শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

বিশ^নবীর অলৌকিক ঘটনা : হেদায়াতের অনুপম কথামালা

মো. আব্দুল বাছিত : এ পৃথিবীতে যেই মহামানবকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, যাকে নিয়ে লেখা হয়েছে লাখ লাখ কিতাব, তিনি হলেন বিশ^নবী মানবতার কান্ডারী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তার ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন এবং সামগ্রিক জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য পৃষ্ঠা। সীরাতে ইবনে হিশাম, মানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সা.), সীরাতে সরওয়ারে আলম, আর রাহীকুল মাখতুমসহ অসংখ্য কিতাব লেখা হয়েছে রাসুল (সা.) এর জীবনকে নিয়ে। মহান আল্লাহর ঘোষণা, ‘হে নবী! আপনাকে আমি সমগ্র বিশে^র জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি। (সূরা আম্বিয়া) মহান আল্লাহ যাকে সমগ্র বিশে^র জন্য রহমতস্বরূপ ঘোষণা করেছেন তাঁর আলোকোজ্জ¦ল জীবন আমাদের সকলের জন্য অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয়। বিশে^র বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব, হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ^ মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তাঁর প্রশংসায় মুসলিম মনীষীগণসহ অমুসলিম দার্শনিকরা বলেছেন যে, মুহাম্মদ (সা.) এমন একজন ব্যক্তি, যার আবির্ভাব না হলে বিশ^জগৎ পরিপূর্ণ হত না। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। বিশ^নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর অলৌকিক ঘটনার মধ্যে মি’রাজ হল সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক ঘটনা বা মো’জেযা। এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীর কোনো মানুষের দ্বারা সম্ভব হয় না। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর একমাত্র প্রিয় বন্ধু হওয়ায় তাঁর দ্বারা মি’রাজের মতো একটি অলৌকিক কর্মকান্ড সম্ভব হয়েছিল। তবে এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা, ‘এরা আল্লাহর নামে কঠিন শপথ করে বলে, যদি তাদের কাছে কোনো নিদর্শন আসে, তাহলে তারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে; তুমি বলো, নিদর্শন (পাঠানো) সম্পূর্ণ আল্লাহ তায়ালার ব্যাপার, তুমি কি জানো (এদের অবস্থা) নিদর্শন এলেও এরা কিন্তু কখনো ঈমান আনবে না।’ (সূরা আনআম-১০৯)। রাসূল (সা.) মানুষের পরিবেশ পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তাদের কাছে মহান আল্লাহর বাণী তুলে ধরতেন। বিশ^নবী তাঁর সমাজের নিয়ম-রীতি, অসঙ্গতি এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন। অনেকেই ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর দাওয়াতে প্রথম দিকেই সাড়া দিয়েছিলেন, আবার অনেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম থেকে দূরে অবস্থান করেছে এবং রাসূল (সা.) এর সাথে শত্রুতার সম্পর্ক রেখেছে। এ থেকে বুঝা যায়, রাসুল সা: এর দাওয়াতের পদ্ধতিগুলো ছিল বৈচিত্র্য ও সহনশীলতায় পরিপূর্ণ। সমাজের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল। তিনি নারী পুরুষ সকলের কাছেই অত্যন্ত হিকমতের সাথে ইসলামের বাণী উপস্থাপন করতেন। কখনো কোনো ব্যক্তি রাসুল (সা.) এর একটিমাত্র মুখ নিঃসৃত বাণী শুনেই ইসলাম কবুল করেছেন আবার অনেকেই সারাজীবন আল্লাহর রাসুলের সাথে শত্রুতা অব্যাহত রেখেছে এবং ইতিহাস সাক্ষী তারাই পৃথিবীতে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আবার যারা ইচ্ছা করেই শাশ^ত সত্য বাণী ও পথ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে, রাসুল সা:’র নবুয়ত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে, তাদের জন্যই আসলে মো’জেযা প্রয়োজন ছিল। যুগে যুগে আল্লাহতায়ালা পথহারা মানুষদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। তেমনি আরব জাতিকে মূর্তি পূজা আর মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দাসত্বের প্রতি মনোযোগী করার জন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে পাঠিয়েছেন। কিন্তু কুরাইশ জনগোষ্ঠী তাঁকে মেনে নিতে পারেনি। গুটিকয়েক লোক ঈমান আনলেও অনেকেই তাঁেক অস্বীকার করে বসে। এ কারণে কাফিররা তাকে অসাধারণ গুণাবলীর পরিচয় দেওয়ার আহবান জানায়। অসাধারণ গুণাবলীগুলোকে মো’জেযা হিসেবে বিবেচিত করা হয়। মূলত আল্লাহ এ পৃথিবীতে যত নবীরাসুল পাঠিয়েছেন তাঁদের প্রত্যেককেই মোজেযাসহ পাঠিয়েছেন। হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকলেই আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মোজেযাপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হযরত ঈসা (আ.), হযরত মূসা (আ.), হযরত সুলায়মান (আ.), হযরত দাঊদ (আ.), হযরত ইদরীস (আ.), হযরত হিজকিল (আ.), হযরত উযায়ের (আ.), হযরত ইয়াকুব (আ.), হযরত ইউসুফ (আ.), হযরত ইউনূস (আ.), হযরত শুয়াইব (আ.), হযরত ইয়াহইয়া (আ.)সহ সকল নবী-রাসুলকেই আল্লাহতায়ালা মো’জেযা প্রদান করেছেন । এর মাধ্যমে নবী-রাসুলগণ মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করতেন। স্বভাবতই মানুষ হঠাত করে কোনো কিছুই বিশ^াস করতে চায় না, তাঁর সামনে অসম্ভব কিছু সংগঠিত করতে পারলে তাঁর হৃদয়ের দুয়ার খুলে যায় এবং মহান আল্লাহর ওপর ঈমান আনে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ৬৩ টি বছরের জীবনে যেসব ঘটনা সংগঠিত হয়েছে তা আমাদের আত্মাকে ঈমানের নূরে ভরপুর করে দেয়। রাসুল (সা.)-এর জীবনে সংগঠিত সবচেয়ে আলোচিত এবং যার কারণে মহানবীর পৃথিবীতে নবী হিসেবে আগমনের সত্যতা উদ্ভাসিত হল, তার মধ্যে বিশ^নবীর মাধ্যমে আসমানের চাঁদকে দু’ভাগ করা মো’জেযা ঈমানের জ্যোতিকে আরো উজ্জ¦ল করে তোলে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের সুসংবাদ পৃথিবীর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে পারস্য থেকে আসা একদল অগ্নিপূজক মক্কায় এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে আবু জেহেল তাদেরকে বাধা দিয়ে মুহাম্মদের নবুয়ত লাভের সত্যতা জানতে ও পরীক্ষা করতে চাইল। এজন্য সে বললো, ‘মুহাম্মদ যদি আকাশের চাঁদকে দুটুকরো করতে পারে তবে সে ঈমান আনবে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর নির্দেশে চাঁদকে দুটুকরো করলে উপস্থিত সকল মূর্তিপূজক তাঁর ওপর ঈমান আনলো কিন্তু আবু জেহেল ঈমান আনলো না। মূলত যাদের কপালে আল্লাহ হেদায়াত রাখেন নি, তারা হেদায়াতের পেয়ালা থেকে বঞ্চিত হয়। এমনি করে এই বইতে প্রায় দুইশ’র অধিক মো’জেযার কথা লেখক উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেকটি মো’জেযা আলোচনার দাবি রাখে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন এমনই এক মহাসাগর যা থেকে পানি অবগাহন করে শেষ করা যাবে না। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনে অনেক মো’জেযা ঘটেছে যা বর্ণনা করতে গেলে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেখা যাবে এবং পৃথিবীতে তাঁকে নিয়ে যত বই রচিত হয়েছে তাঁর কোনো হিসাব নেই। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে এমনই সম্মানের অধিকারী করেছেন। দুজাহানের বাদশাহ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন আমাদের সকলের জন্য আদর্শের সূতিকাগার। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনের সূরা আহযাবের ২১ নং আয়াতে ঘোষণা করেন ‘তোমাদের জীবনের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে রাসুলের জীবনে’। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনে তাঁর শৈশব থেকে শুরু করে ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত যেসব মো’জেযা প্রদর্শিত হয়েছে তা মুমিনের হেদায়াতের অপরিসীম সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। এ ক্ষেত্রে মোহাম্মদ ইয়াওর উদ্দিন যে বর্ণনাভঙ্গির আশ্রয় নিয়েছেন তা তাঁর সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে এক নতুনত্বের দ্বার উন্মোচিত করেছে। আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এমনই এক মহামানব তাঁর কথা সকল ধর্মগ্রন্থসহ বিভিন্ন জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে বলা যায়, বাইবেল, বেদ ও পুরাণ, বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ দিঘা-নিকায়ায়, পাশির্^ ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তা বা দসাতি, তাওরাতসহ সকল ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনই একজন মহামানবকে নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে বা হচ্ছে তা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। এর কোনো শেষ নেই, হবেও না কোনো দিন। মহান আল্লাহতায়ালা হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে এক অকল্পনীয় সম্মানের অধিকারী করেছেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইয়াওর উদ্দিন বিশ^নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর যতগুলো মো’জেযা বইতে সন্নিবেশিত করেছেন তা পাঠকের জন্য মহামূল্যবান। 

বিশ^নবীর অলৌকিক ঘটনা বইয়ের ৪৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে, হযরত হালিমা (রাঃ) এর স্তন পান করার সময় রাসুল (সা.) শুধু তাঁর একটিমাত্র স্তন থেকে দুধ পান করতেন এবং অন্যটি তাঁর দুধ ভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। এমনকি হযরত হালিমা রা: জোর করেও দ্বিতীয় স্তন থেকে দুধ পান করাতে পারতেন না। বিশে^র ইতিহাসে এমন ইনসাফপূর্ণ আচরণের শিক্ষা আর কোথায়ও পাওয়া যাবে না। এটাও রাসুল (সা.) এর সর্বশ্রেষ্ঠ মো’জেযার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে এমনি করে অনেক মো’জেযা দান করেছেন। মূলত ‘বিশ^নবীর অলৌকিক ঘটনা’ বইয়ে বর্ণিত সকল মো’জেযা মুমিনের জন্য হেদায়াতস্বরূপ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর এক একটি মো’জেযার আলোচনায় মোট কতোটি বই রচিত হয়েছে এর কোনো হিসাব নেই। 

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মো’জেযা বর্ণনার আগে লেখক যে কাব্যিক শিরোনাম ব্যবহার করেছেন সেখানেও গভীর মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। কাব্যিক শিরোনাম মো’জেযাগুলোর পরিচয় কিংবা বর্ণনা পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হবে বলে আশা করি। তবে পাঠকপ্রিয়তা পাক আর না পাক, এ বই পড়লে একজন মুসলমানের হৃদয়ে বপিত ঈমানের তেজ আরো বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাধ্যমে মুসলমান তাঁর নবী রাসুলের জীবন সম্পর্কে জেনে নিজেকে আল্লাহর নূরে রঙিন করতে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ