মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে মন্ত্রিসভার ভূমিকা ‘উদ্বেগজনক’

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তনে বিএনপি’র নতুন সদস্য সংগ্রহ ও সদস্যপদ নবায়ন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে মন্ত্রিসভার ভূমিকাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, গতকাল (সোমবার) মন্ত্রিসভায় কয়েকটা কমেন্ট করা হয়েছে এই রায় (ষোড়শ সংশোধনী বাতিল) সম্পর্কে, যেটা সত্যিই উদ্বেগজনক। যেখানে আমাদের সকলের আশা-ভরশার শেষস্থল বিচার বিভাগ, আপিল বিভাগ, সেখান থেকে যখন একটা রায় আসে, কিছু অবজারভেশন আসে তখন সমগ্র জাতি মেনে নেয় শুধু তা নয়, তারা সেটাকে মানতে চেষ্টা করে। সেখানে তারা (ক্ষমতাসীনরা) বলছেন যে জনমত তৈরি করবেন? কার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করবেন? এই ১৬ কোটি মানুষের মনের যে চিন্তা-ভাবনা যে রায়ের মধ্য দিয়ে এসেছে, যে অবজারভেশনের মধ্য দিয়ে এসেছে তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করবেন। জনগণ আপনাদের সাথে থাকবে না। জনগণ আপনাদের সাথে নেই বলেই আপনারা এই সমস্ত কথা বলছেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের উদ্যোগে বিএনপির সদস্য সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধন উপলক্ষে এই আলোচনা সভা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের দেয়া ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বার বার বলেছি, এই সরকারের নৈতিক কোনো অধিকার নেই ক্ষমতায় থাকার। কারণ যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা সরকার দাবি করেন সেই নির্বাচন তো হয়নি। ১৫৩ টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে কোনো নির্বাচনই হয়নি। এমনকি এই সরকারের প্রধানমন্ত্রীও ভোট দিতে যাননি।এই দেশের মানুষ জানে, সমগ্র বিশ্বের মানুষ তেমন জানে এটা একটা কারচুপি ও ভুল নির্বাচন হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা তাকে অত্যন্ত সজ্বন মানুষ হিসেবে জানি। আর ইদানিং খুব সন্দুর সুন্দর কথা বলছেন। তার কথা আমরা সবাই বেশ আমোদ পাই। উনি (ওবায়দুল কাদের) বলেছেন বিএনপি নাকী আদালত আর বিদেশীদের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় যেতে চায়। আমি বলতে চাই, কার কথা কে বলে? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এই খায়রুল হক (সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক) রায়ের ওপরে আপনারা ক্ষমতায় টিকে আছেন। এদেশের সব মানুষ জানে কোন বিদেশীদের কর্মতৎপরতায় আপনারা ক্ষমতায় টিকে আছেন। সুতরাং বিএনপিকে একথা বলবেন না।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে জনগণ। যতবার বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, জনগনের ভোটের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, অন্যকোনো পথে বিএনপি ক্ষমতায় আসেনি, বিএনপি অন্যকারো সঙ্গে আতাঁত করে, অন্যকারো সাথে সমঝোতা করে বা রাতের অন্ধকারে বিএনপি ক্ষমতায় আসেনি। বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং জনগনের সরকার গঠন করেছে।

দেশে এখন ‘দুঃসময়’ চলছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, খুব দুঃসময় আমাদের জন্য। গণতন্ত্রের সমস্ত মূল্যবোধগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, যখন সরকার সচেতনভাবে সেগুলো ধ্বংস করে দেয়, মানুষের অধিকার লুন্ঠন করে নেয়। সরকার তার অতীত যে আকাংখা একদলীয় ব্যবস্থা কায়েম করবে, সেই লক্ষ্যে তারা সকল ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের কাজে এগিয়ে চলেছে।

তিনি বলেন, আজকে কথা নেই বার্তা নেই মানুষকে তুলে নিয়ে যায়, গুম করে দেয়। ফরহাদ মযহারের মতো মানুষকে তুলে নিয়ে যায়, ইলিয়াস আলীর মতো নেতার আমরা খোঁজ পাই না। হাজার হাজার তরুনকে তারা হত্যা করেছে, শতাধিক মানুষকে তারা গুম করেছে, জোর করে তুলে নিয়ে গেছে। অস্বীকার করে আবার আমরা তুলে নিয়ে যাইনি। তিনি বলেন, এখন পর্য়ন্ত সারাদেশে আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৭৪ হাজার। ১০ লক্ষ্যের ওপরে আমাদের নেতা-কর্মীদেরকে আসামী করা হয়েছে। আমরা জরিপ করাচ্ছি। আমাদের লোকজন বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গিয়ে সেসব তথ্য তুলে নিয়ে আসছেন। প্রতিদিন নতুন নতুন করে মামলা দেয়া হচ্ছে। এটার উদ্দেশ্য একটাই, আমাদেরকে রাজনীতি থেকে দুরে সরিয়ে রাখা, আমাদেরকে দেশের জনগনের কল্যাণে জন্য কাজ করতে না দেয়া। এ্ অবস্থা থেকে উত্তরণে আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবানও জানান বিএনপি মহাসচিব।

মির্জা ফখরুল বলেন, একটি কথা আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে-এই সরকার এমনি এমনি ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। এই সরকারকে বাধ্য করতে হবে জনগনের যে দাবি সেই দাবি মেনে নেয়ার জন্যে। সেই দাবি কী? এখন জনগণ চায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। যে নির্বাচনে সকল দল অংশগ্রহন করবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সেই নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনে জনগনের আশা-আকাংখার প্রতিফলন হবে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে সহায়ক সরকার হতে হবে। অন্যথায় নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। লড়াই করে আমাদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে।

সহায়ক সরকার সংবিধানে নেই- ক্ষমতাসীন দলের এরকম বক্তব্যের জবাবে ফখরুল বলেন, আপনারা যখন কেয়ারটেকারের দাবি তুলেছিলেন তখন কী তা সংবিধানে ছিলো? তখন তো ছিলো না। সাহাবুদ্দিন সাহেব নিয়ে এসে যখন ব্যারিস্টার মওদুদ সাহেব উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন, তার জায়গায় তাকে নিয়ে আসা হলো তখন কী তা সংবিধানে ছিলো, না। মূল বিষয়টা কী? জনগণ যা চায়, প্রয়োজন, সেই প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে সবাই একমত হয়ে সেই পরিবর্তনগুলো আনতে হবে। সংবিধান কোনো বাইবেল নয় যে এটা পরিবর্তন করা যাবে না।

দলের সদস্য সংগ্রহ অভিযানে ‘ব্যাপক সাড়া’ পাওয়া যাচেছ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রামে-গঞ্জে মানুষ আসছে দলের সদস্য হতে। প্রতিটি মানুষ চায় এই সরকার কবে যাবে, বিএনপি সরকারে কবে আসবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ বলেন, আমি মর্মাহত হয়েছি আজকে (গতকাল) সব কাগজে দেখলাম যে, আমাদের ষোড়শ সংশোধনীর উপরে সুপ্রিম কোর্টের যে ঐতিহাসিক যুগান্তকারী একটি রায় দিয়েছেন, এই রায়ের ওপরে মন্ত্রিসভা আলোচনা করেছেন, সেখানে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং আরো আমি আতঙ্কিত বোধ করছি কারণ তারা বলেছেন যে তারা জনমত সৃষ্ট করবেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তারা (ক্ষমতাসীনরা) জনমত সৃষ্টি করবেন এই রায়ের বিরুদ্ধে। মানেটা কী? এর মানেটা হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তারা জনমত সৃষ্টি করতে চান। তারা তো তাহলে নিজেরাই প্রমাণ করে দিচ্ছেন তারা দেশে স্বাধীন বিচার বিভাগে বিশ্বাস করে না। আমি বলতে চাই যারা এই যুগান্তকারী রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন না, দেশে স্বাধীন বিচার বিভাগ চান না।

আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের চাকরির মেয়ার দুই বছর বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দুই বছর সরকার এক্সটেশন দিয়েছে উইথ আউট কনসালটেশন অব চিফ জাস্টিস। আজকে (সোমবার) এজে মোহাম্মদ আলী সাহেব রিট ফাইল করে এসেছেন। তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আর থাকলো কোথায়? তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না।

আলোচনা সভায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, অর্থমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে বক্তব্যে রেখে অর্থমন্ত্রী আদালত অবমাননা করেছেন। আমরা বলতে চাই, তিনদিনের মধ্যে অর্থমন্ত্রীকে মাফ চাইতে হবে। নইলে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হযেছে।

জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, অর্থমন্ত্রী রাবিশ মন্ত্রী, গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে সুয়েমোটোর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইসু করা হোকে। তিনি জুড়িশিয়ারিকে অপমান করেছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্ট শাখার সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলের পরিচালনায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার আমীনুল হক, আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এ জে মোহাম্মদ আলীসহ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ