মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মাদকের ভয়াবহতা ধারণার চেয়েও অধিক

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আমাদের ধারণা ছিল একশ্রেণির ছাত্র, বখাটে তরুণ বা উচ্ছন্নে যাওয়া যুবকরাই মাদকসেবন করে। কিন্তু না। আমাদের এমন ধারণা একদমই ভুল। মাদক নামক মোহনীয় বস্তু একশ্রেণির সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে কোনও কোনও পুলিশসদস্য, ডাক্তার, প্রফেসর, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যের মাঝেও ঢুকে পড়েছে বলে প্রকাশ। আর এ মাদকের বিস্তার ঘটছে প্রতিদিন।
সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রখ্যাত মনোরোগ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের কাছে এসে বলেন, ইয়াবা না খেলে তিনি স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না। অফিসের কাজ এলোমেলো হয়ে যায়। সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখতে পারেন না। এ অবস্থা থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাবেন এমন সাজেশন তিনি মনোরোগ বিজ্ঞানীর কাছে চেয়েছেন। -সূত্র: ইত্তেফাক, ৩১ জুলাই, ২০১৭।
ডা. মোহিত কামাল আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে ইয়াবা আসক্ত শতশত রোগী আসছেন। আমরা  জরিপ করে দেখেছি, এমন কোনও পেশার লোক নেই যে, সেখানে ইয়াবা আসক্ত নেই। এটা বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত।'
মাদকনিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সূত্রমতে প্রতিদিন মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে মাদকের নেশায় মত্ত এখন প্রায় কোটি মানুষ। প্রতিদিন নেশার পেছনে ব্যয় হয় ৬০ হাজার কোটি টাকা। শুধু ঢাকা মহানগরীতে হাজারেরও বেশি সেন্টারে প্রায় প্রকাশ্যে বিভিন্ন মাদক বেচাকেনা হয়। শুধু ইয়াবাই বিক্রি হয় ৩ লাখ পিস বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মাদকনিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, র‌্যাব মিলেও মাদকব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের ঠেকাতে পারছে না। দিনদিন এরা আরও দাপুটে হয়ে উঠছে। স্কুল-কলেজ, পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ অনেক বেকার যুবকযুবতী নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীও মাদকাসক্ত। এদের অনেকে এর ব্যবসায়ের সঙ্গেও জড়িত বলে মাদকনিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলাপ্রশাসন ও পুলিশের স্টিকার লাগানো গাড়িতেও মাদকদ্রব্য পরিবহন করা হয় বলে রিপোর্টে প্রকাশ। তার মানে মাদক ব্যবহারের ব্যাপকতা আরও বেশি। যা ধরা পড়ে তা ছিটেফোঁটা মাত্র।
ইয়াবা খেয়ে সাময়িক ভালো লাগে। তবে এর প্রতিক্রিয়া মারাত্মক। শারীরিক ও মানসিক শক্তি হ্রাস পায়। যৌনক্ষমতা স্থায়ীভাবে লোপ পায় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান। কোনওভাবেই ইয়াবা সরবরাহ রোধ করা যাচ্ছে না। দেশে ইয়াবা পাচারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গ্রুপ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট জড়িত বলে জানা গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামি ১৫ বছর পরে দেশে একজন সুস্থ-সবল তরুণও পাওয়া যাবে না। বিশেষজ্ঞরা এমন আশঙ্কাই ব্যক্ত করেছেন। দেশের সব পেশার লোক মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই মাদকাসক্তের সংখ্যা বেশি। টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবা ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপ করেও কাজ হচ্ছে না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গবেষণা রিপোর্ট অনুসারে থাই ভাষায় ইয়াবা হচ্ছে ক্রেজি মেডিসিন বা পাগলা দাওয়াই। এটি হেরোইনের চাইতেও মারাত্মক। প্রথমে কৌতূহলবশত দু’-একবার ইয়াবা সেবন করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। মানে আসক্ত হয়ে পড়ে। আর ছাড়তে পারে না। স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির ছাত্রদের সঙ্গে ছাত্রীদেরও অনেকে ইয়াবাসহ নানা মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ইয়াবার সঙ্গে ফেনসিডিল, মারিজুয়ানাসহ গাঁজাও কম যায় না। ক্রমান্বয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে মাদকদ্রব্যের অবৈধ বাণিজ্য। ৪৭ টি অভ্যন্তরীণ রুট ও রেলপথ দিয়ে মাদক ঢুকছে দেশে। বড় বড় সিন্ডিকেট এ ব্যবসায়ে জড়িত। ক্ষমতাসীন ও এর বাইরে থাকা দলসমূহের অনেকেই মাদকবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
মাদকতাসক্ত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। অনেকেই একাডেমিক ইয়ার লস করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও এরা বাড়ি যায় না। নানা অজুহাতে হলে পড়ে থাকে। ধীরেধীরে পরিবার-পরিজন থেকেও মাদকাসক্তরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে অভিভাবকরাও দুশ্চিন্তায় পড়ছেন কলেজ-ভার্সিটিতে অধ্যয়নরত সন্তানদের নিয়ে। মাদক শুধু দেশের অর্থনীতিকেই পঙ্গু করছে না। দেশের তারুণ্য ধ্বংস করে ফেলছে। মেধাহীন বানাচ্ছে জাতি ও আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন) তৌফিক উদ্দিন আহমদ জানান, ইয়াবা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে। মিয়ানমার সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও কাজ হচ্ছে না। তবুও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি জানান, গতবছর দুই কোটি পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে দীর্ঘদিন কাজ করছেন এমন একজন অফিসার জানান, মিয়ানমার আমাদের দেশ ধ্বংস ও মেধাশূন্য করবার জন্য ইয়াবা সরবরাহ করছে। আর এটা করা হচ্ছে জেনেবুঝেই। এই কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, পরিস্থিতি এমনই যে, আর দেড় দশক পর হয়তো আমাদের দেশে সুস্থ ও স্বাভাবিক তরুণ একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবস্থা কতটা ভয়াবহ তা আঁচ করা যায় এই কর্মকর্তার আশঙ্কা থেকেই।
মিয়ানমারে ইয়াবার ছড়াছড়ি ছিল। সেখানে কিছুসংখ্যক মাদকব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডে দেয়াতে এখন প্রায় থেমে গেছে। সেখানে সম্প্রতি আইন হয়েছে, কারুর কাছে ২০ টির কম ইয়াবা পাওয়া গেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এর অধিক পাওয়া গেলেই মৃত্যুদণ্ড। এর ফলে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা উধাও। এদেশেও এমন করা দরকার বলে ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।
বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যানুসারে, টেকনাফ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশের থানা ও ফাঁড়িগুলোতে দায়িত্বরতদের বেশ কয়েকজন পুলিশ ইয়াবা ব্যবসায়ে জড়িত। তাদের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশের থানা এমনকি ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ডিবির কতিপয় পুলিশও এই কাজে জড়িত। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২১ জুন ফেনিতে নিজের প্রাইভেটকারে ঢাকায় ইয়াবা নিয়ে আসার সময় ৬ লাখ ৮০ হাজার পিসসহ র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন ডিএমপি’র স্পেশাল ব্রাঞ্চের এস আই মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। ওই ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ইয়াবাসমেত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ধরা পড়েছেন।Ñসূত্র ইত্তেফাক: ৩১ জুন, ২০১৭।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশের অভ্যন্তরে ইয়াবা প্রবেশের জন্য শুধু মিয়ানমারকেই দায়ী করলেন। আরেকটি প্রতিবেশী দেশ থেকে যেন কোনও মাদকই আসে না এদেশে। অথচ বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে হাজার হাজার ফেনসিডিল কারখানা গড়ে উঠেছে শুধু বাংলাদেশের মার্কেট ধরবার জন্য। এ খবর যেন তাদের জানাই নেই এমন মানসিকতা। মনে হয় ভাশুরের নাম নিতে মানা আর কী ! তবে সম্প্রতি সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজেও মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলেছেন।
সম্প্রতি ইয়াবার প্রতি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের নজর বেশি। ইয়াবা ছাড়াও অনেকরকম মাদক সেবন করে নেশাখোরেরা। এর মধ্যে হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা বা ভাঙ উল্লেখযোগ্য। টিকটিকির লেজও নাকি পুড়িয়ে খেলে ভালো নেশা হয় বলে বিভিন্ন সময় নিউজে দেখেছি। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল প্রভৃতি থেকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাবার জন্য টিকটিকির লেজপোড়া খেলে নেশা হয় এমন খবর প্রচার হয় কিনা, কে জানে?
আমি প্রতিদিন কারওয়ান বাজারের পেছনের রেললাইন দিয়ে হেঁটে অফিস যাতায়াতের সময় রেলওয়ে বস্তিতে প্রকাশ্যে গাঁজার পসরা বসতে দেখি। দিনেদুপুরে গাঁজা বেচাকেনা হয়। কই, এখানেতো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কাউকে দেখা যায় না? তাছাড়া কারওয়ান বাজার রেলওয়ে বস্তি কোনও গোপন জায়গাও নয় যে, পুলিশ বা অন্যরা কেউ এটা চেনে না।
আর হ্যাঁ, তামাকও একটা মাদকদ্রব্য। বিড়ি,  সিগারেট, জর্দা, গুল এগুলো তামাক থেকেই তৈরি হয়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা তামাককেও মাদক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ঘাতক ব্যাধি মানবদেহে সৃষ্টি হয় তামাকসেবনের ফলে। লাখ লাখ মানুষ মারা যায় ধূমপানজনিত রোগে। অথচ আমাদের আইনে তামাককে অন্যান্য মাদকের মতো গণ্য করা হয় না। কিন্তু কেন? 
যাই হোক, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের রিপোর্ট অনুসারে আগামি দেড় দশকের পর দেশে যদি সত্যি সত্যি একজন তরুণও সুস্থসবল না পাওয়া যায়, সবাই যদি মাদকের কবলে চলে যায়, তাহলে এদেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কী হবে তা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ