রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ফল বিপর্যয়ের গলদ কোথায়

তোফাজ্জল বিন আমীন : হিংসা প্রতিহিংসার নোংরা রাজনীতির খেলা সর্বত্র বিরাজমান। এ খেলার শুরুটা নিরুত্তাপ হলেও শেষ পরিণতি খুবই ভয়াবহ হয় এটা ক্ষমতায় থাকলে অনুধাবন করা যায় না। ক্ষমতার বাহিরে থাকা দলগুলো এখন হারে হারে উপলব্ধি করে। দেশে কার্যত কোন বিরোধী দল বা জোটের আন্দোলন কর্মসূচী তেমন নেই বললেই চলে। সর্বত্র বিরাজ করছে হাহাকার আর বুকফাটা আর্তনাদ। ন্যায অধিকারের কথা বলতে গিয়ে হাজারো শিক্ষার্থীর রক্ত ঝরছে শাহবাগে। কথিত গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা দিনের পর দিন ব্যারিকেড দিয়ে শাহবাগের দুই দিকের রাস্তাকে বন্ধ করে দিয়েছিল। অথচ তখন কোন সমস্যা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত ঢাকার ৭টি কলেজের শিক্ষার্থীরা রুটিনসহ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার দাবিতে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনের রাস্তায় অবস্থান কর্মসূচী পালন করতে চেয়েছিল,কিন্তু পারেনি। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস আর লাঠিপেটা করেছে। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন সরকার হঠানো কিংবা বিরোধী দলের পক্ষের কোন আন্দোলন ছিল না। কিন্তু সরকারের আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর কিছু অতি উৎসাহি পুলিশ শিক্ষার্থীদের ন্যায অধিকারকে ভুলুণ্ঠিত করতে গিয়ে সিদ্দিকুর রহমানের দু’চোখকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। সিদ্দিকুর রহমান তিতুমীর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরি করবে। মমতাময়ী মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে। মাকে সে দু বছর ধৈর্য ধরতে বলেছিল। কিন্তু সিদ্দিকুরের স্বপ্ন এখন ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। গত শনিবার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসকরা তার দু’চোখের অপারেশন করেছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তার চোখের আলো ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। একজন মেধাবী, উদ্যমী ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণের করুণ পরিণতি সত্যিই বেদনাদায়ক। মহান আরশের অধিপতির নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন তাঁর দু’চোখের আলো ফিরিয়ে দেন। আর অন্যায়ভাবে যারা তাঁর চোখের আলোকে চিরতরে নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের বিবেক যেন জাগ্রত হয় এমনটাই প্রত্যাশা-ই করি।
গত ২৩ জুলাই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে পাসের হার গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন হয়েছে। এই ফলবিপর্যয়ের পেছনে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীরা দায়ী তা কিন্তু নয়! বিপর্যয়ের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একটি দেশের সরকার যখন শিক্ষার মানের চেয়ে পাসকে বেশি প্রাধান্য দেয় তখন শিক্ষার মান এমনিতে তলানীতে চলে যায়। মহাজোট সরকারের আমলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা নিশ্চয় পাঠকেরা এখনও ভূলে যায়নি। আর ফল বিপর্যয়ের বিষয়টি নতুন নয়! ২০১৫ সালের মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় ফল বিপর্যয় হয়েছিল। সে বছর ৬৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ পাস করেছিল। ওই সময় ফল খারাপ হওয়ার জন্যে বিরোধী জোটের আন্দোলনকে খোদ প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী দায়ী করেছিলেন। অথচ এবার প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, কত শতাংশ পাস করছে সেটা বড় বিষয় নয়! শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় মনোযোগী হওয়ার কথা বলেছেন। পাশাপাশি পাস-ফেল নিয়ে না ভেবে শিক্ষার মান বাড়াতে নজর দেয়ার কথা বললেন। যাক পরে হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বোধোদয় হয়েছে এটাই এখন সবচেয়ে বড় কথা। রাজনৈতিক দল ক্ষমতার আসবে আবার ক্ষমতার বাহিরে যাবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। শিক্ষাকে রাজনীতির পণ্য বানানো উচিত নয়। ২০১৪ সালে যখন ফল বিপর্যয় দেখা দেয় তখন আওয়ামী সরকার বলেছিল বিএনপি জামায়াতের আন্দোলনের কারণে ফল বিপর্যয় হয়েছে। কিন্তু এবার তো বিএনপি জামায়াতের কোন আন্দোলন কিংবা হরতালের কর্মসূচী নেই,তাহলে কেন এই ফল বিপর্যয় হয়েছে। এই সরকারের আমলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা যেমন ছিল নজিরবিহীন। তেমনি মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় ২০১৪ সালে ১০ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৯১.৩৪ শতাংশ ছিল যা অবিশ্বাস্য সাফল্য হিসেবে অনেকে দেখেছেন। সে সময় মোট জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন। ক্ষমতার রাজনীতিতে সুস্থ প্রতিযোগীতা থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু যখন দেখি শিক্ষা নিয়ে নোংরা প্রতিযোগীতা করা হয় তখন দুঃখবোধ হয়। আওয়ামী সরকারের আমলে জিপিএ ৫  জ্যামিতিক হারে বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়েনি এটা এবারের ফল বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে আবারো প্রমাণিত হল। ৯০ শতাংশের ওপরে (পারলে ১০০ শতাংশ) পাসের হার দেখানোর জন্য যে অশুভ প্রতিযোগিতায় সরকার লিপ্ত তা মূলত শিক্ষার দুর্বলতম দিককে নির্দেশ করে। সংবাদের পাতায় এমন তথ্যও মুদ্রিত হয়েছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দু’-একজন ছাড়া কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এটা শিক্ষার শোচনীয় অবমানই প্রমাণ করে। পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মানে তার কোনো প্রতিফলন না ঘটায় সর্বমহলে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নতুন শিক্ষা ও পরীক্ষাপদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকে পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়া নিয়ে নানা ধরনের নাটকীয়তা প্রতিফলিত হয়েছে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কমে গেছে। এবার গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গতবার এই হার ছিল ৭২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এবার আট বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৪২ জন। গতবার পেয়েছিল ৪৮ হাজার ৯৫০ জন। অর্থাৎ পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়ার হার উভয়ই কমেছে।
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াইতে গলদ থাকলে সেখানে সুশিক্ষিত জাতি খুঁজে পাওয়া যায় না। দুঃখজনক হলে সত্য ব্রিটিশ সরকারের আমলে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থা আজও বিদ্যমান চালু রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। কারণ সংবাদের পাতায় তো এও মুদ্রিত হয়েছে যে, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফ  থেকে বলা হয়েছে এক্সামিনারদেরকে, খাতায় কিছু লেখা থাকলেই তাকে পাশ মার্কস দিতে হবে। ব্রিটিশের প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার আমরা কড়া সমালোচনা করতে পারি। কিন্তু তাদের শাসনামলে এই কথা শুনিনি যে,সাদা খাতা কালো করতে পারলেই মার্কস পাবে। যা এই সরকারের আমলে এ জাতিকে দেখতে হয়েছে। সরকারের প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা অনেকটা ফরাসি নাট্যকার মলিয়ার এর গল্পের মতো। “বিশ্ব বিখ্যাত ফরাসি নাট্যকার এবং হাস্যরসিক মঁলিয়ার (১৬২২-১৬৭৩) একবার সেরবোর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে গল্প শোনাচ্ছিলেন। গল্পটা এরকম “এক গ-মূর্খ ধনী জমিদার প্যারিস থেকে অল্পদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে এসেছেন। নিজের প্রিয় ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে তিনি গ্রামে বেড়াতে বের হয়েছেন। রাস্তার ধারে এক নতুন বাড়ি দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। সেখানে অনেক ছেলেমেয়ের ভিড় দেখে তার কৌতূহল হলো। একজন ছেলেকে ডেকে তিনি রাজকীয় গাম্ভীর্যভাবে জিজ্ঞেস করলেন‘ এখানে কী হচ্ছে? ছেলেটি বললো এটা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে হাজার ফ্রা (ফরাসী মুদ্রা) জমা দিলে পিএইচডি ডিগ্রি পাওয়া যায়। যারা হাতে বা পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে টিপছাপ দিতে পারে তারা এক হাজার ফ্রা জমা দিলেই ডিগ্রি পেয়ে যায়। জমিদার তো বেজায় খুশি হয়ে ভেতরে গেলেন। কড়কড়ে নতুন একহাজার ফ্রা জমা দিয়ে ভিসি’র কাছ থেকে টিপছাপ দিয়ে ডিগ্রি নিয়ে এলেন। বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ তার মনে হলো হায়! আমি কি বোকা, আমার ঘোড়ার জন্যও তো একটি ডিগ্রি আনতে পারতাম। যেই ভাবা সেই কাজ,ফিরে গিয়ে ভিসিকে বললেন,এই নিন আরো একহাজার ফ্রা আমার ঘোড়া আশা করি অন্তত পায়ে টিপছাপ দিতে পারবে,সুতরাং তাকেও একটি ডিগ্রি দিন। কিছুক্ষণ জমিদারের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে ভিসি বললেন,স্যরি আমরা শুধু গাধাদেরই ডক্টরেট দিয়ে থাকি,ঘোড়াদের দিই না।’’ সরকারের উচিত নামসর্বস্ব সাটিফিকেট দেয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত শিক্ষার প্রতি নজর দেয়া। শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রবর্তন করার কারনে-ই কেবল ফল বিপর্যয় হয়েছে এটা বলব না। তবে এই দীর্ঘ সময়েরও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারেনি বলেই বিপর্যয় হয়েছে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এবারের পরীক্ষায় হাজারো শিক্ষার্থীকে ইংরেজি ডুবিয়েছে। বলা বাহুল্য গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বরাবরই ইংরেজি ভীতি থাকে। এই ভীতি দূর করার প্রয়াসে রাষ্ট্রের উচিত  ইংরেজি শিক্ষকের অভাব দূর করা।
এবারের ফল বিপর্যয়ের যতগুলো কারণ উঠে এসেছে সেগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়। বিশেষ করে দক্ষ শিক্ষকের সংকট সবার আগে দূর করতে হবে। ইংরেজি বিষয়ে কেন শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করে সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে ফল বিপর্যয়কে ঠেকানোর জন্য সবার আগে লেজুড় বৃত্তি শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো উচিত। শিক্ষাদান পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষকদের অব্যাহত প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রাখতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ এর ক্ষেত্রে যোগ্যদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয়। একশ্রেণীর অভিভাবক রয়েছেন যারা সন্তানের জিপিএ ৫ পাওয়ার জন্যে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করতে কুন্ঠাবোধ করেন না, এই মানসিকতা আমাদের অভিভাবকদের পরিহার করতে হবে। কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার আগে প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান নিশ্চিত করা। বাজারের নোট বইগাইড বই বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে এমনটি বিশ্বাস করি না। একটা সময় তো নোট বই গাইড বইয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। গাইডবই নির্ভরশীলতা পরিহার করতে পারলে ফল বিপর্যয় অনেকটা রোধ করা সম্ভব হবে। জিপিএ ৫ পাওয়ার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সুশিক্ষার বিস্তার ঘটনো,যাতে করে দেশ একজন আদর্শ সুনাগরিক পায়। এবারের পরীক্ষায় যারা কৃতকার্য হয়েছে সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন। পাশাপাশি যারা অকৃতকার্য হয়েছে তাদের প্রতি রইল সমবেদনা। তবে এই ফল বিপর্যয়ের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খতিয়ে দেখার জন্যে সরকারকে অনুরোধ জানাচ্ছি। যাতে করে আগামী দিনের কান্ডারিরা অন্ধকারের নিমজ্জিত না হয়ে পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ