মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রসঙ্গ বন্যার জন্য প্রস্তুতি

আশিকুল হামিদ : পাঠকদের নিশ্চয়ই ফেসবুক সম্পর্কে কমবেশি ধারণা আছে। অনেকে সম্ভবত ফেসবুকে রয়েছেন, ফেসবুক দেখেনও মাঝেমধ্যে। সত্যি বলতে কি, বিশেষ করে বিগত কয়েক মাসে আওয়ামী লীগ সরকারই ফেসবুককে ‘জনপ্রিয়’ করে তুলেছে। কখনো ফেসবুক বন্ধ করে দিয়ে, কখনো ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে আবার কখনো বা এর-ওর অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়ে সরকার এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছে- যখন সাধারণ মানুষও ফেসবুক ব্যাপারটা কি তা জানার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আমার নিজের কথা অবশ্য অন্য রকম। ফেসবুক আমার কাছে পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সহজ মাধ্যম। এখানে এমন অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি, যাদের সঙ্গে বহু বছর দেখা-সাক্ষাৎ হয় না কিংবা হয়নি। অনেক হাসি-তামাশা ও মজাও করা যায়। আমার মতে কে কিভাবে ফেসবুককে ব্যবহার করবে- এটা যার যার ইচ্ছা বা নিয়তের ব্যাপার।
কিন্তু এই ইচ্ছা বা নিয়তকেও আবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে নেমে পড়েছে সরকার। এ ব্যাপারে কাজে লাগানো হচ্ছে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ও ব্যাপকভাবে নিন্দিত ৫৭ ধারাকে। ক’দিন আগের একটি ঘটনার কথাই উল্লেখ করা যাক। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ সম্প্রতি খুলনার ডুমুরিয়া অঞ্চলে গরীব মানুষের মধ্যে কিছু হাঁস-মুরগি এবং ছাগল বিতরণ করেছিলেন। সেগুলোর মধ্য থেকে একটি ছাগল মারা গেছে। খবরটি একজন ফেসবুকে ছেড়েছিল। কিন্তু এতে ছাগলের পরিবর্তে প্রতিমন্ত্রী নারায়ণের ছবি দেয়া হয়েছিল। প্রতিমন্ত্রীর ছবিযুক্ত সে খবরটিই ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন একটি দৈনিকের ডুমুরিয়া প্রতিনিধি সাংবাদিক আবদুল লতিফ মোড়ল। কেন তিনি শেয়ার করলেন- এই অভিযোগে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা ঠুকেছিল যশোরের একটি দৈনিকের ডুমুরিয়া প্রতিনিধি সুব্রত ফৌজদার। এককালে গলা কাটা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এই সুব্রত ফৌজদার প্রতিমন্ত্রী নারায়ণের ‘হাত ধরে’ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে এবং নামে সাংবাদিক হলেও একজন দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে ‘বিখ্যাত’ হয়ে উঠেছে বলে ডুমুরিয়ার থানা পুলিশও জবর তৎপরতা দেখিয়েছে। গভীর রাতে গিয়ে গ্রেফতার করেছে সাংবাদিক আবদুল লতিফ মোড়লকে।
ঘটনাটি সারা দেশে প্রতিক্রিয়া ঘটায়, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মূলত এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই পুলিশের আইজি নির্দেশনা জারি করেছেন, তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে মামলা গ্রহণ করতে হলে সকল থানাকেই তার অনুমতি নিতে হবে। গত বুধবার খুলনার জুডিশিয়াল আদালত সাংবাদিক আবদুল লতিফ মোড়লকে জামিন মঞ্জুর করেছেন। ওদিকে সাংবাদিক হয়েও একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা দায়েরের মতো ‘গর্হিত’ কাজ করার অভিযোগে যশোরের দৈনিকটির কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে সুব্রত ফৌজদারকে।
ভূমিকা বা প্রাক-কথন কিছুটা দীর্ঘ হলেও পাঠকরা আবার ভেবে বসবেন না যে, আজ ফেসবুক সম্পর্কে লেকচার দিতে বসেছি। তবে বিশেষ কারণে শুরুটা ফেসবুক থেকেই করতে হয়েছে। এখানে বিচিত্র, এমনকি রাজনৈতিক অর্থে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অনেক কিছুও দেখা যায়। দেখতে হয়। জানা যায় অনেক ভীতিকর তথ্যও। যেমন ক’দিন আগে এক রসিকজন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং এদেশের কারো কারো ‘দিদিমনি’ মমতা ব্যানার্জির একটি কার্টুন ধরনের ছবি ছেড়েছেন ফেসবুকে। এতে দেখা গেছে, মমতা তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রেখেছেন- যার অর্থ, অন্যদের তিনি ‘চুপ’ থাকতে বলেছেন। কারণও ব্যাখ্যা করেছেন ওই রসিকজন। মমতার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, শুষ্ক মওসুমে পানি না দিলেও ভরা বর্ষার সময় তো ঠিকই দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশ ডুবে গেছে বলে যারা হইচই করছে- তাদের উদ্দেশেই মমতা চুপ থাকার হুকুম বা নির্দেশনা দিয়েছেন। ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলেছেন, ‘চুপ, একদম চুপ!’
ফেসবুকে মমতা ব্যানার্জির ছবিটির সঙ্গে মন্তব্য দেখার ও পড়ার পর অনেকেরই কিন্তু জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কথা মনে পড়ে গেছে। সরকার কোনো ব্যক্তি হলে তো বটেই, ওই ব্যক্তি যদি এরশাদের মতো ‘বিখ্যাত’ একজন কবি হতেন, তাহলেও সম্ভবত জিজ্ঞাসা কবা হতো, এখন ‘নীরব কেন কবি?’ এর কারণ, কিছুটা বয়স্ক পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে, ১৯৮৮ সালের বন্যায় সারা দেশ যখন ভাসছিল এবং মানুষ যখন চরম বিপদের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল, এরশাদ তখন বন্যার ওপর একটি গান লিখে এবং সেই গানটি রেডিও-টিলিভিশনে রাতদিন প্রচার করিয়ে ‘বিপুল জনপ্রিয়তা’ অর্জন করেছিলেন! রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টিকে বন্যাদুর্গত জনগণের সঙ্গে তামাশা, উপহাস- এমনকি অমানবিক ফাজলামো হিসেবে চিহ্নিত করে নিন্দা জানানো হলেও ‘কবি ও গীতিকার’ এরশাদকে নিবৃত্ত করার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ, তিনি তখনও দেশের প্রেসিডেন্ট। আর এরশাদ যে বন্দুক দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সেকথা তো সবারই জানা রয়েছে!
মমতা ব্যানার্জির পাশাপাশি সেই সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কথাটা সম্প্রতি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ- এরশাদের পার্টির বদৌলতে যিনি মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। আষাঢ়ের পর শ্রাবণের প্রবল বর্ষণে রাজধানী ঢাকা যখন অচল, এমনকি অকার্যকর নগরীতে পরিণত হয়েছিল, সারা দেশই যখন বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল, তেমন এক কঠিন সময়ে অনেকাংশে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর স্টাইলে আমাদের (!) পানিসম্পদমন্ত্রী  জানান দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আসল বন্যা’ শুরু হবে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে! কথাটা শুনে রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় বলা হয়েছে, মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমন সুনির্দিষ্টভাবেই সময় সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন, যা থেকে ধরে নেয়া যায়, ‘বন্ধুরাষ্ট্রের’ কর্তা ব্যক্তিরা তাকে আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছেন, ঠিক কখন তারা বিভিন্ন বাঁধের সকল গেট খুলে দেবেন এবং কখন বন্যায় ভেসে যাবে বাংলাদেশ!
শুনতে ব্যঙ্গাত্মক মনে হলেও কথাটা কিন্তু কেবলই কথার কথা নয়। এর কারণ, আষাঢ়ের প্রবল বর্ষণ এবং বর্ষা মওসুমের কারণে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা যখন প্রাকৃতিক নিয়মে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল, লাখ লাখ খাদ্য ও বস্ত্রহীন বিপন্ন মানুষ যখন আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল ঠিক তেমন এক ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে গত মাস জুলাইয়ে ভারত হঠাৎ তিস্তা নদীকেন্দ্রিক গজলডোবা বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দিয়েছিল। এর ফলে ধেয়ে এসেছিল ‘উজানের’ পানি। আর সে পানিতে তলিয়ে গেছে নীলফামারী ও কুড়িগ্রামসহ দেশের উত্তর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো। এখনো তলিয়ে যাচ্ছে ওই অঞ্চলের বহু নতুন নতুন এলাকা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর খবরে তখন জানানো হয়েছিল, দিনের পর দিন ধরে টানা বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ী ঢলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র ও বরাক নদের উপত্যকায় ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়ে আসাম রাজ্য জুড়েও। গত ৮ জুলাই পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটলে ভারতের সেচ দফতর হলুদ সতর্কতা সংকেত জারি করে। পরদিন অর্থাৎ ৯ জুলাই তারিখেই গজলডোবা বাঁধের গেটগুলো খুলে দেয় ভারত। এর ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নীলফামারীর ডিমলা, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা ও কালিগঞ্জ উপজেলার সব গ্রামের পাশাপাশি অসংখ্য চরও উজানের পানির তলে তলিয়ে যায়। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। খবরে বলা হয়েছিল, ভারত যদি গজলডোবা বাঁধের গেটগুলো বন্ধ না করে তাহলে পরিস্থিতির ভয়ংকর অবনতি ঘটবে এবং আশপাশের আরো অনেক জেলা ভারতের বন্যা ও ঢলের পানিতে তলিয়ে যাবে। বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশেই।
প্রসঙ্গক্রমে ১৯৯৮ সালে নির্মিত গজলডোবা বাঁধের ইতিহাস স্মরণ করা দরকার। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভারতে বন্যা হলে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজের ৬০ কিলোমিটার উজানে নির্মিত এ বাঁধটির ৫৪টি গেটই খুলে দেয় ‘বন্ধুরাষ্ট্র’। এর ফলে বন্যায় তলিয়ে যায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। আবার শুষ্ক মওসুমে ভারত একই বাঁধের গেটগুলোয় তালা লাগিয়ে দেয়। তখন গজলডোবার উজানে তিস্তা-মহানন্দা খালের মাধ্যমে দুই হাজার ৯১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের ভেতরে পানি পবেশ করে। এই বিপুল পরিমাণ পানি দিয়ে বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, কুচবিহার ও মালদহ জেলার দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়। অর্থাৎ গজলডোবা বাঁধের সাহায্যে ভারত একদিকে বর্ষার মওসুমে বাংলাদেশকে বন্যার পানিতে ডুবিয়ে দেয়, অন্যদিকে শুষ্ক মওসুমে পানিবঞ্চিত করে নিজেই শুধু লাভবান হয়। একযোগে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার বানায় বাংলাদেশকে। বলা হচ্ছে, মূলত এজন্যই পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ভারত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে সুকৌশলে বিরত রয়েছে।
ভারতের এই কৌশলকে পানি আগ্রাসন ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে শুধু নয়, ফারাক্কাসহ অন্য অসংখ্য বাঁধ এবং খাল ও নদীর মাধ্যমেও ভারত বাংলাদেশকে ক্ষয়ক্ষতির শিকার বানিয়ে এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা উল্লেখ করতেই হবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। দেশপ্রেমিকদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ রাখা হয়নি। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে ভারত একদিকে শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে, অন্যদিকে বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বন্যার সময় বন্যার পানিতে পুরো দেশকে ভাসিয়ে দিয়েছে। ভারত ফারাক্কাসহ বিভিন্ন বাঁধের গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে তলিয়ে দেয়ার পরও সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘উজান’ দেশের পানিতে ‘ভাটির’ দেশ বাংলাদেশকে সব সময় নাকি ‘ডুবতেই’ হবে! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেবার মন্দ শোনাননি। যেমন ৩০ বছর মেয়াদী পাবিণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পর ১৯৯৭ সালের মার্চেই ভারত যখন বাংলাদেশকে কম হিস্যা দিতে শুরু করেছিল, তখন যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির ওপর তো কারো হাত নেই!’ ভারতের ব্যাপারে এমনটাই আওয়ামী লীগ সরকারের মনোভাব।
ভারতও এ অবস্থার সুযোগ নিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। যেমন ১৯৯৮ সালের পর ২০০৪ সালের জুলাই মাসেও ভারতের ছেড়ে দেয়া পানিতেই সারাদেশ তলিয়ে গিয়েছিল। বন্যাও হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী। কারণ, সেবার বৃষ্টি ও বন্যা শুরু হওয়ার পর ভারত ফারাক্কা বাঁধের ১০৫টি গেটই খুলে দিয়েছিল। ভারত সেই সাথে ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত বরাখ ও গজলডোবাসহ অন্য সকল বাঁধের গেট খুলে দিয়েও বাংলাদেশকে বিপন্ন করেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ভারত বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। ভারতের এই স্বার্থসর্বস্বতার কারণে কোনো মৌসুমেই বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি, এখনো পাচ্ছে না। অভিন্ন ও সীমান্তবর্তী নদ-নদীর ব্যাপারেও ভারত একই নীতি ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এসব নদ-নদীর কোনো একটিতেই ভারত বাংলাদেশকে বাঁধ নির্মাণ বা ড্রেজিং করতে দিচ্ছে না। ভারতের গজলডোবা বাঁধের কারণে যমুনার পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। তিস্তা, মহানন্দা, মনু, কোদলা, খোয়াই, গোমতি ও মুহুরিসহ আরো অন্তত ১৫টি নদ-নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। এভাবে ফারাক্কার পাশাপাশি ছোট-বড় বিভিন্ন বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় অভিন্ন ৫৪টির মধ্যে ৪০টি নদ-নদী শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। আবার পুরো বাংলাদেশকে ডুবিয়ে দিচ্ছে বর্ষার মওসুমে। বর্তমান সময়েও বাংলাদেশ ভারতের একই আগ্রাসী নীতি ও কৌশলেরই অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছে।
এই সর্বব্যাপী ক্ষয়ক্ষতি থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়া দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে তেমনটা আশা করা যায় না বলে এ ব্যাপারে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অমন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভবও। কারণ, এ আইনেই বলা আছে, উজানের দেশ ভাটির দেশকে শুষ্ক মওসুমে পানি বঞ্চিত যেমন করতে পারবে না তেমনি বর্ষা মওসুমে পারবে না বন্যায় তলিয়ে দিতেও। আন্তর্জাতিক আইনের এই সুবিধা নিয়ে স্পেন ও পাকিস্তানসহ অনেক রাষ্ট্রই বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে পানির অধিকার আদায় করেছে। সে জন্যই এখন বেশি দরকার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, সরকার যাতে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করতে বাধ্য হয়।
বর্তমান পর্যায়ে অবশ্য তেমন আশা করার উপায় নেই। কারণ, ‘বন্ধুরাষ্ট্রের’ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়, এমনকি দেশের ভয়ংকর বিপদের মধ্যেও বিস্ময়কর নমনীয়তা দেখিয়ে এসেছে। সামনের দিনগুলোতেও যে একই নমনীয়তা দেখানো হবে- সে ব্যাপারেই আসলে আগাম জানান দিয়ে রেখেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। অতএব চলতি আগস্টেই আরো একবার সমগ্র বাংলাদেশকে ‘উজানের’ পানিতে ডুবতে হবে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশিরা যাতে কোনো কথা না বলেন এবং প্রতিবাদ না জানান- সে জন্যই মমতা ব্যানার্জিও ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ‘হুকুম’ দিয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই ‘হুকুম’ এসেছে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিদের উদ্দেশে। আমরা জানি না, মমতার ওই ছবিটি ছড়িয়ে দেয়ার ও শেয়ার করার জন্য তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কাউকে জেলে ঢোকানো হবে কি না! তবে এটুকু বলতেই হবে, আমাদের এখন ভয়ংকর এবং দীর্ঘমেয়াদী বন্যার জন্য প্রস্তুতি নেয়া দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ