রত করতে, উজ্জীবিত করতে নজরুল নানানভাবে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন এবং করেছেনও। তারই শেখানো দেখানো পথে মানুষেরা অনুপ্রাণীত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। নজরুলের এই গানটি প্রমাণ করে কতভাবেই না নজরুল জনতাকে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছেনÑ

সাত ভাই চম্মা জাগো রে, ঐ পারুল তোদের ডাকে।

ভাই আর কত ঘুমাবি সবুজ পাতা-ঘেরা শাখে ॥

কি যাদু করলি তোদের বিদেশি সৎ-মায়ে,

রাজার দুলাল ঘুমিয়ে আছিস আঁদার কারনন-ছায়ে,

নিজেরা না জাগলে কবে মুক্ত করবি মাকে ॥

তোদের বোন এনেছে জিয়ন-কাটি প্রাণের পরশ-মনি,

মায়া-নিদ্রা ভোলাতে ঐ গায় সে জাগরণী।

গুবরে পোকায় মৌ খেয়ে যায় তোদের ঐ মৌচাকে ॥

তোদের চাঁপা রঙে চাপ আছে অরুণ-কিরণ রেখা;

তোরা জাগবি রে যেই, অসনি পাবি দিনমনির দেখা,

বোনের সাথে ভাই জাগিয়ে ভয় করি আর কাকে॥

গানটি ১৩৪০ বঙ্গাব্দ এবং ১৯৩৩ খৃস্টাব্দে রচিত। স্বাধীনতার কথা-দাবি করা প্রবন্ধ ১৯২২/১৩২৯ এ এবং এর এগারো বছর পর রচিত গান থেকে এটা অনুমান করা সহজ যে নজরুলের রক্তে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি সকল সময়ে প্রবাহিত ছিল। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ