শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ইংলিশ কাউন্টি মাতিয়ে চলেছেন পাকিস্তানী তারকা আমির

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : গুঞ্জন আর বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না পাকিস্তান ক্রিকেটারদের। অনেকের মতে পাকিস্তান ক্রিকেট আর বিতর্ক যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তবে অভিযোগের অনেকগুলোই সত্যে রূপ নেয়। এবার গুঞ্জন উঠেছে দেশটির প্রতিভাবান ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ আমিরকে নিয়ে। যদিও স্পট ফিক্সিংয়ের কারণে বেশ কিছুদিন ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয়েছে। নিজের ভুল বুঝতে পারা এবং বয়স বিচেনায় আবারো সুযোগ পায় দেশের হয়ে খেলায়। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে মাঠে ফিরেই নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন তিনি। সর্বশেষ দেশের হয়ে চ্যাম্পিয়ন ট্রফির ফাইনালে ভারতকে বিশাল ব্যবধানে হারানোর পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া কাউন্টি ক্রিকেটেও নিজের দ্রুতি ছড়িয়ে চলেছেন এই প্রতিভাবান ক্রিকেটার। তবে সমালোচকরা বসে নেই। এবার তাকে নিয়ে প্রচার করা হচ্ছে, আমির নাকি টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরে যাচ্ছেন।
টেস্টে অবসর নিয়ে ওঠা গুঞ্জনকে স্রেফ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মোহাম্মদ আমির। ‘আমার কোন ধারণা নেই এ রকম হাস্যকর একটি গল্পের পেছনে কার হাত রয়েছে। আমি এখনও ফিট, সামর্থ্যবান আছি। কোন ফরমেট থেকে অবসর নেয়ার চিন্তা আমার নেই। আমি যতদিন ফিট আছি ততদিন তিন ফরমেটেই খেলা চালিয়ে যাব।’ ইংল্যান্ডে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমকে বলেন আমির। পাকিস্তানী তারকা পেসার টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিচ্ছেন। সীমিত পরিসরে বেশি মনোযোগ দিতেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন- বেশ কিছুদিন ধরেই এমন সংবাদ প্রকাশ পেয়েছিল ইংলিশ কিছু গণমাধ্যমে। কাউন্টি খেলতে আমির এখন ইংল্যান্ডে অবস্থান করছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে গুঞ্জন চলছিল। অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল হয়তো সাদা পোশাকের ক্রিকেট ছাড়ছেন আলোচিত এ বাঁহাতি পেসার। অবশেষে দীর্ঘদিন পর মুখ খুললেন আমির। শঙ্কা দূর করে জানিয়ে দিলেন ক্রিকেটের তিন ফরমেটেই চালিয়ে যাবেন।
পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরেন আমির। এরপর থেকে দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন ধারাবাহিকভাবে। এ সময়ে ১৪ টেস্টে ৪৩ উইকেট নিয়েছেন বাঁহাতি এ পেসার। পাশাপাশি পাকিস্তানকে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠতেও সাহায্য করেন। ওয়ানডেতেও তার সাফল্য ঈর্ষণীয়। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে অসাধারণ বোলিং করে দলকে প্রথমবারের মতো ট্রফি জয়ের স্বাদ দেন। তাহলে হঠাৎই তার টেস্ট ছাড়া নিয়ে গুঞ্জন কেন? সেটিরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন আমির। বলেছেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আমি বলেছিলাম, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরমেটে ভাল করতে হলে আপনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক বেশি ফিট থাকতে হবে। সেটিকেই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।’
ইংল্যান্ড দেশটা মোহাম্মদ আমিরের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। ২০১০ সালে লর্ডস টেস্টে স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। সেখানে জেলও খাটতে হয়েছিল। গত বছর সাদা পোশাকে ফিরেছেন সেই লর্ডস দিয়ে। সদ্য চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে প্রায় একাই ভারতকে উড়িয়ে দিয়ে দেশকে প্রথমবারের মতো শিরোপা উপহার দিয়েছেন। কলঙ্কের সেই দেশেই কলঙ্কমোচন। বিভীষিকার ইংল্যান্ড যেন সব ভুলিয়ে দিতে চাইছে। দারুণ নৈপুণ্যে এবার ইংলিশ কাউন্টি মাতিয়ে চলেছেন নন্দিত-নিন্দিত এই পাকিস্তানী তারকা। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলছেন এসেক্সের হয়ে। অসাধারণ বোলিং করে ভুগিয়েছেন ইয়র্কশায়ারকে। ১১.২ ওভারে মাত্র ১৮ রান দিয়ে নিয়েছেন ৫ উইকেট। আমির আগুনে প্রতিপক্ষ ইয়র্কশায়ার গুটিয়ে গেছে ১১৩ রানে। মাঝে ফ্রেন্ডসলাইফ টি২০তে প্রায় প্রতি ম্যাচেই উইকেট পেয়েছেন। ইংল্যান্ডের মাটিতে যে এভাবে বিধ্বংসী বোলিংয়ের সুযোগ পাবেন তা হয়তো ২০১০ সালে ভাবতেও পারেননি আমির। তৎকালীন অধিনায়ক সালমান বাট ও মোহাম্মদ আসিফের সঙ্গে তিনিও জড়িয়েছিলেন বহুল আলোচিত সেই স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে। ইচ্ছাকৃতভাবে করেছিলেন ‘নো’ বল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ ছিলেন পাঁচ বছর। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে গত বছরের জানুয়ারিতে অবশ্য আবার প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে পেরেছেন। এখন পাকিস্তানের হয়ে খেলছেন তিন ফরমেটেই। জুনে পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শিরোপা জয়ের পেছনেও অন্যতম ভূমিকা আমিরের। ২০১৬ সালে আবারও পাকিস্তান দলের হয়ে আমির এসেছিলেন ইংল্যান্ড সফরে। সে সময়ও তাকে বেশ সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক এলিস্টার কুক বলেছিলেন, আমিরের মতো স্পট ফিক্সারদের আজীবন নিষিদ্ধ করা উচিত। সেই কুকই এখন এসেক্স সতীর্থ। আমির বলেন, ‘ইংল্যান্ডে সময়টা দারুণ কাটছে। কুক বেশ সাহায্য করছে। আমাদের লক্ষ্য একটাই দলকে জেতানো, দলের জন্য পারফর্ম করা।
আলোচনা-সমালোচনার জবাব যেন দিয়েই যাচ্ছেন আমির। গত ১৪ আগস্ট আমিরের মুকুটে আরেকটি পালক যোগ হলো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন মোহাম্মদ আমির। তার অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জিতেছিল পাকিস্তান। ফাইনালের সেই আগুনে বোলিংয়ের জন্য ক্রিকেট দুনিয়ায় প্রশংসায় ভাসেন আমির। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন আমির। ন্যাটওয়েস্ট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। তার বোলিং ফিগার ২-১৮, ২-২৫, ৫-১৮ ও ৫-৫৪। সত্যিই অসাধারণ! দুর্দান্ত বোলিংয়ের স্বীকৃতি পেলেন আমির। ন্যাটওয়েস্ট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে আগস্ট মাসের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন পাকিস্তানি এই পেসার। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া লিগে তিনি খেলছেন এসেক্সের হয়ে। ভক্তদের সমর্থন পেয়ে রোমাঞ্চিত আমির। টুইটার পেজে আমির লিখেছেন, ‘শুকুর আলহামদুলিল্লাহ! সপ্তাহ ও মাসের খেলোয়াড় নির্বাচিত হলাম। আমাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ভালো খেলতে ভক্তদের সাপোর্ট দরকার।’
এদিকে দেশটির ক্রিকেটারদের ঘিরে ফিক্সিং এখন আর বিস্ময় জাগায় না। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই তাই ফের নেতিবাচক খবর। ফিক্সিং সন্দেহে দুই তারকা উমর আকমল ও মোহাম্মদ সামি। একজন বুকির স্বীকারোক্তিতে দু’জনের নাম উঠে আসায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) এ বিষয়ে নতুন তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির (এনসিএ) কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন মোহাম্মদ ইউসুফ নামে এক বাজিকর। তাতেই বেশ কয়েকবার উঠে এসেছে পাকিস্তান দলের এই দুই ক্রিকেটারের নাম। ‘ওদের নাম স্বীকারোক্তিতে পাওয়া গেছে এবং এনসিএ’র কর্মকর্তারা বলেছেন, মোহাম্মদ ইউসুফ বেশ কয়েকবার তাদের নাম বলেছে।’ জানিয়েছে স্থানীয় শক্তিশালী এক সংবাদ মাধ্যম। তবে পিসিবি এ নিয়ে কোন নোটিস পাঠাতে পারেনি। বোর্ডের দুর্নীতিবিরোধী নীতিমালা ভাঙ্গার কোন প্রমাণ না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। দু’জন ক্রিকেটারই সম্প্রতি পাকিস্তান দলে জায়গা হারিয়েছেন। তবে আগামী নবেম্বরে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে (বিপিএল) খেলার কথা তাদের। বাংলাদেশের এই টি২০ লীগে দু’জনের আচরণের ওপর তাই কড়া নজর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিসিবি।
পাকিস্তান সুপার লীগে (পিএসএল) স্পট ফিক্সিংয়ের কারণে এ বছরের শুরুতেই শারজিল খান ও খালিদ লতিফকে দুবাই থেকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। একই টুর্নামেন্টে বাজিকরদের প্রস্তাব পেয়েও সেটি বোর্ডকে না জানানোয় ১২ মাসের নিষেধাজ্ঞা জুটেছে দীর্ঘদেহী পেসার মোহাম্মদ ইরফানের। তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই আগে থেকেই পিসিবির এই নজরদারি। বিপিএলে যে প্রায় প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই খেলতে আসেন পাকিস্তানী ক্রিকেটাররা। ২৭ বছর বয়সী আকমল ২০০৯ থেকে পাকিস্তানের হয়ে ১৬ টেস্ট, ১১৬ ওয়ানডে ও ৮২টি ম্যাচ খেলেছেন। এক সময় তাকে ছাড়া দল কল্পনাই করা যেত না। আচরণগত সমস্যায় বারবার ছিটকে গেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ