শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বেহাল মাঠেই পেশাদার ফুটবল

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : ২০০৬ সালে অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় পেশাদার ফুটবলে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। তারপর থেকেই একে একে পিছিয়ে পড়ছে লাল সবুজ দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। পেশাদারী যুগে প্রবেশ করলেও এখনো খুব বেশি পেশাদার হতে পারেনি এদেশের ফুটবল। ক্লাব, ফুটবলার থেকে শুরু করে সংগঠকরাও সেই আগের মতো করে কথা বলছেন, কাজ করছেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু ষ্টেডিয়ামের কাদাঁযুক্ত মাঠেই চালানো হচ্ছে খেলা। জোর করে এই ম্যাচ চালাতে গিয়ে পুরো মাঠ হয়ে গেছে কাদা। বৃষ্টির দিনে গরুর হাটের যে অবস্থা এমনটাই হয়। ৩ আগস্ট বিজেএমসি-শেখ জামাল ম্যাচের পর এই মাঠের অবস্থা হয়েছে আরো খারাপ হয়ে যায়। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে চট্টগ্রাম আবাহনী না খেলার মনোভাব দেখিয়েও পারেনি। রেফারি-ম্যাচ কমিশনারের চোখে নাকি মাঠ অনুপযোগী ছিল না।
অথচ তার আগেই গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বাবুল মাঠের অনুপযুক্ততার কথা জানিয়েছিলেন বাফুফেকে, ‘বৃষ্টিতে দু-দিন খেলা চালিয়ে মাঠটা শেষ করে দেওয়া হয়েছে। মাঠ যে খেলার অনুপযোগী তা চিঠি দিয়ে বাফুফেকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা খেলা বন্ধ রাখেনি।’ ফুটবল মাঠ ধানক্ষেতে রূপ নিয়েছে, এর পরও মাঠ খেলার অনুপযোগী নয়! রেফারি-বুকে হয়তো তাই নিয়ম। কিন্তু এ দেশের ফুটবল বাস্তবতা ভিন্ন। আপনার আছে সবেধন নীলমণি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, বৃষ্টি-কাদায় এই মাঠে একটি ম্যাচ চালিয়ে আবার ঠিকঠাক করারও তো সুযোগ নেই। টানা ম্যাচগুলোও তো এখানে হবে।
বাফুফে এসবের তোয়াক্কা না করায় পুরো দ্বিতীয় রাউন্ডে ‘কাদা-বলের’ খেলা হয়েছে। রহমতগঞ্জের কোচ কামাল বাবু বলেছেন, ‘মাঠ ফুটবল খেলার অবস্থায় ছিল না। এমন মাঠে খেলতে হলে নিউজিল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকার রাগবি খেলোয়াড়দের নিয়ে আসা উচিত। আমি খুব আশ্চর্য হয়েছি বাফুফের ভূমিকায়। সংবাদমাধ্যমে মাঠের দুরবস্থা নিয়ে এত রিপোর্ট হওয়ার পরও তারা পাত্তা দেয়নি।’ কেউ কেউ অবশ্য পুরনো দিনের ফুটবলকে টেনে এনে এ রকম কাদা-মাঠের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মেলাতে দিচ্ছেন না শেখ রাসেল কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক, ‘এ রকম মাঠে আমরা আগেও খেলেছি। কিন্তু এখনকার প্রেক্ষাপট পেশাদার ফুটবলের, এর সঙ্গে এ রকম খেলার মাঠ কোনোভাবেই যায় না। এ রকম মাঠে খেলা হওয়া অসম্ভব। পেশাদার ফুটবল তো এক মাঠে চলে না, আরো মাঠ থাকলে এই একটা মাঠের ওপর অত চাপ পড়ত না। এমনিতে বেশ কয়েকবার লিগ পিছিয়েছে, বৃষ্টির সময়ের দু-তিন দিন খেলা বন্ধ রাখলে কী ক্ষতি হতো?’ এর নাম পেশাদার লিগ হলেও পেছানো হয়েছে কয়েক দফা। সর্বশেষ এএফসি অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবলের বাছাইয়ের প্রস্তুতির জন্য দেড় মাস পিছিয়ে দিয়েছিল প্রিমিয়ার লিগ। তাহলে খেলা এবং মাঠ নষ্ট করা বৃষ্টির জন্য কেন পেছাতে পারবে না? বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের জবাব, ‘ক্লাবগুলোর দাবি এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলের প্রস্তুতির জন্য লিগটা এমনিতে দুই মাস পিছিয়ে গেছে। নইলে এত দিনে লিগ মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছে যেত। সামনের মৌসুম নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, বৃষ্টির সময়টাকে বাইরে রেখেই মৌসুম সাজাতে হবে।’ স্পষ্ট জবাবটা পাওয়া না গেলেও পরোক্ষে বলে দিয়েছেন, নানা কারণে অনেক দেরি হয়েছে বলেই লিগ কমিটি ঢাকা ভাসিয়ে দেওয়া বৃষ্টিকেও আর আমলে নেয়নি। তবে শফিকুল ইসলাম মানিক একতরফা দোষ চাপাতে চান না বাফুফের ঘাড়ে, ‘প্রথম দায় বাফুফের লিগ কমিটির হলেও ক্লাবগুলো দায় এড়াতে পারে না।
ক্লাবের প্রতিনিধিরা লিগ কমিটির সভায় গিয়ে বর্ষার সময়টা বাদ দিতে বললে বাফুফেও পারে না অসময়ে লিগ শুরু করতে। ক্লাবগুলো অনেক টাকা দিয়ে দল গড়ে, বিদেশি কোচ আনে। সুতরাং ফুটবলের উপযোগী সময়টার কথা ক্লাবগুলোকেই আগে চিন্তা করতে হবে।’ কিন্তু ক্লাব প্রতিনিধিদের অত ভাবার সময় কই। ঠিক ঢাকা শহরের মতোই। বৃষ্টির পানিতে ভাসছে শহর। মানুষের সাময়িক কষ্ট হয়, সমালোচনা হয় চারদিকে। তারপর ঠিক মানিয়ে নেয়। ক্লাবগুলোও যেন আস্তে আস্তে মানিয়ে নিচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু ফুটবলের সঙ্গে! এটাকে ফুটবলের প্রতীকি রুপ ধরলেও বেশি বাড়াবাড়ি কিছু হবে না।
ফুটবল এখন শুধুই ঢাকার
বিগত কয়েখ বছরের মধ্যে এবার দেশে বৃষ্টির পরিমান ছিল অনেক বেশি। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে। বৃষ্টিতে মাঠে থিকথিকে কাদা। ফুটবলারদের জার্সি নম্বর পর্যন্ত দেখা যায় না। মনে হয় তাঁরা ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন! বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে এই দৃশ্য দেখা গেছে। সূচি ঠিক রাখার তাগিদে কাদামাঠে অনেকটা জোর করেই ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছে। আর এভাবে খেলা চালিয়ে মাঠের জন্য প্রতিদিন হা-হুতাশ করতে থাকেন বাফুফের মাঠ কমিটির প্রধান ফজলুর রহমান বাবুল। বিকল্প মাঠ খোঁজার তাগিদ দেন তিনি, কিন্তু সবই মনে হয় অরণ্যে রোদন।
গত বছর প্রিমিয়ার লিগ চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, গোপালগঞ্জে হওয়ায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ওপর চাপ কিছুটা কমে ছিল। কিন্তু এবার শুধু ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ভেন্যু রেখে দেশের শীর্ষ ফুটবল লিগটি আবার ঢাকায় বন্দী করে ফেলা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রামে আপাতত খেলা না হওয়ায় সব ধকল যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ওপর দিয়েই। বহুমাত্রিক ব্যবহারে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের জীবনীশক্তি বলতে গেলে শেষ। তার ওপর বৃষ্টির সময় মাঠের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে। ফলে খেলায় সৌন্দর্য থাকে না, তৃপ্তি পান না খেলোয়াড়েরাও। দর্শকদের চোখের জন্যও তা হয়ে দাঁড়ায় পীড়াদায়ক।
অথচ ঢাকার আশপাশে গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ জেলায় অনেক স্টেডিয়ামই আছে। কিন্তু এদিকে কারও নজর নেই। কিন্তু কে না জানে, দশ বছর আগে পেশাদার লিগ প্রবর্তনের আসল উদ্দেশ্য ছিল হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে খেলা। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে সরতে রাজি নয় ক্লাবগুলো। প্রিমিয়ার লিগের ১২ দলের মধ্যে চট্টগ্রাম আবাহনী ছাড়া বাকি ১১ দলেরই হোম ভেন্যু এবার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম! অবশ্য নবাগত সাইফ স্পোর্টিং যশোর এবং শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র ফরিদপুরে ভেন্যু করতে চেয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর ক্লাব দুটি আবেদন করেছে, এই কারণ দেখিয়ে আবেদন গ্রহণ করেনি বাফুফে। এক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিলে হয়তো দু’টি নতুন ভেন্যু পেতে পারত প্রিমিয়ার লিগ। তা না হাওয়ার দায় কার, সে ভিন্ন বিতর্ক। তবে ঢাকার বাইরে ভেন্যু করাটাকে একটা ‘ঝামেলার’ কাজ মনে করে বেশির ভাগ ক্লাব। বাফুফেও এ ব্যাপারে বেশ শীতল মনোভাব নিয়ে চলে। ঢাকার বাইরে গেলেই ক্লাব টাকা চায়, বাফুফের ভয়টা ওখানেও। লিগ কমিটির সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেছেন, ‘ঢাকার বাইরে খেলতে গেলে প্রতি ম্যাচের জন্য ২ লাখ টাকা করে চায় ক্লাব। এত টাকা কোথায় পাব আমরা! তবু এবার চট্টগ্রামে গেলে ২ লাখ করে দেব বলেছি। এভাবে গতবার লোকসান গুনে আড়াই কোটি টাকা দিতে হয়েছে। এটা তো সম্ভব নয়।’ কথাটা ঠিক। কিন্তু লিগ চ্যাম্পিয়ন আবাহনী চাইলে তো বিকল্প একটা ভেন্যু করতে পারে। করে না কেন? দলটির ম্যানেজার সত্যজিৎ দাশ রুপুর সোজাসাপ্টা বলে দেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় খেলছি। তাই ঢাকার বাইরে ভেন্যু করার কোনো চিন্তা আমাদের নেই। তবে ফেডারেশন খেলাটা বাইরে নিলে আমাদের আপত্তি নেই।’ আবাহনী এই কথা বললে অন্যরা কী বলবে সহজেই অনুমেয়।
মোহামেডানের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া যেমন প্রশ্ন তোলেন, ‘ঢাকার বাইরে মাঠ কোথায়? যাতায়াত সমস্যা। হোটেল নেই। যাওয়ার বাড়তি খরচটাই বা কে দেবে?’ মজার ব্যাপার, কোটি কোটি টাকায় খেলোয়াড় কিনতে পারে ক্লাব। কিন্তু ঢাকার বাইরে যাওয়া বা মাঠ নেওয়ার প্রসঙ্গ এলেই শুরু হয় নানা ওজর-আপত্তি। ব্রাদার্সের ম্যানেজার আমের খানের কাঠগড়ায় বাফুফে। যদিও ব্রাদার্সের এই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এবার কমলাপুর স্টেডিয়ামকে ব্রাদার্স নিজস্ব ভেন্যু বানাতে চেয়েছিল।
তবে বাফুফে মনে করে, ওখানে প্রিমিয়ার লিগ সম্ভব নয়। তাহলে বিকল্প ভেন্যু কি হবে না? সালাম মুর্শেদী তাকিয়ে সরকারের দিকে, ‘সরকার সাতটি বিভাগীয় স্টেডিয়াম বাফুফেকে দিচ্ছে। এগুলো সংস্কারের জন্য টাকাও বরাদ্দ হয়েছে। আগামী বছর এ ব্যাপারে অগ্রগতি দেখা যাবে।’ ঢাকার আশপাশে একটি বিকল্প ভেন্যু করার কথাও বলেন সালাম মুর্শেদী। কিন্তু এসব কথার কথাই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা। এসব থেকে বেরিয়ে ফুটবলকে সার্বজনীন করতে হবে। মুখে পেশাদার বললেই হবেনা, কাজে কর্মে পেশাদার হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ