বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রাজধানীর ৩৮ খালের অধিকাংশই দখল ও ভরাট ॥ বর্ষায় পানিতে ভাসে নগরবাসী

 

মিয়া হোসেন : একটু বৃষ্টি হলেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় হাঁটু থেকে কোমর পানি জমে যায়। এ পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের থাকলেও তারা পরষ্পরের প্রতি আঙ্গুল উঁচিয়ে সবাই দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকার মানচিত্রে ৩৮টি খালের চিত্র দেখা যায়। কিন্তু এসব খাল এখন মানচিত্রেই রয়ে গেছে। বাস্তবে ৩৮টি খালের অধিকাংশই দখল হয়ে ভরাট করায় বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না। আর সিটি করপোরেশনের ড্রেনগুলো পরিস্কার ও সচল না থাকায় একটু বৃষ্টি হলেই এসব ড্রেন বন্ধ হয়ে পানি উপচে পড়ে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর পানিবদ্ধতার জন্য এসব খাল ভরাট হয়ে যাওয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি পান্থপথ, মতিঝিল, ধোলাইখালসহ বিভিন্ন খালের বর্ণনা দিয়ে এসব খাল বক্স কালভার্ট করা ও দখল করে ভরাট করার কথা উল্লেখ করেছেন।

নগর বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, রাজধানী ঢাকা অপরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে উঠছে। প্রতিদিনই মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে আবাসন। কিন্তু সঠিক কোনো পরিকল্পনা নেই। পরিকল্পনার জন্য রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আছে দুটি সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু তাদের তৎপরতা দেখতে পাওয়া যায় না। আর তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বাড়ছে নগরী। যেখানে-সেখানে গড়ে উঠছে বসতবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর বস্তি। ফলে মানুষের বসবাসের চেয়ে মশার বাসোপযোগী জলাবদ্ধ নগরীতে পরিণত হচ্ছে ঢাকা। বর্ষাকালে দেখা যায়, রাস্তা ও ফ্লাইওভার নির্মাণের কর্মযজ্ঞ আর খোঁড়াখুঁড়ি। আর যেখানে-সেখানে ছড়ানো আর স্তূপীকৃত ময়লা আবর্জনা। দেখা যায় ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পয়ো ও শিল্পবজ্যের প্রবাহমান নালা। ঢাকা নগরীর বাসিন্দাদের কাছে যানজট ও ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ প্রায় সহনীয় হয়ে গেছে। তবে ঢাকা নগরীর আশপাশের নদীর মাছ ও অন্যান্য প্রাণী দূষণের নাগপাশে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গাছপালা, পশুপাখিও প্রায় উধাও হতে বসেছে। উন্নয়নের জোয়ারে ভাসা নগরীর সব জাতের মানুষই বিপদে পড়ে, যখন প্রবল বর্ষণ শুরু হয়। তখন এই নগরীর পয়োবর্জ্য আর শিল্পবর্জ্যযুক্ত মেশা ময়লা পানি রাস্তায় ও গলি উপচে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। ঢাকার সড়কগুলো হয়ে যায় নদী। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর, কিন্তু ঢাকা নগরীর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের তেমন কিছু হয়নি, বরং নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ হয়ে পানিবদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নদীগবেষণা ইনস্টিটিউট ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক ম ইনামুল হক এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ঢাকা নগরীর সুপেয় পানি সরবরাহ ও পয়োবর্জ্য সংগ্রহ ও শোধনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। ‘পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬’-এর মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ করা হয় এবং বিশেষভাবে দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা হয়। অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি এই পদে কাজ করে গেছেন, এখনো করছেন। এই আইনের পর ২০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি নয় বরং অবনতি হয়েছে। ‘পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬’ অনুযায়ী ১৭ (২) ধারায় এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলা হয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারাধীন এলাকা বা এলাকার কোনো অংশবিশেষের জন্য নিম্নলিখিত সকল বা যেকোনো বিষয়ে এক বা একাধিক স্কিম প্রণয়ন করিতে পারিবে, যথা: (ক) সুপেয় পানি সংগ্রহ, শোধন, পাম্পিং, সঞ্চয় এবং সরবরাহের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ; (খ) স্বাস্থ্য- পয়ো এবং শিল্পবর্জ্য সংগ্রহ, পাম্পিং, প্রক্রিয়ায়ন এবং অপসারণের জন্য পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থা নির্মাণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ; (গ) কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় বা অকেজো নর্দমা বন্ধকরণ বা করান; (ঘ) বৃষ্টির পানিনিষ্কাশনসহ নিষ্কাশন-সুবিধার জন্য ময়লা নির্গমন প্রণালি নির্মাণ ও সংরক্ষণ।’

ঢাকা মহানগরীর নিষ্কাশন নিয়ে গত ১৬ জুলাই ২০১৭ অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান এক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে খাবার পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ড্রেন পরিষ্কার করে না’। উল্লেখ্য, ওয়াসার কাজ শুধু খাবার পানি সরবরাহ নয়, ১৭(২)(খ) ধারা অনুযায়ী নগরীর পয়ো এবং শিল্পবর্জ্য সংগ্রহ, পাম্পিং, প্রক্রিয়ায়ন তার কাজ। কিন্তু ওয়াসা তার ড্রেনেজ সার্কেল দিয়ে নগরীর বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের খালগুলোকে বক্স কালভার্ট নালায় পরিণত করেছে এবং নগরীর পয়ো ও শিল্পবর্জ্য প্রক্রিয়ায়ন না করেই সেখানে ঢেলে দিচ্ছে। এ কারণে ঢাকা নগরীর আশপাশের জলাভূমি ও চারটি নদী ওয়াসার পয়োবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যের ভারে চরমভাবে দূষিত হয়ে ত্রাহি ত্রাহি করছে। এই অবৈধ পরিবেশদূষণের কাজটির জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠানই একমাত্র দায়ী। প্রকৌশলী তাকসিম এ খান আবার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের একজন নেতা। তিনি কি জানেন না, পৃথিবীর কোনো দেশেই বৃষ্টির পানির নালায় পয়োবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য ফেলা হয় না। তিনি কেন পয়ো এবং শিল্পবর্জ্য প্রক্রিয়ায়নের কাজ করছেন না?

ওই সমন্বয় সভায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের ড্রেনগুলোর ময়লা তোলার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনকে দেয়া হয়। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগরীর সড়ক থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ওয়ার্ডভিত্তিক নালাগুলোর মুখ পরিষ্কার করা হয়তো সিটি করপোরেশন দুটি করতে পারে, কিন্তু কয়েকটি ওয়ার্ড মিলে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের বড় নালাগুলো (যেগুলো আগে বড় খাল ছিল) তারা কীভাবে পরিষ্কার করবে?

সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি এই দূষণ বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলেননি এবং ঢাকা মহানগরীর ভেতরে নরাই ও তুরাগ নদের অববাহিকার বেগুনবাড়ি খাল, ধোলাইখাল, রমনা খাল, আরামবাগ খাল, জিরানী খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, কল্যাণপুর খাল, মহাখালী খাল ইত্যাদি ভরাট করে যে পানিবদ্ধতা তৈরি করা হয়েছে, সে ব্যাপারে কিছুই বলেননি। ঢাকা নগরীতে ৩৮টির বেশি খাল ছিল, যার মধ্যে ওই খালগুলো প্রধান। এগুলোসহ অন্য খালগুলো অবিলম্বে দখলমুক্ত ও ভরাটমুক্ত করা দরকার।

ঢাকা নগরীর পানিবদ্ধতা দূর করতে হলে বৃষ্টির পানিনিষ্কাশনের জন্য দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধার করে ডিজাইন মোতাবেক কেটে চওড়া করা ও উন্মুক্ত করা দরকার। ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০০০’-এর ৬(১)(ক) ধারায় বলা আছে, ‘নদী ও নদী অববাহিকা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানিনিষ্কাশন, সেচ ও খরা প্রতিরোধের লক্ষ্যে জলাধার, ব্যারেজ, বাঁধ, রেগুলেটর বা অন্য যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণ’। এই আইনের ধারা ১৫ অনুযায়ী ১০০০ হেক্টরের চেয়ে বড় এলাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদেরই দেয়া হয়েছে। ঢাকা নগরীর ওয়ার্ডগুলো কোনো কোনোটি ১০০০ হেক্টর এলাকার কম, যেখানে নিষ্কাশন নালাগুলো ওয়াসা নির্মাণ করেছে। কিন্তু যেকোনো দুটি ওয়ার্ডের মিলিত এলাকা ১০০০ হেক্টরের বেশি, যার পানিবদ্ধতা দূর করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডই আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাই তাকেই এ কাজের দায়িত্ব দেয়া জরুরি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ