বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজধানীবাসীকে স্বস্তি দিতে কোনো সুখবর নেই

[তিন]

জিবলু রহমান : পুরোনো ২৭ নম্বর সড়কসহ ধানমন্ডির কিছু এলাকার পানি নিষ্কাশন করে কল্যাণপুর খালে নিয়ে ফেলার জন্য ওয়াসার বাস্তবায়িত একটি প্রকল্প বেশ কার্যকর ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশন ওই এলাকায় ‘সারফেস ড্রেন’ করে সেই ব্যবস্থাটি অকার্যকর করে ফেলেছে। ফলে এখন বৃষ্টি হলেই ধানমন্ডি ২৭ নম্বর ও তার আশপাশে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।

যদিও এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেছেন, ওয়াসার তৈরি করা পানিনিষ্কাশন-ব্যবস্থা বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো প্রশ্নই আসে না। বরং সিটি করপোরেশনও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। ওই এলাকার জলাবদ্ধতা কমাতে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের পূর্ব প্রান্তের মুখ থেকে মিরপুর রোডের পূর্ব পাশ পর্যন্ত পানিনিষ্কাশনের একটি লাইন তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে উত্তরের মেয়র আনিসুল হক বলেছেন, ‘দখলদারদের উচ্ছেদ করে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। এর মধ্যে এসেছে বৃষ্টি। সে কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব আমরা চলমান প্রকল্পের কাজ শেষ করে দুর্ভোগ নিরসনের চেষ্টা করছি।’

আনিসুল হক বলেছেন, বর্তমানে মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। ওই এলাকার সব রাস্তা, ফুটপাত ও ড্রেনের আধুনিকায়ন করা হবে। এ ছাড়া বৃষ্টিতে যেসব রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে যানবাহন চালু রাখার জন্য মেরামতের কাজ চলছে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে যেসব রাস্তা ভেঙেচুরে গেছে সেগুলো মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। প্রত্যেকটি আঞ্চলিক কার্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নিজ নিজ এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার তালিকা করতে। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে নগরবাসীর ভোগান্তি দূর করতে কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, সেটাও জানাতে প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সমন্বয়হীনতার কারণে নগরবাসীর ভোগান্তি তো আছেই। এবার বৃষ্টিতে রাস্তাগুলোর যে বেহাল অবস্থা হয়েছে, তাতে ওই ভোগান্তির মাত্রা আরও কয়েকগুণ বাড়বে। এ জন্য সেবা সংস্থাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা দরকার। সেটা না হলে এমনটা চলতেই থাকবে।

সুষ্ঠু নগর ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে গণপরিবহন। ঢাকার গণপরিবহন একেবারে ভেঙে পড়ার পর্যায়ে চলে গেছে। এ অবস্থায় উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক একটি সমন্বিত বাস সার্ভিস চালু করার উদ্যোগ নিয়েছেন। উদ্যোগটি ভালো। কিন্তু দক্ষিণের মেয়র বিষয়টি জানেন না। ঢাকার সুষ্ঠু গণপরিবহন শুধু উত্তরের বিষয় নয়। এর সঙ্গে দক্ষিণকেও যুক্ত করতে হবে। গণপরিবহন পুরো মহানগরীর। তা ছাড়া সরকার কয়েক বছর আগে গঠন করেছে ‘ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ)’। এই সংস্থার কাজ কী? এদের কোনো কাজ তো দেখা যায় না।  (সূত্র : দৈনিক সমকাল ৩০ জুলাই ২০১৭)

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত নতুন সড়ক ঠিকভাবে নির্মাণ করা হলে ১৫-২০ বছর হাত দিতে হয় না। ঢাকার সড়ক যেহেতু পুরোনো, তাই একবার ভারী মেরামত করলে ৬-৮ বছর টিকে থাকার কথা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক আকতার মাহমুদ বলেছেন, শুধু জলাবদ্ধতার কারণে সড়কের এই অবস্থা হয়েছে, সেটি ঠিক নয়। ভারি যানবাহন চলাচল এবং নিম্নমানের কাজের কারণেও সড়ক ভেঙেছে। বছরের শুরুতেই সিটি করপোরেশনের সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির একটি পথনকশা বা রোডম্যাপ থাকলে এমন হতো না। এ ক্ষেত্রে সময় অনুযায়ী কাজ শুরু ও শেষ করতে হবে এবং অবশ্যই বর্ষা মৌসুমে সড়ক খোঁড়া বন্ধ রাখতে হবে। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৪ আগষ্ট ২০১৭)

২৮ জুলাই ২০১৭ রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জাপার যৌথ সভায় রাজধানীর জলজটের জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, ‘উন্নয়নের জোয়ারে ঢাকা ডুবে গেছে। সরকার কথা কথায় বলে দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। আমরা তো দেখি এখন মহাসড়কে শুধু পানি আর পানি।’ (সূত্র : দৈনিক সমকাল ২৯ জুলাই ২০১৭)

২৯ জুলাই ২০১৭ প্যান-প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠেয় রাজধানীর একটি হোটেলে ২৭ দেশের অংশগ্রহণে দু‘দিনের ঢাকা পানি সম্মেলনে ‘ডেলটা কোয়ালিশনের মিনিস্টিরিয়াল কনফারেন্স’র পর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকার জলাবদ্ধার জন্য নগরবাসীকেই দায়ী করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি বলেছেন, নগরবাসীর যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে আবর্জনায় ড্রেন আটকে থাকায় পানি নিষ্কাষণ হচ্ছে না। এর ফলে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

পানিসম্পদ মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা তৈরির পেছনে আমরাই দায়ী। কারণ আমরা অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছি। পলিথিন ফেলছি। এগুলো ড্রেনে আটকে থেকে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। চলতি বছর ঢাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। এটাও জলজটের অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, এবার যে বৃষ্টিপাত হয়েছে সেটি অস্বাভাবিক, অতিরিক্ত। স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবার হয়নি। তারপরেও ঢাকার ৮০ শতাংশ পানি তিন ঘণ্টার মধ্যে নিষ্কাশন হয়েছে। এর মানে হলো ঢাকায় পানি নিষ্কাশনে সব সিস্টেমই আছে। তবে সিস্টেমগুলো পলিথিনসহ বর্জ্য আটকে থাকায় পানি নিষ্কাশনে সময় নিচ্ছে। আমরা যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতন হতাম তাহলে এ সমস্যা হতো না।

পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, এবার বন্যা হয়েছে হাওরে। ঢাকায় কোনো বন্যা হয়নি। তবে এবার সারাদেশেই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলেও তিনি মনে করেন। (সূত্র : দৈনিক নয়াদিগনত ৩০ জুলাই ২০১৭)

নির্বাচিত হলে নগরীর জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার ছিল ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হক ও ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকনের। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার পর দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ দেখছে না নগরবাসী। এ অবস্থায় যানজট ও জলাবদ্ধতায় একেবারেই অচল হয়ে পড়েছে প্রিয় ঢাকা। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা ওয়াসারও কোনো পদক্ষেপ নেই-বলছে ক্ষুব্ধ নগরবাসী। নগরীর রাস্তাগুলো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)। রাস্তার পাশের উন্মুক্ত ও পাইপ দেয়া ড্রেনগুলোও দুই সিটি করপোরেশনের। অভিযোগ রয়েছে এসব ড্রেন বর্ষার আগে সংস্কার করা হয় না। এ কারণেই একটু বৃষ্টি হলে নগরীতে হাঁটুপানি জমে যায়। এছাড়া রাস্তার ধারের ফুটপাতগুলো সিটি করপোরেশন দখলমুক্ত করতে না পারায় প্রায় সারা দিনই সৃষ্টি হয় যানজট। ফলে যানজটে-জলজটে অচল হয়ে যায় রাজধানী। 

উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি ফিডার ড্রেন (উন্মুক্ত ও ছোট পাইপ) মেনটেন করে। যেহেতু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি এবং ড্রেনেজ ক্যাপাসিটি কম, তাই বৃষ্টির পানি নামতে সময় নেয়।

দায়িত্ব নেয়ার ১০০ দিন পূণ্য হওয়ার আগে ডিএসসিসির উদ্যোগে একটি গোলটেবিল বৈঠক হয়েছিল ডিএসসিসি অডিটরিয়ামে। সেখানে দুই মেয়রই জলাবদ্ধতা নিরসনে তাদের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। তারা বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে সচেতন রয়েছেন জানিয়ে তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে যথেষ্ট বরাদ্দ দিয়েছেন। ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন নগরবাসীর প্রত্যেককে নিজেকে মেয়র হিসেবে ভাবতে বলেছেন। এতে নাকি নগরীর সমস্যা সমাধান হবে বলে মনে করেন তিনি। সাঈদ খোকন বলেন, ঢাকার জলজট, ঢাকার দুঃখ। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এর সমাধান করতে হবে। বর্ষা মৌসুমের আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ শুরু করা হবে। এর মধ্যে যেন ৫০ শতাংশ কাজ শেষ করতে পারি। ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হক বলেন, জনগণ সঙ্গে থাকলে আদর্শ ঢাকা গড়ে তুলতে পারব। বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে সবার সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। (সূত্র : দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ