মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

সরকার বা বিরোধী দল কারও ফাঁদে পা দেব না

 

*রায়ের পর গঠনমূলক সমালোচনা যে কেউ করতে পারে

*সাত বিচারপতি চিন্তা-ভাবনা করে রায় দিয়েছি

স্টাফ রিপোর্টার : ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের সমালোচনা করে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের মন্তব্য সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনা হলে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেছেন, সরকার বা বিরোধী দল-কারও ফাঁদে (ট্র্যাপে) আমরা পড়ব না। রায় ঘোষণার পর রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা যে-কেউ করতে পারেন। গঠনমূলক সমালোচনাকে আমরা স্বাগত জানাই। তা না হলে বিচার বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নুল আবেদীন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বক্তব্যের বিষয় সর্বোচ্চ আদালতের নজরে আনেন। 

আগের দিন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। যেকোনো রায় প্রকাশিত হওয়ার পর যে কেউ সে রায় নিয়ে সমালোচনা করতে পারবেন।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, আমি ষোড়শ সংশোধনীর রায় পড়ে দেখেছি যে এই রায়ে অনেক অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য রয়েছে। যেসব কথার কোনো প্রয়োজনই এ রায়ে ছিল না। ওই রায়ে সংসদ সদস্যদের ইমম্যাচিউর (অপরিপক্ক) বলা হয়েছে, যেটা এখানে বলার কোনো দরকার ছিল না। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রসঙ্গে এ বি এম খায়রুল হক বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনতে হলে আবারও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধানে যেহেতু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ছিল না, সেহেতু এটা রাখা সংবিধান পরিপন্থী।

সকালে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নুল আবেদীন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, রায় পূর্বধারণাপ্রসূত এবং বাংলাদেশ এখন বিচারকদের প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছে-আইন কমিশনের পক্ষ থেকে এমনটি বলা হয়েছে। আমরা বিচার বিভাগের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার জন্য বলছি। 

এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ঠিক আছে। আপনারা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। আপনারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য বলছেন। তবে রায় ঘোষণার পর গঠনমূলক সমালোচনা করা যায়। রায় হওয়ার পর আমরা গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করি।

এ সময় জয়নুল আবেদীন বলেন, সর্বোচ্চ বিচারালয়কে নিয়ে যেভাবে বলা হয়েছে, তা আদালত অবমাননাকর। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, এই বিচার বিভাগকে রক্ষা করতে হলে কোনো রাজনীতি আনবেন না। আমরা রায় দিয়ে দিয়েছি। বিচার বিভাগ কোনো রিজয়েন্ডারও দেবে না।

জয়নুল আবেদীন আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি হিসেবে বলছি। তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইন সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম বলেন, বারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো রেজল্যুশন আনা হয়নি। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা সচেতন, আমরা দেখছি।

এ সময় সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন আইন কমিশনের বক্তব্যকে স্পষ্ট আদালত অবমাননাকর উল্লেখ করে আদালত অবমাননার রুল ইস্যু দাবি করেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি অনুরোধ করব, আপনারা সংযত আচরণ করবেন, যা সবার জন্য মঙ্গল। সরকার বা বিরোধী দল-কারও ফাঁদে পড়ব না। আমরা সচেতন। সাতজন বিচারপতি চিন্তাভাবনা করে রায় দিয়েছি। রায় নিয়ে কেউ পলিটিকস করবেন না।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আদালতকে নিয়ে কুৎসা রটানো হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের এই পর্যায়ে আইনজীবীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনারা সংযত আচরণ করবেন, যাতে কেউ ফায়দা লুটতে না পারে। আপনারা আরও সচেতন হবেন। 

এরপর জয়নুল আবেদীন বলেন, আমরা আমাদের কাজ করছি। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান দায়িত্বশীল পদে আছেন। তিনি এভাবে বলতে পারেন না। প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘উই কনসার্ন।’

সাবেক আইনমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ওই বক্তব্য আদালত অবমাননাকর। প্রধান বিচারপতি বলেন, রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা যে-কেউ করতে পারেন। একদিন ইতিহাস এর বিচার করবে।

প্রসঙ্গত গত ১ আগস্ট বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। রায়ে বিচারপতি অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করেছেন সর্বোচ্চ আদালত। ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বর্তমান সংসদ অপরিপক্ক, নির্বাচন কমিশন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিল, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, এক এগারো নিয়েও পর্যবেক্ষণ দেন। এরপর থেকে সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা এ রায়ের সমালোচনা করে আসছেন। গতকাল বুধবার সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মো.মোশারফ হোসেন ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এবিএম খায়রুল হক রায়ের সমালোচনা করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ