শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

দৃশ্যের অন্তরালে

আবদুল হালীম খাঁ : আজ সকালে ঘুম থেকে ওঠলে শরীরটা বেশ ফুরফুরে লাগলো। বাইরে রাস্তা দিয়ে একটু বেড়িয়ে এলাম। হঠাৎ পেটে ক্ষুধা মোচড় দিয়ে উঠলো। ঘরে ঢুকে দেখি সকালের নাস্তা টেবিলে হাজির। বুটের ডাল আর আটার নরম তুলতুলে রুটি কয়েকটি। খেতে খুব ভালো লাগলো। কেন জানি মনটা আজ খুব হালকা মনে হচ্ছে। বেশ ভালো ঠেকছে। প্রিয় একটা গানের কলি মনের ভেতর গুন গুন করতে লাগলো :

তুমি আসবে বলে

আমি জানালা খুলে

দাঁড়িয়ে আছি।

মনে হয় তুমি এসে

দাঁড়িয়ে আছো কাছাকাছি...

টেবিলের উপর একটা গল্পের বই নজরে পড়লো। মনে হলো আহা! কতদিন যাবত গল্প লিখি না! কবিতা লিখে লিখে মনটা একেবারে একপেশে হয়ে গেছে। কবিতা এখন আর ভাল্লাগে না। কবিতায় মনের সব কথা বলা যায় না। গল্পে মন উজাড় করে খুলে সব কথা বলা যায়। আমি যদি ভালো একটা গল্প লিখতে পারতাম। দারুণ আনন্দ পেতাম। মনের সব সুখ দুঃখ ব্যথাবেদনা আর অব্যক্ত অনুক্ত কথাগুলো ঝেড়ে নিঙরে ফেলতে পারতাম।

এ সময়ে গল্প লেখার একটা তীব্র ক্ষুধা মনের ভেতর জেগে ওঠলো। ভাবলাম তাহলে এক্ষুণি শুরু করি না কেন! কলম হাতে নিয়ে বসে পড়লাম।

কিন্তু সমস্যা হলো ইচ্ছে করলেই কি লিখা যায়!

এক্ষণে গল্পের কোনো প্লট যে মনে আসছে না। কী নিয়ে লিখি।

টেবিলের ওপর মাথা ঠেকিয়ে গল্পের প্লট মনে মনে খুঁজতে লাগলাম। অনেক ভাবার পর হঠাৎ একসঙ্গে কয়েকটা প্লট পেয়ে গেলাম। এর কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে নিয়ে লিখি। মন একবার এটার দিকে আবার ওটারদিকে ছুটে যেতে লাগলো। দোলার নামটাই মনে বার বার দোলা দিতে লাগলো। দোলা আমাদের বাসার পাশের এক ভাড়াটে কলেজের ছাত্রী। কয়েকদিন আগে বিষ খেয়ে মারা গেছে।

আমার পড়ার রুমে দোলা কয়েকদিন এসেছিল। দেখেছিলাম ওর মনটা খুব ভার ভার। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল ভাইয়া, আপনি কি শুধু কবিতা লিখেন? গল্প লিখেন না?

লিখি মাঝে মাঝে। তুমি কি গল্প পড়ো?

জী পড়ি। গল্প আমার কাছে খুব ভালো লাগে।

ভালো লাগবে না কেন! জীবনই গল্প।

ঠিক বলছেন ভাইয়া।

কোন ধরনের গল্প তোমার ভালো লাগে?

দোলা ফিক করে হাসলো। তারপর বললো, এই যে সাম্প্রতিককালে যা ঘটছে। বাস্তব ঘটনা নিয়ে লেখা গল্প। অর্থাৎ জীবন থেকে নেয়া গল্প?

জী ভাইয়া।

আমার শোকেস দেখো। সাম্প্রতিককালের এমন কিছু গল্প উপন্যাস আছে। নিয়ে পড়ে দেখতে পারো। দোলা আমার শোকেস থেকে খুঁজে খুঁজে দু’টি গল্পের বই বের করে আমাকে দেখিয়ে বললো, এ দু’টি নিয়ে যাই, পড়ে ফেরত দেবো।

আচ্ছা নিয়ে যাও।

তিনদিন পর এসে দোলা বই দু’টি ফেরত দিয়ে গিয়েছিল। আমি সে সময় বাসায় ছিলাম না। দোলার সাথে কথা এবং পরিচয় এতটুকুই।

পরে শুনেছিলাম ওর এক সহপাঠী ছেলেকে ভালবেসেছিল। তারপর কিভাবে কি হয়েছিল কেউ বলতে পারে না। তবে ছেলেটা ওর সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছিল এবং শেষে প্রতারণা করে। তাই ওর মৃত্যুর কারণ।

ভাবলাম দোলার প্রেমঘটিত ব্যাপার নিয়ে একটা গল্প বানিয়ে ফেলি। আবার ভাবলাম এ ধরনের প্রেমঘটিত ঘটনা নিয়ে অনেকেই গল্প উপন্যাস লিখেছেন। এগুলো এখন পানসে হয়ে গেছে। এদিকে আবার আমার প্রেমের ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। মেয়েদের মনের আঁকাবাঁকা গলিতে হাঁটিনি। কিছুটা অভিজ্ঞতা না থাকলে শুধু শুধু কল্পনায় বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যায় না। তাই দোলাকে নিয়ে আমি আর কলম ধরিনি।

ছোটবেলায় রোগীদের দুঃখ-কষ্ট দেখে ভেবেছিলাম ডাক্তার হবো। আমার ক্লাসমেট রাজুও ওর মায়ের অসুখ দেখে ডাক্তার হতে চেয়েছিল। কিন্তু ডাক্তার হওয়ার আগেই মা মারা গেল। টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারলো না। তাই রাজু ভাবলো রোগীর চিকিৎসার জন্য ডাক্তার হওয়ার চেয়ে টাকার বেশি প্রয়োজন। টাকা হাতে থাকলে রোগীরে চিকিৎসা করা যায়। অভাবী মানুষকে সাহায্য করা যায়। ধর্মীয় কাজে দানখয়রাত করে সমাজে দাতা বলে খ্যাতি লাভ করা যায়। রাজুর চিন্তা আমার কাছে ঠিকই মনে হয়েছিল। আর একদিন আমি এক ডাক্তারের কথা শুনে চমকিত হয়েছিলাম। সে ডাক্তার আমার নিকটাত্মীয়। একদিন আলাপের এক পর্যায়ে বলেছিলাম। আপনি সুখী। যেমন মানুষের সেবা করার সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি টাকাও রোজগার করতে পারছেন প্রচুর। 

ডাক্তার আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই বক্তৃতা দেয়া শুরু করলেন:

ভাইসাব বুঝবেন না দুঃখ কষ্ট। 

কেন? কী দুঃখ আপনার?

আপনি তা বুঝবেন না।

একটু বুঝিয়ে বলুন না।

ভাইসাব, আমার কাছে কোনো ভালো মানুষ আসে না। আসে শুধু রোগী। আর রোগী। হাসি মুখ দেখি না কারো। ডাক্তারের কাছে তো রোগীই আসবে।

শোনেন ভাই, এসেই শুরু করে দুঃখের বয়ান। ডাক্তার সাব, আমার পেটে ব্যথা। খেতে পারি না। খাদ্য হজম হয় না। খেলেই বমি। রাতে ঘুমাতে পারি না। বার বার পায়খানায় যেতে হয়। কেউ এসে বলে, মাথায় ব্যথা, মাজায় ব্যথা, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারি না, শুয়ে থাকতে পারি না।

কারো হাইপ্রেসার, কারো লোপ্রেসার, কারো ডায়াবেটিস, কারো সর্দি, কারো জ্বর, কারো রক্তশূন্যতা, কারো কাশি- এভাবে সারাদিন নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ শিশু রোগী আসে। রোগীদের উহু আহা ব্যথা-বেদনার কথা শুনতে শুনতে আর তাদের হাত-পা পেট টিপে দেখতে দেখতে মনে ঘৃণা ধরে গেছে। মনে মনে ভাবি, আমি কী পাপ করেছিলাম যে, সকাল থেকে সন্ধ্যে আর সন্ধ্যে থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এসব দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতে হচ্ছে। সারাদিন কারো হাসি মুখ দেখি না। হাসি শুনি না। কোনো সুখবর শুনি না। ভালো কথা ভালোবাসার কথা শুনি না। শুনি রোগীদের চিৎকার, হাহাকার, মইলা গো, বাঁচাও গো... বলুন তো এসব শুনতে ক্যামন লাগে!

আমার কি একটু আশার কথা, একটু ভালোবাসার কথা শুনতে ইচ্ছে করে না? আমি কি মানুষ নই? আমি কি রোবট? আমার কোনো পাপের কারণেই আমি ডাক্তার হয়েছি!

আমি নির্বাক হয়ে ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়ে তার কথা শুনতে ছিলাম। আর মনে পড়তে ছিল সেই কবিতাটি: 

নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস

ওপারে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।

ডাক্তার বলতেই লাগলেন। শেষে দুঃখ করে বললেন, ভাইসাব, সাধ্য মতো রোগীদের সেবা করি। কিন্তু রোগীদের মুখে কোনো কৃতজ্ঞতার কথা শুনতে পাই না। চেম্বার থেকে বের হয়ে একজন আরেকজনকে বলে: এটা ডাক্তার তো নয়, আস্ত জোঁক। শরীরের রক্ত চুষে খায়। কেউ বলে শালা একদম কসাই... ভাই, এই হলো আমার সুখের অবস্থা। এখন বুঝুন ক্যামন আছি।

অন্যদিকে দেখুন কত জন দু’ক্লাস পাস না করে রাজনৈতিক দলে যোদ দিয়ে বড় নেতা হয়ে যাচ্ছে। জনগণে সম্পদ লুটপাট করে খাচ্ছে। দুর্নীতি করছে। সন্ত্রাস করছে। দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানাচ্ছে। অথচ জনগণ তাদেরকে মাথায় নিয়ে নাচছে।

স্লেøাগান দিচ্ছে গলা ফাটিয়ে: তোমার নেতা আমার নেতা- চান্দুভাই চান্দুভাই।

চান্দু ভাই তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে। 

চান্দু ভাইয়ের চরিত্রÑ ফুলের মতো পবিত্র।

ফুলের মালা পরবেকে চান্দু ভাই ছাড়া আছে কে?

তোমার ভাই আমার ভাই চান্দু ভাই চান্দু ভাই...।

ডাক্তারের কথা শুনে আমার চোখের ভেতরে আরেকটি চোখ এবং গতানুগতিক চিন্তার ভেতরে আরেকটি চিন্তা জেগে উঠলো। তাই গল্পে ডাক্তার হয়ে জনসেবার চিন্তার ঘোড়া না ছুটিয়ে আমি বাস্তব মুখী হওয়ার চিন্তা করতে লাগলাম।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি নেয়ামত আলী ভাই যাচ্ছেন। পরনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি মাথায় সাদা টুপী নেয়ামত ভাই এখন সারাদিন মসজিদেই পড়ে থাকেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আযান দেন, জামায়াতে নামাজ পড়েন। আর আল্লাহ বিল্লাহ করেন। নেয়ামত ভাই আগে আমাদের বাড়ি বার্ষিক কাজ করেন। মাঠে কাজ করতে ধুয়া জারি গান গাইতেন। তার গলা ছিল বাঁশির সূরের মতো। তিনি ক্ষেতে কাজ করতে যখন গান গাইতেন মাঠে কামলারা এসে তার গান শুনতেন। সবাই তাকে নেমত বয়াতি বলে ডাকাতো। সেই নেয়ামত মাঠের কাজ বাদ দিয়ে দ্বীনের কাজ ধরেছেন। এখন তাকে কেউ আর বয়াতি বলে ডাকে না। বলে নেয়ামত মুন্সী। নেয়ামত মুয়াজ্জিন।

 যে নেয়ামত আলী আগে গামছা পরে মাঠে কাজ করতেন আর গান গেয়ে বয়াতি খ্যাতি লাভ করেছিলেন তিনি এখন হয়েছেন মুন্সী। তার আযানের সুর শুনে মুসল্লিদের প্রাণে আল্লাহ রাসূলের প্রেম জাগে।

একজন অশিক্ষিত মানুষের কর্মের এই সফলতা ও খ্যাতি অর্জন কি কম কথা! আমি নেয়ামত আলী ভাইর প্রতি খুব দুর্বল। তাকে আমি মনে মনে খুব শ্রদ্ধা করি। দেখা হলে ভক্তি ভরে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করি: কেমন আছেন ভাই?

নেয়ামত ভাই আসলে ভাগ্যবান। তার এক ছেলে আট ক্লাস পাশ করে কয়েক বছর আগে পুলিশের চাকরি নিয়েছে। কয় বছরের মধ্যে বাড়ির চেহারা পরিবর্তন করে ফেলেছে। পোড়াটিনের ছাপরার জায়গায় নয়াটিনের বৌরি ঘর দিয়েছে। ঘর পাকা। বাড়ির চারদিকে টিনের বেড়া। ঘরে সোফাসেট। খাট। ফ্রিজ। রঙিন টিভি। নেয়ামত আলীর জীবন যেমন বদলে গেছে বাড়ি ঘরও তেমনি বদলে গেছে। নেয়ামত আলী সত্যি ভাগ্যবান।

এই নেয়ামত আলীকে নিয়ে গল্প লেখা যায়। লেখা যাবে না কেনো? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর শরৎ চন্দ্রের কথা মনে পড়ে গেল। তারা তো সমাজের অজ্ঞাত অখ্যাত তুচ্ছ লোকদের টেনে এনেছেন সাহিত্যের বিশাল অঙ্গনে। পল্লী কবি জসীমউদ্দীন আর কবি বন্দ্যে আলী মিয়া কি কম করেছেন? আমাদের দেশে তো বাস করে গাঁয়। তাই গাঁয়ের নেয়ামত আলী, ইয়াদালী, চেরাগালী, কালু ফালূদের কথা সাহিত্যে খাততে হবে। তাদের মুখের ভাষা, স্বভাব চরিত্র, স্বপ্ন সাধ, আশা আকাক্সক্ষা, তাদের ঘরবাড়ি, পরিবেশ, তাদের বিশ্বাস ধর্মবোধ আমাদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস নাটক ও গানে আনতে হবে। গ্রামের মানুষের গরু ছাগল, হাঁস মুরগী। মাঠঘাট, নদনদী খাল বিল, লাউয়ের জাংলা, কুমড়া, ঝিঙে, পটল, আলু বেগুন ও সাহিত্যে স্থান দিতে হবে। গ্রামে সৎ অসৎ, চোর চোট্টা, গায়কবাদক আছে। প্রেমপ্রীতি। শোক দুঃখ, বিরহ বেদনা আছেÑ এ সবই আমাদের সাহিত্যে স্থান দিতে হবে, তা না দিলে সেটা য আমাদের সাহিত্য হবে না। গরু খাসির গোশত স্বাদ করে খাবেন, রাখালের কথা না লিখলে, মাছ মজা করে খাবে, জেলেদের কথা লিখবেন না কেন? আমরা গাঁয়ের মানুষ গাঁয়ের কথা লিখতে গাঁয়ের পরিচয় দিতে লজ্জা কী?

অন্যদিকে আজকাল আমাদের গল্প উন্যাস নাটকে কি দেখছি? সেখানে গ্রামের দৃশ্য নেই, মাঠ ঘাট নেই, গ্রামের মানুষ নেই, তাদের আশা ভাষা নেই। আছে সাহেব সুক। সুরশ্য দালান কোঠা, চকচকা গাড়ি, ইরকি মিরকি ভাষা আর কত কী!

এই সব ভেবে ভেবে মনস্থির করলাম। আমাদের নেয়ামত আলী তাইকে আমার গল্পের নাক বানাবো। আবার মনের ভেতর চিন্তা জাগলো এখন কি সেই সাহিত্য রচনার পরিবেশ আছে?

আধুনিক সাহিত্যিক বোদ্ধাদের কাছে কি তা গ্রহণযোগ্য হবে? এখন তো সেই মানিক-শরৎ-জসীমের দিন নেই। সবই পাল্টে গেছে। জসীমউদদ্ীনকে তো অনেক আধুনিক কবি, কবি বলেই স্বীকার করেন না। তার নাম শুনেই নাক সিটকান। যত্তসব অখাদ্য...।

আমি মাঠের কামলা নেয়ামত আলীকে নিয়ে লিখলে সাহিত্যের মাহফিলে কলকে পাবো না নিশ্চিত। তাই বৃথা চেষ্টা না করাই ভালো। কী আর করি।

কিছুদিন আগে ‘কাগজের আগুন’ নামে একটা গল্প লিখেছিলাম। সাহস করে পাঠিয়ে দিলাম এক নামী দামী পত্রিকায়। গল্পটা শুধু ছাপাই হয়েছিল না, সম্পাদক সাহেব আমাকে ফোন করে বলেছিলাম, আপনার গল্পটা খুব ভালো লেগেছে। এতে পাঠকদের জন্য ম্যাসেজ আছে। এ ধরনের গল্প আরো পাঠাবেন। আমি সম্পাদক সাহেবের কথায় খুশির চেয়ে লজ্জা পেয়েছিলাম বেশি।সত্যি কি আমি গল্পে তেমন কোনো ম্যাসেজ দিতে পেরেছি। ওদিকে আমার এক বন্ধু প্রেমের গল্প সংকলনের জন্য একটা গল্প চেয়েছিলেন। দেই দিচ্ছি করে আর দিতে পারিনি। কেউ কোনো বিষয় ভিত্তিক লেখা চাইলে আমি আর লিখতে পারি না। দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। কি লিখবো কেমন হবে। তাদের চাহিদা মুতাবেক হবে কিনা। এই ভাবনা, আর লিখতে সাহস পাই না। বিশেষ করে প্রেমের গল্পের ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ আনাড়ি। 

আজকাল যুবক-যুবতীদের বুকে সদা সর্বদা প্রেমানল দাউ দাউ করে দিয়েশলাইর কাঠির মতো। একটু ঘষা লাগলেই জ্বলে ওঠে। যেমন কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ধমধাম সিঁড়ি দিয়ে উঠছে আর নামছে। হঠা’ এক ছাত্রীর সঙ্গে এক ছাত্রের একটু শরীর লেগে গেল। ছাত্রটি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন: ডোন্ট মাইন্ড সিস্টার। মেয়েটিও ছেলেটির দিকে একটি দৃষ্টির তীর ছুড়ে মারলো। তার দৃষ্টি তীর অমনি বুক ভেদ করে অন্তরে বিদ্ধ হয়ে গেল। আর সে যায় কোথায়? এক তীরেই ছেলেটি কুপোকাত। তারপর আর কী?

এভাবেই একটি গল্প বা উপন্যাসের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়ে যায়।

আমার সেই বন্ধুটি পত্রিকা থেকে সেই ‘কাগজের আগুন’ গল্পটি সংগ্রহ করে প্রেমের গল্প সংকললে প্রথম স্থান দিয়ে চিঠি লিখে বলেছিলেন সতেরটি গল্পের মধ্যে আপনার ‘কাগজের আগুনই’ পাঠকপাঠিকাদের হৃদয়ে আগুন ধরাতে পারবে আমার বিশ্বাস। 

বন্ধুরা জানি অনেক সময় তেল মারা কথা বলে থাকেন। তাই তার কথার তেমন কোনো গুরুত্ব দিইনি। তবু নিজের হাতে লেখা গল্পটা আরেকবার পড়ে দেখার ইচ্ছে জাগলো। গল্পটা বের করে পড়লাম। মন্দ লাগলো না। মনে মনে ভাবলাম একি সত্যি আমার হাতের লেখা। 

কিন্তু আজ এমন সুন্দর মনোরম পরিবেশে বসে তেমন কিছুই যে মাথায় আসছে না।

আমার ঘর রাস্তার পাশে। একটু পরেই এ রাস্তা দিয়ে মিছিল যাবে। মিছিল আসবে। মাইক বাজবে। জনতার পদভারে ধুলো উড়বে। স্লেøাগানে স্লেøাগানে সারা এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠবে। ট্রাক, জিপ, ভ্যান-রিকশা চলাচল শুরু হবে। শুরু হবে একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি, একটি শোক সংবাদ, একটি নিখোঁজ সংবাদ, ভর্তি চলছে ভর্তি চলছে। ক্লিনিক ডাক্তারদের সুনাম সুখ্যাতির প্রচার। ফকির ফক্কিনিদের চেঁচামেচি, বাবা দুইডা টেহা দিইন। তিনদিন ধইরা না খাইয়া আছি...।

এমনি পরিবেশে কিছু লেখা যায় কি? লেখাপড়া তো দূরের কথা ঘরে টিকে থাকাই বিপদ। কোনো দিকে যাবারও উপায় নেই। তবু কাগজ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকি।

আমি নিকট অতীতের স্মৃতি চারণ করতে লাগলাম। না, তেমন কিছুই খুঁজে পেলাম না। আমার ঘাত প্রতিঘাতহীন সরল জীবন।একই মরণ লেখায় বয়ে চলছে। কোনো বৈচিত্র্য নেই। কোলে ঝড়-ঝাঁপটা নেই। একদম রিামিশ। এ জীবনের ধারাবাহিকতায় কাউকে শোনানোর মতো কোনো মেসেজ আমার কাছে নেই। এরপর চলে গেলাম আরেকটু পেছনে। সেই চেলেবেলার এলোমেলো দিনগুলোতে।

আসলে সবারই ছেলেবেলার রঙিন দিনগুলোর স্মৃতি চারণ করতে ভালো লাগে।

তখন কেবল স্কুলে যাতায়াত শুরু করেছি। সারাদিন পাখির মতো উড়ে বেড়াতাম। পাখির বাসা খুঁজতাম। পাখি ধরে পায়ে সূতো বেঁধে উড়িয়ে কি যে আনন্দ পেতাম। ফড়িং ধরতাম। আহ! তখন কী যে আনন্দের দিন ছিল। মুখে সব সময় হাসি লেগেই থাকতো। দল ধরে, স্কুলে যেতাম। স্কুল থেকে হইচই করে ফিরে বিকেলে মাঠে খেলতাম। ঘুড়ি উড়াতাম। বৃষ্টির কাদা পানিতে ভিজতে আনন্দ। বর্ষায় খাল বিলে তেলা বাইতে আনন্দ। দুপুুর রোদে পুড়ে ছুটাছুটি করতে আনন্দ। মাছ ধরতে আনন্দ। সাঁতারে পাল্লা দিয়ে আনন্দ। মা বাবার বকুনি খেতে আনন্দ।

জ্বরসর্দি হলে কী যে খুশি হতাম। স্কুলে যাওয়া লাগতো না। স্যারদের ধম শুনতে হতো না। মা মাথায় জলপট্টি দিয়ে পাশে বসে থাকতেন। বাবা মাঝে মাঝে কপালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, এখন ক্যামন ঠেকছে রে?

কি খাবি?

কলা?

ডালিম?

পেয়ারা?

সন্দেশ?

আমি মাথা নেড়ে শুধু না করতাম।

রসগোল্লার প্রতি আমার খুব লোভ ছিল। বড় মামা রসগোল্লা সন্দেশ নিয়ে আসতেন। ছোট মামা পাকা পেঁপে আর কমলা নিয়ে আসতেন। দুলাভাই আঙ্গুর নিয়ে এসে পাশে বসতেন। ছোট চাচা ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসতেন। মা তো বার্লি জ্বাল দিয়ে বাটি নিয়ে সিথানে বসে থাকতেন।

আমার বিছানার দুপাশে ফলমূলের স্তূপ হয়ে যেতো। ছোট চাচি সুজির বাটি নিয়ে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে  এই যে সুজি। একটু খাও বাবা। টেবিলের ওপর ওষুধের শিশি বোতল। পানির জগ আর গ্লাস আরো কত কি!

মা কমলা ছিলে একটা একটা কোষ মখের কাছে ধরে বলতেন খাও বাবা। খেলেই জ্বর ছেড়ে যাবে।

আহ! তখন মা বাবা আত্মীয় স্বজনেরা আমাকে কতই আদর করতেন। কত ভাল ভাল খাবার মুখে তুলে দিতেন। কখনো ভাবি সারা জীবনই যদি তেমনি ছোট থাকতে পারতাম।

পাশের গ্রামের প্রাইমার স্কুলে পড়তাম। বর্ষাকালে পাঠ ঘাট ডুবে যেতো। জব্বার বোরহান আর আমি কলার ভেলায় চড়ে স্কুলে যেতাম। ফেরার সময় কোনো কোনো দিন বইখাতা কাপড় ভিজিয়ে নিয়ে বাড়ি আসতাম। বা বই কাপড় রোদে দিতেন। কলার ভেলা নিয়ে স্কুলে যাওয়াটা ছিল মহাযুদ্ধে যাওয়া। আর ফিরে আসার আনন্দটা ছিল যুদ্ধে জয়লাভ করার মতো আনন্দের ব্যাপার। যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। তখনকার আনন্দের কথা কি আর বলবো। বাঁশের লম্বা এক বেঞ্চে আমরা বারো চৌদ্দ জন পাশাপাশি বসতাম। স্যার ক্ল্যাসে আসর আগে শুরু হতো ধাক্কাধাক্কি। খুব চাপা চাপি হতো। দু’দিকের চাপাচাপি কখনো আমার বসে থাকা সম্ভব হতো না। পড়ি পড়ি অবস্থা। তখন ওদিকে মেয়েদের বেঞ্চ থেকে জহুরা আমাকে ডাক দিতো: পান্না তুই আমার কাছে আয়। আমি বইখাতা নিয়ে জহুরার পাশে গিয়ে বসতাম। তখন আমার কি যে ভালো ঠেকতো! জহুরা অন্য কোনো ছেলেকে ওর পাশে বসতে দিতো না। জহুরাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমি খুঁজে পেতাম না।

টিফিনে যখন ছেলেমেয়েরা হুড়মুড় করে বাইরে চলে যেতো। জহুরা তখন আমার হাত ধরে টনা দিয়ে বলতো বস। তারপর ব্যাগ থেকে বড়ই বের করে হাতে দিয়ে বলতো খা।

জহুরা ছিল ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল। প্রত্যেক পরীক্ষায় অংকে সে একশ’ নম্বরই পেতো। এবং প্রায় সকল পরীক্ষায়ই ফার্স্ট হতো। মাঝে মধ্যে আমি হতাম। তাই ক্লাসে আমাদের দু’জনের মধ্যে গভীর ভাব ছিল এবং মর্যাদাও ছিল আলাদা। আমাদের দু’জনের খাতির দেখে ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা কে কি বলতো জানি না। তবে মাঝে মাঝে ওরা চোখ টিপে টিপে হাসতো।

আমরা দু’জনে তাতে আনন্দই পেতাম।

জহুরা মুরুব্বির মতো আমাকে উপদেশ দিতো, ওই দুষ্টু ছেলেদের সাথে মিশবি না। ওদের কাছে বসবি না।  তুই আমার কাছে বসবি। আমাদের স্কুলের পশ্চিম পাশে একটা ফুলের বাগান ছিল। সকালে নানা রঙের শত শত ফুল ফুটতো। দক্ষিণ পাশে খোলা মাঠে সবুজ ধানের হেলাছোলা। নীলাকাশে পাখির উড়াউড়িÑ এসব কিছুর দিকেই আমি তাকাতাম না। আমি শুধু জহুরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সত্যি বলতে কি স্কুলে এবং স্কুলের বাইরে জহুরাকে ছাড়া দেখার মত আর কিছুই ছিল না।

আমি সবার আগে স্কুলে যেতাম। জহুরাকে দেখার জন্যই না কি এমন মনে নেই। স্কুলে গিয়ে যেদিন ক্লাসে জহুরাকে দেখতাম না। সেদিন স্কুলের পেছনে জহুরা আসার পথে দাঁড়িয়ে থাকতাম। জহুরা দূর থেকে আমাকে দেখে মুচকি হাসতো। কাছে এসে বলতো, এখন দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

তোর জন্যে।

আমি যদি আজ না আসতাম।

সারাদিনই এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম।

তুই একটা পাগল।

সত্যি আমি পাগল?

সত্যি।

বলেই ও আমার কাঁধে হাত দিয়ে হাসতো। তারপর বলতো-

তুই ভালো। খুব ভালো।

জহুরা আজানু লম্বিত দীর্ঘ কালো চুল দুলিয়ে আগে আগে হাঁটতো আমি ওর পেছনে পেছনে এসে ক্লাসে ঢুকতাম।

সে সময়ে একদিনের ঘটনা। আমি তখন গোপনে গোপনে কবিতা লেখা শুরু করেছি। কবিতা কি তা বুঝতাম না। পাঠ্যপুস্তকের কবিতার মত ছন্দ মিল করে কিছু লেখার চেষ্টা শুরু করেছি আর কি। টিফিনের সময় জহুরা আমার রাফখাতা নেড়েচেড়ে একটা কবিতা বের করে পড়ে বললো, তুই কবিতা লিখিস? দারুণ ভালো হয়েছে তো রে। আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখিস তো।

এই প্রথম আমার কবিতা লেখার তথ্য ফাঁস হলো এবং আমার কবিতার প্রথম পাঠক হলো জহুরা।

বললাম, আমি কি তোকে নিয়ে লিখতে পারবো। তুই কত সুন্দর।

জহুরা খুব সুন্দর করে হেসে বললো:

তুইই সুন্দর। আমার কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, কী লিখবি কি না বল!

আচ্ছা চেষ্টা করবো।

আগামী দিন লিখে নিয়ে আসবি।

বাড়ি আসার পথেই ভাবতে লাগলাম। ওকে নিয়ে কিভাবে লিখবো। ওমন সুন্দর যার চোখ মুখ। মাথায় কালো চুলের অরণ্য। টানা টানা চোখ। তিল ফুলের মত নরম নাসিকা। ডালিম দানার মত দাঁত। গোলাপ ফুলের মত রাঙা অধর ওষ্ঠ। জহুরা যখন আমার দিকে তাকায় আমি তো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি না। লজ্জায় আমার দৃষ্টি নত হয়ে যায়। ওর কথা আমি অমান্য করি কেমনে।

 সেদিন অংক বাংলা ইংরেজি বই টেবিলের এক পাশে রেখে খাতা নিয়ে বসলাম। এদ্দিন কবিতা লিখতে বসে কি নিয়ে লিখবো সে বিষয়টি খুঁজে পাইনি। তার রূপরেখা কল্পনা করতে পারিনি। আজ সত্যিকারের একটি কবিতা আমার পাশে আমার চোখের সামনে উপস্থিত। জহুরাই আমার কবিতা। ওর চেয়ে ভালো আর কোনো কবিতা নেই। গোলাপ কি জহুরার চেয়ে সুন্দর? চাঁদ কি জহুরার চেয়ে সুন্দর? আমার তো ইচ্ছে করছে জহুরার ভ্রমর কালো চুলের অরণ্যে আমি সারাজীবন লুকিয়ে থাকি। ওর চুলের ঘ্রাণ শুঁকি আর ওর তিল ফুলের মত শুভ নরম নাসিকা বার বার ছুঁয়ে দেখি। ওর অই নরম দু’টি হাত- যে হাত দিয়ে আমাকে স্পর্শ করেছে সেই হাত দু’টিতে বার বার চুমো দিই।

তারপর?

তারপর?

তারপর?

ভাবতে ভাবতে আমি কোথায় গিয়ে যে পৌঁছেছিলাম আজ কিছুই মনে নেই। তবে জহুরাকে নিয়ে অনেক চেষ্টা করে একটা পদ্য লিখেছিলাম। অনেক রাত জেগে। পরীক্ষার সময়ও আমি কখনোও অত রাত জাগিনি। কবিতাটা কাগজের এক পৃষ্ঠায় লিখে ভাবতে লাগলাম। এটা কোথায় রাখি। সকালে মা যদি দেখে ফেলে! শেষে বালিশের কভারে লুকিয়ে রাখলাম। স্কুলে যাবার সময় কাগজটা ভাঁজ করে বুক পকেটে রাখলাম। এর মালিক ব্যতীত অন্য কারো হাতে না পড়ে এবং জানতে না পারে। ভাবতে লাগলাম আমার বুকের মানিক সারারাতের সাবধনার ধন- মহাকাব্য জহুরাকে কখনো দেখব!

টিফিনের সময় ছাত্ররা হুড়মুড় করে বাইরে চলে গেল। জহুরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, লিখেছিস?

লিখেছি।

কই? দে দেখি।

কবিতাটা পকেট থেকে বের করার আগেই জহুরা আমার বুক পকেটে হাত দিয়ে বের করে পড়তে লাগলো। পড়ে সে কী খুশি। খুশিতে ওর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আরো। বললো, পান্না তুই বড় কবি হবি রে।

খুব ভালো হয়েছে।

সত্যি ভালো হয়েছে?

সত্যি বলছি।

এখন ফেরত দে।

না দেব না।

কেন দিবি না?

মাকে দেখাবো।

না, না, খালা আম্মাকে দেখাবি না।

মা দেখলে খুশি হবে।

না, খারাপ মনে করবেন।

এটা আমার কবিতা। তোকে আর দেব না। বলেই ব্লাউজের ভেতরে লুকাতে লাগল। আমি অমনি ওর হাত টেনে বার করার চেষ্টা করলাম।

জহুরা বাম হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে ডান দিয়ে আমার গালে টাস করে একটা চড় মারলো।

বললো, পাজি!

চড় খেয়েও আমার মনে দুঃখ হলো না। কারণ আমি সীমা লঙ্ঘন করেছি। লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেলাম। আর জহুরাও আমাকে চড় মেরে দাঁতে জিভ কেটে বলতে লাগলো, ভাই ভুল করে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দে। বলে বার বার আমার গালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আর বলল, ইশ্্! গালটা লাল হয়ে গেছে। পান্না এবার তুই আমাকে একটা চড় দে। দে ভাই। এই বলে আমার ডান হাত দিয়ে ওর গালে বার বার ছোঁয়াতে লাগলো।

বললাম, তুই পাগল হয়েছিস? তোকে আমি চড় দিতে পারব না।

তোকে চড় দিয়ে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি যে!

এতে কষ্টের কী আছে!

আমাদের মধ্যে এক মিনিটে সংঘটিত এই ছোট্ট এবং অতি তুচ্ছ ঘটনাটি আমরা দু’জন ব্যতীত পৃথিবীর আর কেউ দেখেনি ও জানে না। এই ঘটনার পর থেকে জহুরা এবং আমি যেন এক হয়ে একাকার হয়ে গেলাম। ওর নরম হাতের সেই চড়টি আমার শরীরের শিরায়-উপশিরায়, রক্তে কণায় কণায় মনে প্রাণে হৃদয়ের পরতে পরতে কী যে এক অপরূপ আনন্দের ঢেউ তুললো। তা আমি কাউকে বুঝাতে পারব না। মনে হতে লাগলো এই বিশাল পৃথিবীতে জহুরা আর আমি ব্যর্তত কেউ নেই, কিছু নেই। 

তারপর থেকে এ পর্যন্ত এ পৃথিবীতে কত ঘটনা ঘটেছে। কত বিপ্লব ঘটেছে, দেশে দেশে তার লেখাজোখা নেই। ভারত ভেঙে তিন খ- হয়েছে। কাশ্মীর জ্বলছে, ফিলিস্তিন জ্বলছে। চেচনিয়া, বসনিয়া, মিয়ানমারে কত রক্ত ঝরছে। কত দুর্ভিক্ষ কত খরা বান কত ভূমিকম্প হচ্ছে। কতজন মন্ত্রী হচ্ছে। ক’জন নোবেল পুরস্কার পাচ্ছে। কতজনের বাণিজ্য তরী সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে। এ ঘটনার আমার কাছে কোনো গুরুত্ব নেই। এসব ঘটনার একটিও আমার মনে রেখাপাত করতে পারেনি। আমার মনে রেখাপাত করে আছে, চাঁদের আকর্ষণের মত আমার বুকে ঢেউ তুলেছে জহুরাকে নিয়ে লেখা সেই প্রথম কবিতা। সেই কবিতার জন্যে পাওয়া প্রথম পুরস্কার জহুরার হাতের একটি জড়। সেই পুরস্কারের চেয়ে বড় পুরস্কার এ পর্যন্ত আমি আর পাইনি। আমি আজও ওর হাতের সেই পরশটি দারুণভাবে অনুভব করি। আমাকে ভাবায়। আমি আন্দোলিত হই।

সাহিত্যকর্মের জন্যে আমি কয়েকটি পুরস্কার ও সংবর্ধনা পেয়েছি। দেশের বিখ্যাত বিজ্ঞজন আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন, আমার কবিতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু জহুরার প্রথম প্রেরণাদায়ক বাণী- ‘তুই বড় কবি হবি’ আর সেই চড়টির মত আনন্দ আর কিছু কোথাও পাইনি।

জানি না জহুরা এখন কোথায় আছে। কেমন আছে। আমি তো ওকে নিয়ে ভাবছি। আমার যতসব গল্প কবিতা গান সবই তো ওর উৎসাহ-প্রেরণায় এবং ওকে নিয়েই। 

জহুরা কি এখন আমাকে ভাবে যেমন আমি ওকে ভাবছি। জহুরার কি আমার কথা মনে আছে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ