শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

সিকদার আবুল বাশার : জীবন ও কর্ম

 

ড. আশরাফ পিন্টু : একজন নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ, বিনয়ী প্রকাশক ও গবেষকের নামÑসিকদার আবুল বাশার। তাঁর জন্ম ১৯৬৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঝালকাঠি জেলার তারুলি গ্রামে। বাবা আব্দুস সামাদ সিকদার ও মা সৈয়দা আশরাফুন নেছা। তাঁর দাদা তাহসিন উদ্দিন সিকদার ছিলেন বাংলাসহ আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় অভিজ্ঞ। ন্যায়বিচারের জন্য তিনি অত্র এলাকায় “মুন্সি মিঞা” নামে পরিচিত ছিলেন।

সিকদার আবুল বাশারের পূর্ব পুরুষ নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার রাজসভায় চাকরি করতেন। ১৭৫৭ সালে নবাবের পতনের পর পরই বাশারের পূর্ব পুরুষেরা ভাগ্যান্বেষণে তৎকালীন পূর্ববাংলার চন্দ্রদ্বীপে (বরিশালে) চলে আসেন। এ পারে চলে আসলেও কোলকাতার সাথে তাদের পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় নি। বাশারের বাবা কোলকাতার ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে ভারতের বিখ্যাত জামসেদ পুর টাটা ইঞ্জিনিয়ারিংÑএ চাকরি করেন।

সুলতানি আমলে কয়েকটি ‘মহাল’ নিয়ে গঠিত ছিল একটি ‘শিক’। আরবি ‘শিক’ শব্দের মানে হলো একটি এলাকা বা বিভাগ। এর সাথে ফারসি ‘দার’ শব্দ যুক্ত হয়ে ‘সিকদার’ শব্দের উদ্ভব ঘটেছে; যার অর্থ হলোÑপরগণা বা চাকলার শাসক অর্থাৎ শিকের অধিপতি। ক্রমে এই ‘সিকদার’ হয়ে ওঠে অভিজাত কৌলিক পদবি।

সিকদার আবুল বাশার ১৯৮০ সালে তারুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি ও ১৯৮২ সালে ঝালকাঠি সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে এইচ.এস.সি পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকায় এসে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে নাইট শিফটে ¯œাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং ওখান থেকেই ১৯৯০ সালে তিনি শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন।

সিকদার আবুল বাশার তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে নাইট শিফটে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ নেন বাংলাবাজারের এক বইয়ের লাইব্রেরিতে। শিক্ষকের ছেলে শিক্ষক, রাজনীতিবিদের ছেলে রাজনীতিবিদ  কিংবা প্রকাশকের ছেলে প্রকাশক হওয়া সহজ হলেও অনভিজ্ঞ কোনো তরুণের পক্ষে (যার পূর্বপুরুষের কেউ প্রকাশনার সাথে জড়িত ছিলেন না) প্রকাশক হওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার ছির না। একমাত্র সাধনা থাকলেই যে সফল হওয়া সম্ভব সিকদার আবুল বাশারই তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

সিকদার আবুল বাশারের প্রকাশনা সংস্থা ‘গতিধারা’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে; তবে গতিধারার গতিশীলতা আসে১৯৯৭ থেকে। এ পর্যন্ত এ প্রকাশনা সংস্থা থেকে ইতহাস-ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, লোকসংস্কৃতি, গবেষণা-প্রবন্ধ, জীবনী, উপন্যাস, গল্প, কবিতা, শিশুতোষ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে প্রায় দেড় সহ¯্রাধিক। এ প্রকাশনা সংস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বা শ্রেষ্ঠ কাজ হচ্ছেÑ৬৪ জেলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ করা। আর এটা সম্ভব হয়েছে সিকদার আবুল বাশারের দেশপ্রেম তথা নিজ সমাজ-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকেই।

সিকদার আবুল বাশার রচিত, অনূদিত ও সম্পাদিত বেশ কিছু উৎকৃষ্ট মানের গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ঝানু গবেষকের মতো জটিল যুক্তি-তর্কের মধ্যে প্রবেশ না করে প্রামাণিক তথ্য-উপাত্ত অবলম্বনে রচনা করেছেন “ঝালকাঠি জেলার ইতিহাস” ও “পটুয়াখালী জেলার ইতিহাস। তিনি এইচ. বেভারেজের “দি ডিস্ট্রিক অব বাকেরগঞ্জ” গ্রন্থের অনূবাদ করেছেন। এটিই বাকেরগঞ্জ জেলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ও আকর গ্রন্থ। একই সঙ্গে তিনি “বৃহত্তর বাকেরগঞ্জের ইতিহাস” নামের একটি গ্রন্থ সম্পাদনাও করেছেন। এছাড়া তিনি কিছু শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনাও করেছেন। বলা বাহুল্য যে, ইতিহাস-ঐতিহ্য চেতনা সমৃদ্ধ ও মান সম্পন্ন বিপুল সংখ্যক প্রকাশনার মাধ্যমে সিকদার আবুল বাশার “গতিধারা”কে উন্নীত করেছে প্রথম শ্রেণির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে।

সিকদার আবুল বাশার তাঁর সৃজনশীল কর্মের জন্য জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের ২০০১, ২০০২, ২০০৩ সালে শ্রেষ্ঠ প্রচ্ছদশিল্পীর পুরস্কার এবং সেরা মানের গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ২০০৮ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক অমর একুশে গ্রন্থমেলা পুরস্কার পান। এ ছাড়া ২০১২ সালের ২ ডিসেম্বর জাতীয় কবিতা পরিষদ-বরিশালের উদ্যোগে প্রকাশনায় বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই সালের ২৮ ডিসেম্বর “চুয়াডাঙা সাহিত্য পরিষদ” বাংলাদেশের আঞ্চলিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রকাশনায় অবদানের জন্য তাঁকে পদক প্রদান করে। এ ছাড়া তিনি তাঁর মহৎকর্মের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা পেয়েছেন। গবেষণা ও সাফল্য গাঁথার উপর ভিত্তি করে মাছরাঙা, এস.এ টিভিসহ কয়েকটি টিভি চ্যানেলে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে।

সিকদার আবুল বাশারের সৃজনশীল ও মহৎ কর্মের জন্য প্রবন্ধ-নিবন্ধে অনেক বিশিষ্টজন মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর সম্পর্কে বিশিষ্ট রাষ্টবিজ্ঞানী ড. মো. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেছেন, “সিকদার আবুল বাশার কেবল একজন পুস্তক প্রকাশকই নন, একজন সৃজনশীল মানুষও। তিনি সবসময় কর্মযোগী থাকেন।”

লোকবিজ্ঞানী ওয়াকিল আহমদ বলেন, “সিকদার আবুল বাশারকে আমি একজন সত্যবাদী, স্পষ্টবাদী ও প্রতিবাদী হিসেবে জানি। স্পষ্টবাদিতা ও প্রতিবাদী চেতনার জন্য অনেক সময় তিনি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছেন। তোষামোদ প্রিয়তা তিনি অপচন্দ করেন।”

খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. মাহবুবুল হকের ভাষায়, “ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং একান্ত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে সিকদার আবুল বাশার জাতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এ জন্য যথাযথ স্বীকৃতি তাঁর প্রাপ্য।”

সিকদার আবুল বাশার বহুবিধ গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। এত অল্পকথায় তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করা কঠিন। বর্তমানে যেখানে অধিকাংশ প্রকাশক লাভজনক গ্রন্থ প্রকাশ করে রাতারাতি বৃত্তশালী হয়ে উঠছেÑ সেখানে সিকদার আবুল বাশার অলাভজনক গ্রন্থ প্রকাশ করেই চলেছেন;  কোনো লোকসানের চিন্তা করছেন না। এই আলোর মতো সত্য কথাটি সকলেই জানেন; আর এই সত্য কথাটি যদি না বলা হয় তবে বিবেক কখনো ক্ষমা করবে না। এগুলো সবই সম্ভব হয়েছে সিকদার আবুল বাশার নিজেকে প্রকৃত একজন মানুষ হিসেবে তৈরী করতে পেরেছেন বলেÑ আর এখানেই তাঁর কৃতিত্ব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ