মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মানুষ ‘সম্ভব নয়’ শুনতে চায় না

বর্তমান সরকারের আমলে ‘সম্ভব নয়’ কথাটার সঙ্গে জনগণকে বিভিন্ন সময়ে পরিচিত হতে হয়েছে। যেমন কিছুদিন আগেই চিকুনগুনিয়া জ্বর যখন রাজধানীতে মহামারির আকার নিয়েছিল, বিপন্ন রাজধানীবাসী যখন চিকিৎসা ও সাহায্যের জন্য সরকার এবং দুই সিটি করপোরেশনের দিকে অনেক আশায় তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল, তেমন এক ভয়ংকর অবস্থার মধ্যেও ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক বলে বসেছিলেন, ঘরে ঘরে গিয়ে মশা মারা ও নির্মূল করা তার পক্ষে ‘সম্ভব নয়’! সঙ্গে সঙ্গে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কারণ, মেয়র সাহেবকে ঘরে ঘরে বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মশা মারার কথা বলা হয়নি। দাবি জানানো হয়েছিল প্রতিটি এলাকায় ওষুধ ছিটিয়ে মশা নির্মূল এবং মশার বিস্তার রোধ করার জন্য। অন্যদিকে ঘরে ঘরে যাওয়ার এবং ‘সম্ভব নয়’ ধরনের কথার মাধ্যমে মানুষের চরম দুঃসময়েও রীতিমতো ব্যঙ্গ-তামাশা করেছিলেন মেয়র আনিসুল হক। কথার খেসারত অবশ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দিতে হয়েছিল। তাকে দিয়ে মাফ চাইয়ে ছেড়েছিল রাজধানীবাসী। 

একজন মেয়র কেবল নন, বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও কম যাচ্ছেন না। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে লক্ষ-হাজার কোটি টাকার বাজেট দেয়ার এবং বছর শেষে ব্যর্থতার নজীর স্থাপনের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নাম সম্ভবত সবার আগে বলতে হবে। ওদিকে তার সঙ্গে বহুদিন ধরেই পাল্লা দিয়ে চলেছেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। উন্নয়ন কর্মকান্ডের নামে তাদের অর্থাৎ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সম্বয়হীন ও অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণ কাজের কারণে মাত্র দু’-চারদিনের বৃষ্টিতেই রাজধানী যখন স্থবির, অচল ও বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল, তখনও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দিব্বি বলে বেড়িয়েছেন যে, জনগণকে ‘সাময়িক’ এই অসুবিধা মেনে নিতেই হবে। শুধু তা-ই নয়, মন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘এটুকু’ অসুবিধার জন্য উন্নয়নের মহা কর্মকান্ড বন্ধ করা ‘সম্ভব নয়’! 

লক্ষণীয় যে, জনগণ কিন্তু উন্নয়ন কর্মকান্ডের নামে ঘুষের লেনদেনসহ ‘নগদ নারায়ণ’ আমদানির পথ বন্ধ করার দাবি জানায়নি। নগর পরিকল্পনাবিদসহ বিশেষজ্ঞরা বরং সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে এমনভাবে খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণ কাজ এগিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব না ঘটে এবং মানুষকে যাতে মাসের পর মাস ধরে ভোগান্তির শিকার না হতে হয়। অন্যদিকে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শুধু ‘এটুকু অসুবিধা’ এবং ‘সম্ভব নয়’ বলেই থেমে পড়েননি, সর্বশেষ উপলক্ষে গত বুধবার তিনি উত্তরা এলাকায় মেট্রোরেলের আরো একটি নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছেন। বলা দরকার, প্রায় তিন-চার বছর ধরে চলমান মেট্রোরেলের একটি প্রকল্পের কারণে আগারগাঁও থেকে বৃহত্তর মিরপুর ও পল্লবী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার লাখ লাখ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সে প্রকল্প শেষ না করেই সরকার এবার এমন এক প্রকল্প শুরু করলো, যার দৈর্ঘ্য হবে উত্তরা থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তথা মতিঝিল এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার। 

আগারগাঁও এবং মিরপুর ও পল্লবী এলাকার অতি তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে বলা হচ্ছে, মেট্রোরেলের এই প্রকল্পটি শেষ হতে যে কত বছর সময় লাগবে তা সম্ভবত মন্ত্রী নিজেও জানেন না। সেটা জানার দরকারও নেই তাদের। কারণ, প্রধান প্রশ্ন এখানে উন্নয়ন কর্মকান্ডের নামে ‘নগদ নারায়ণ’ আমদানি নিশ্চিত করা। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় ‘হরিলুটের’ ব্যবস্থা করা। উল্লেখ্য, সরকারের নেয়া অনেক প্রকল্পের ব্যর্থতা ও অশুভ পরিণতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিস্টার মুহিত মাঝেমধ্যেই ‘হরিলুট’ কথাটা ব্যবহার করে থাকেন। কিছুদিন আগেও করেছেন। তিনি এমনকি ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের দিকেও আঙুল তুলে বলেছেন, এদের কারণেই কোনো উন্নয়ন প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে সমাপ্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। 

বর্তমান পর্যায়ে কথা উঠেছে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কিছু ব্যাখ্যা ও মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। গত বুধবার নিজের মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক  বৈঠকশেষে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসার জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, রাজধানীর একেক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের একেক রকমের দাম। সব বাজার নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে ‘সম্ভব নয়’! উল্লেখ্য, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার প্রাক্কালে হলুদ মরিচ পেঁয়াজ ও বিভিন্ন মসলার দাম বাড়ার আশংকা ব্যক্ত করে এবং কিছু পণ্যের বেড়ে চলা মূল্যের কারণ জানতে চেয়ে সাংবাদিকরা মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন। সেসব প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী তোফায়েল একদিকে বলেছেন, বাজারে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে আবার অন্যদিকে বলেছেন, সব বাজার নিয়ন্ত্রণ করা তাদের অর্থাৎ সরকারের পক্ষে ‘সম্ভব নয়’! মন্ত্রী ঈদের আগে কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন। জানিয়েছেন, অচিরেই তিনি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন এবং ব্যবসায়ীরা যাতে পণ্যের মূল্য না বাড়ান সে নির্দেশ দেবেন। 

বাণিজ্যমন্ত্রী আশ্বাসের কথা শোনালেও অভিজ্ঞতা অতি তিক্ত বলেই আমাদের পক্ষে অবশ্য আশ্বস্ত হওয়া মোটেও ‘সম্ভব নয়’! কারণ, অতীতে অনেক উপলক্ষেই মন্ত্রীরা এ ধরনের আশ্বাস দিয়েছেন। মনিটরিং-এর কথাও তারা যথেষ্টই শুনিয়েছেন। কিন্তু কোনোবারই তাদের আশ্বাস সত্য প্রমাণিত হয়নি। এবারও মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কথাগুলো উল্টো সংশয়েরই সৃষ্টি করেছে। কারণ, বাজারে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে বলার পাশাপাশি তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন, অনেক পণ্যের মূল্যই আগের চাইতে বেড়ে গেছে। কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে বলে তারা কিনছে এবং কিনতেও পারছে! ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বর্তমান সরকারই যে প্রধান অবদান রেখে চলেছে সে কথাটাও স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি বাণিজ্যমন্ত্রী। 

আমরা মনে করি, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে মেয়র পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাসীন সকলের উচিত বিশেষ করে ‘সম্ভব নয়’ কথাটার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা এবং জনগণের স্বার্থে ভূমিকা পালন করার ব্যাপারে সততার সঙ্গে উদ্যোগী হয়ে ওঠা। পবিত্র ঈদুল আযহার আগে যাতে মসলাসহ কোনো পণ্যেরই মূল্য না বাড়ে সে ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। লক্ষ্য রাখতে হবে, জনগণকে যেন আবারও এর-ওর মুখে ‘সম্ভব নয়’ শুনতে না হয়!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ